কবিতার ডানা মেলে উড়ে যাওয়া পাখি…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

 

শেখ রানা (কার্ডিফ, যুক্তরাজ্য)

এক.

আজ উনত্রিশ ডিসেম্বর। এ বছর শেষ হতে আর কয়েক প্রহর বাকি।

আমরা এখন থিতু হয়েছি ওয়েলস এর রাজধানী কার্ডিফ শহরে। যে আনন্দ নিয়ে নতুন শহরের দিনলিপি লেখার কথা ছিলো তার যোজন বিপরীতমুখী দূরত্বে লেখা হচ্ছে বিষাদ।  এক অতলান্তিক বিষাদ। এর শেষ কোথায় আর ঠিক কবে, কেউ জানিনা।

মার্চ মাস থেকে  যুক্তরাজ্যে যখন হুহু করে কোভিড আক্রান্ত মানুষ বাড়তে লাগলো আর সেই সঙ্গে বাড়তে লাগলো মৃতের সংখ্যা, বিবিসি দেখতে দেখতে আমি আর মিশু হতবিহবল হয়ে ভেবেছিলাম আমাদের মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। যতটা সহজে কথাগুলো লিখলাম, ভাবনাটা তার চেয়ে শতগুণ কাঠিন্যে মোড়া ছিলো। তারপর সেই সময় গত হলো। আমরা বাসাবন্দী হয়ে রইলাম। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস শতভাগ ঠিক প্রমাণ করে এখন চলছে দ্বিতীয় ঢেউ। মহামারী থেকে অতিমারী। গতকাল বিবিসিতে দেখালো একদিনেই আক্রান্তের সংখ্যা  একচল্লিশ হাজার আর মারা গেছেন পৌণে চার’শ মানুষ।

এইসব সংখ্যা আর মৃত্যুসংবাদ নিয়ে আমরা তবু বেঁচে থাকার রসদ খুঁজি। অন্তর্জালে আর বাস্তব জীবনের ছায়ায় আশ্রয় পাতি।  প্রায় বছরখানেকের কাছাকাছি অর্থশূন্য থেকে আমি এখানকার রয়েল মেইলে ক্রিসমাস ক্যাজুয়াল হিসেবে যোগ দেই। সপ্তাহে দুই দিন ছুটি। সবশুদ্ধ তিন সপ্তাহের কাজ। তারপর আবার বাসাবন্দী জীবন। আমি মানিয়ে নিয়েছি। নিশ্ছিদ্র নীরবতায় লেখালেখি আর বই পড়া জীবন।

এ রকম এক ছুটির দিন পেতেই আমরা বের হই হাঁটাপথে। ত্রিশ মিনিট হেঁটে রোথ পার্ক। এই গ্রীষ্মেই  দেখেছিলাম গোলাপ ফুল ফুটে আছে পার্কে। সারি সারি গাছ। রোথ পার্কের অন্যতম বৈশিষ্ট এই গোলাপ বাগান। এবার পার্কে ঢুকে দেখি প্রকৃতির নিয়মে শীতকালীন মহড়ায় সব গাছ ন্যাড়ামাথায় বসে আছে। আমাদের ঘোরাঘুরি পর্বে যোগ দেয় শায়লা। কার্ডিফে নতুন এসেছে। বাংলাদেশের মেয়ে। এখানে কার্ডিফ ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স করবে। তিনজনার আলাপচারিতায় সময় নীরবতার পৃষ্ঠা উল্টায়।

রোথ পার্কের কাছেই নয়নাভিরাম রোথ লেক। ভীষণ সুন্দর আর শান্ত জায়গাটা। ছোট্ট ব্রিজ এর একপাশে পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য স্লুইস গেট বানিয়ে রেখেছে। সেখান থেকে বহমান পানির সুতীব্র গর্জন শুনতে শুনতে আমরা সামনের দিকে যেতেই একটা কাঠের তৈরি বেঞ্চ পেয়ে বসে পড়ি। দেখেই আমার এডিনবার্গ শহরের কথা মনে পড়ে। এ রকম অনেক কাঠের বেঞ্চ চোখে পড়তো প্রিন্সেস স্ট্রিট গার্ডেন আর পুরো শহরজুরেই। পথিকের দু’দণ্ড বিশ্রামস্থল। সেই কাঠের বেঞ্চে নানারকম শ্রদ্ধাঞ্জলি লেখা থাকতো। ইন দ্যা মেমোরি অফ মিঃ কার্টারএই পার্কটাকে ভালোবাসতেন এবং এখানে এসে বসতেন। তার আত্মা শান্তি পাক– এ রকম নানা শ্রদ্ধাঞ্জলি আর স্মরণিকা চোখে পড়তো। আজ অনেকদিন পর রোথ লেকের এই বেঞ্চিতে সে রকম লেখা দেখে ফেলে আসা এডিনবার্গ শহরের কথাই মনে পড়লো আমার।

ফুল রেখে দেয়া বেঞ্চিতে বসতেই দৃশ্যমান হয় লেকের মাঝে এক ছোট্ট বাতিঘর। সাদা রঙের দেয়াল আর সবুজ রঙের কাঠের দরজা। রুপোরঙা পাতে লেখা টু দ্যা মেমোরি অফ ক্যাপ্টেইন স্কট এন্ড হিস ফেথফুল কম্পানিওন।  পেল্লাই সাইজের রাজহাঁস আর পানকৌড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছে আর দর্শনার্থীদের ছুড়ে দেয়া খাবারে দলবেঁধে দুপুরের আহারকার্য সমাধা করছে। দৃশ্যটা এত নিখুঁত, আমি অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকি। ভেসে বেড়ানো নিস্তরঙ্গ জীবন দেখে আমি জীবনের ছবি তুলে নেই। মৃত্যুকে ভুলে থাকি।

কিন্তু আমি জানি জীবন মানেই মৃত্যু সমান। আমার বাসু’দার কথা মনে পড়ে।

দুই.

সময়ের সঙ্গে দেখা হলে একটি কথাই জিজ্ঞেস করতাম। ‘এত অগোচরে, এত দ্রুত কীভাবে চলে যাও!’

বাসু’দার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। রাজারবাগ পুলিশ লাইনের বিপরীত প্রান্তে বাসু’দার বাসায় আড্ডা-গান নিয়ে সময় কাটিয়েছি এন্তার। সহজ মানুষ ছিলেন। বয়সে আমার সিনিয়র ছিলেন তো বটেই কিন্তু আমার সঙ্গে বন্ধুর মত মিশতেন। আমিও সহজ হয়ে গিয়েছিলাম বাসু’দার সঙ্গে। ভালো লাগা- না লাগা অকপটে বলে ফেলতাম। এই নিয়ে একটা দিনও মনক্ষুণ্ণ হতে দেখিনি।

তখন বাপ্পা-বাসু জুটি বেঁধে কাজ করে। বাসু’দার বাসায় গেলেই দেখা যেত এক ঝাঁক ছেলে-মেয়ে বসে গান শিখছে। দরজা দিয়ে ঢুকেই সমস্বরে গান শোনা যেত তাই। সেই সময়ে স্টুডিও পাড়ায় গেলে ক্যাসেট বের করতে চান এ রকম অনেক নতুন মুখের সঙ্গে দেখা হতো। সারি বেঁধে বসে থাকতেন। অডিও আর্ট স্টুডিওতে এ রকম এক রাতে গিয়েছি। হঠাৎ পরিচিত একজন আমাকে চিনে ফেলে ‘আরে রানা, তুমি এখানে কী করো?’- প্রশ্নে বাসু’দার গম্ভীর মুখের উত্তর- ‘ও রানা, আমাদের বন্ধু …আমার কানে এখনও ধাক্কা দেয়। কানে নয়, আসলে হৃদয়ে।

বাসু’দার চমৎকার কিছু সুর আছে। ‘তোমার ঐ মনটাকে একটা ধূলো মাখা পথ করে দাও, আমি পথিক হব’ অথবা ‘হৃদয়হীনা তুমি কী আমার কথা ভাবো’। ‘পাখি উড়ে যায় কবিতার ডানা মেলে’ গানটার কথাও মনে পড়ে। তিনটা গানই ‘একটি নারী অবুঝ’ মিক্সড অ্যালবামের। নানা ধুনের, ফোক- মেলো রক-ফিউশনের একটা ভালো অ্যালবাম ছলো। বাসুদার স্টুডিওতেই পাখি লিরিকের সুত্রে মিজানের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিলো। গীতিকারকে মনে রাখার কথা বলেছিলেন, ঠিক কী বলেছিলেন আমার আর মনে নেই। শুধু মনে আছে মিজানের সম্মতি এবং সহাস্যে দুজনের করমর্দন।

বিলক্ষণ মনে পড়ে, গীতিকার সকালকে পাঠিয়েছিলেন আমাদের মিরপুরের বাসায়। সেই অ্যালবামে সকল গীতিকারের ছবি গিয়েছিল। এর আগে গানের কোনো অ্যালবামে আমি অন্তত গীতিকারের ছবি দেখিনি।

পরে আর একটা কাজ করেছিলাম। বায়ান্ন বাজার তেপ্পান্ন গলি মিক্সড অ্যালবামের। ‘দুঃখ শেষ হয়, শেষ হয় কষ্টের রাত্রি’। বালাম গেয়েছিলেন। এর পর আর বাসু’দার সঙ্গে আমার কাজ করার সুযোগ হয়নি। যোগাযোগও ক্ষীণতর হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু বাসু’দার সঙ্গে আমার বন্ধুতা একইরকম ছিলো। ঢাকায় গিয়ে বাসু’দার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে, এডিনবরা থাকতে একরাতে দূরালাপনীতে দীর্ঘক্ষণ আলাপচারিতা হয়েছে। দেশের গানের বিশাল কর্মযজ্ঞের কথা শুনে আমি মনে মনে ভেবেছিলাম, করছে কী বাসু’দা! এই কাজ শেষ হবে তো? শেষ পর্যন্ত বাসু’দার আকস্মিক প্রয়ানে এক হাজার গানের কাজ আর শেষ হলো না।

রাজারবাগের সেই বাসায় দেখা হতো অনেকের সঙ্গেই। মোনায়েম, সেই শুরুর দিকের সন্দীপন’দা, স্বপ্নীল’দা, সকাল আর বাপ্পা ভাই। মাঝে মাঝে একসঙ্গেই আমি আর বাপ্পা ভাই বাসু’দার বাসায় যেতাম। গান নিয়ে আড্ডা আর বাসু’দার উচ্চ মার্গের রসিকতায় হাসির হুল্লোর উঠতো সেই ঘরে। সমস্বরে।

শোণিত প্রাণের ধারায় ভালো থাকুন বাসু’দা। মানুষের নিখাদ ভালোবাসাই আমি মনে রাখবো। আপনাকে তাই মনে রেখেছি, আজীবন আপনি আমার অন্তরে থাকবেন।

কবিতার ডানা মেলে উড়ে যাওয়া পাখি অথবা দুঃস্বপ্ন শেষে আলোর পথযাত্রী হয়ে।

ছবি : লেখক


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments