‘কত দূরে যাই?

কতদূরে যাই? যেতে যেতে যেতে আমাদের সঙ্গে কি এক নদীর দেখা হয়? চৈত্রের রোদ মাঠ ভাঙছে, ধূ ধূ চর ভাঙছে, গাছের ছায়া পার হচ্ছে। দুধের ঘটি হাতে কেউ চলেছে শ্রীঘর বাজারে, কারো ঝুপড়িতে চড়ে বেগুনও চলেছে মাঠের পর মাঠ বেয়ে কোন উধাও পথে!বাজারে দেখি ডাক্তারখানার পাশে জিলাপী ভাজা হচ্ছে; গন্ধে মঁ মঁ করছে চারপাশ। মুড়ি আর বাতাসার দোকানে ভিড়। চৈত্র সংক্রান্তির মেলা ছিলো?দূর থেকে বাঁশি আর ড্যাবের ঢোলের একটানা শব্দ শোনা যাচ্ছে। ক্যালেন্ডারের পাতায় পৃষ্ঠা উল্টে যাচ্ছে। কে উল্টে দিচ্ছে? মহাকাল! আর আমি এক হারানো নদী খুঁজতে এসে কোথায় দাঁড়িয়ে আছি? এ কি স্মৃতির শিয়র? ১৪২৮ বাংলা সন পার হয়ে ১৪২৯ তো শুধু একটা বছরের সংখ্যাতত্ত্বই হয়ে থাকবে জীবনে আমাদের।অনেকগুলো কালো কালো তারিখ হয়ে ভেসে থাকবে ঘরের দেয়ালে ক্যালেন্ডারে।মনে পড়ার কোনো ক্যালেন্ডার হয় না, নেই কোনো পঞ্জিকাও। আমার শুধু শুধু পাখি মনে পড়ে, ভোরের আলো মনে পড়ে বিশাল বিশাল বাঁশ গাছের মাথায়। মনে পড়ে দুপুরে দই দিয়ে মাখা ভাত, মনে পড়ে কথা-না-বলা টলটলে পুকুর এক, মনে পড়ে কার কথা ভেবে কেনা মাটির পুতুল।

মারাত্নক গতিতে বেড়ে ওঠা এক শহরকে পেছনে ফেলে কোথাও যাওয়া হয় না আমার। শহরের উঁচু বাড়িগুলোর মাথায় তাকিয়ে ঝড়ের নিশানা খুঁজি; বৈশাখের ঝড়। হাওয়ায় উড়তে উড়তে বাড়ি পৌঁছাতে না-পারা পাতাদের কথা ভাবি। অচেনা গ্রামের পথ ভাবি, বাজারে ধূলা, বট গাছটার নিচে মেলার ভীড় ভাবি। এই শহরের জানালার আশ্রয় থেকে উড়ে গিয়ে বসে পড়ি মাঠে কাকতাড়ুয়ার নিঃসঙ্গতার সঙ্গে। কত দূরে যাই আমি?

এবার বাংলা নববর্ষে প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো, ‘কত দূরে যাই?’

অনেকদিন কোনো চিঠি পাই না তোমার।এদিকে ডাকবাক্সদের ধর্মঘট চলছে কিনা জানি না। অপেক্ষারও তো অভিমান থাকতে পারে। আজকাল তো ডাকবাক্সগুলো উপেক্ষা নিয়েই বেঁচে থাকে লোকালয়ে। তবুও নতুন সময়ের আশায় লিখতে বসলাম চিঠি।

চৈত্র শেষ হয়ে নতুন বছর। ঝরা পাতার মঞ্চে পর্দা নামবে এবার। ঝড় তার নতুন সংসার পাততে আসবে। সকালবেলা অনেকের মনেই একটা প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে-কেমন কাটবে নতুন বছর? কাল শেষ চৈত্রের বিকেলে ছাদে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম, কত কী ঘটনার অভিঘাত নিয়ে তিন‘শ পয়ষট্টি দিন খসে গেলো জীবন থেকে।এখন জীবন আর সরল নয়। কখনও বিড়ালের মতো পা টিপে টিপে আবার কখনও বাঘের ক্ষিপ্রতায় সময় ছুটছে। চারপাশে জীবনানন্দের ভাষায়, জীবনের সমুদ্র সফেন। কিন্তু বাংলা ক্যালেন্ডারের পালাবদলের এই দিনটা এলেই মনের মধ্যে বাঁশি বাজতে থাকে। বিসর্জনের বাঁশি না আবাহন জানি না, শুধু মনে হয় বাঁশির ধ্বনি তার স্মৃতি নিয়ে মনের মধ্যে জেগে থাকে। কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াই দিনের পর দিন। কিন্তু মনের মধ্যে সেই নদীর সঙ্গে দেখা হওয়ার স্মৃতিটা রয়ে যায়। সে নদী কি সত্যিই কোনো জলরেখা নাকি ফেলে আসা সময়ের গল্প?আকাশের আলো ডুবে যেতে যেতে বলে, তোমার চিহ্ন পড়ে থাকার গল্প ওসব, সবাই সব চিহ্ন দেখতে পায় না। কিন্তু আমরা খুঁজে ফিরি। সময় পাল্টে যায়, গেছে। তবুও সেই ভোরবেলাটুকুর জন্য মন কেমন করে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন-আমার মন কেমন করে। মনে পড়বে গান, মনে পড়বে ঝড়, হাওয়া, মনে পড়াবে কাঁচা আমের মন অস্থির করা ঘ্রাণ।

আচ্ছা, মেলার ভিড়ে কি কারো হারিয়ে ফেলা চুড়ি খুঁজে পাওয়া যায়? জামায় গড়িয়ে পড়া জিলাপীর রসের রেখা কি জানাতে পারে কতোটা হারিয়ে গেছে চেনা পথ? পাঁপড় ভাজার ঘ্রাণ আজও জানাতে পারে আমি কী সত্যি হারিয়ে গেছি সেই কবেকার মানুষের ভিড়ের মধ্যে কাকতাড়ুয়াটার মতো? বড্ড বেমানান লাগে নিজেকে গাছের ছায়া পার হতে গিয়ে, পুকুরের জলে মুখ অস্পষ্ট, শ্রীঘর বাজারের ডাক্তারখানার বারান্দা চিনতে পারে না পথ হারানো এক কিশোরকে। শহরে ফ্লাইওভারের ছায়া আমার শরীরে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। বাসের হাতল ফসকে যায় মুঠো থেকে, চালের দাম বাড়ে। তবুও নতুন সময়ের আশায় ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে দেয় মহাকাল। পহেলা বৈশাখের ভোরবেলা বসে বসে ভাবি, আজ নতুন করে আলো ঝরে পড়ুক আমার স্মৃতির শিয়রে।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
ছবিঃ প্রাণের বাংলা, গুগল, প্রচ্ছদ মডেল-নীলা মার্মা


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box