কবিতা পাঁচ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শ্রাবণী জুঁই

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

একজন জোকার কিংবা কুকুর

হীরামন, আমার জানা ছিল গলিটার শেষটায় অন্ধকার।

আমার জানা ছিল ওই কুশ্রী অন্ধকারে জ্বলজ্বলে চোখে বসে থাকে দুটো কুকুরওদের শরীরে পচন মুখে দুর্গন্ধ

ওদের পেটের ভেতর ঘুমায় পঁচিশটি অপয়া মৃত

এ গলিটা পৃথিবীর ম্যাপে সুকৌশলে আড়াল করেছিল যে নকশাকার তাঁকে আমি চিনতাম

তার বাম চোখের নিচে মিথ্যে বসে থাকত জড়ুল হয়ে সেটা চোখ বুজলে এখনো দেখতে পাই।

অন্ধকার গলিটায় বছর বছর কর্দমাক্ত হতাশায় ডুবে যাওয়া

অচেনা পথিকের আর্তচিৎকার শোনা যেতো কান পাতলেই

অথচ গলিটার মুখে ঝলমলে ক্যাসিনোগুলোয়

হাসির হুল্লোড়।

এক মেঘলা থমথমে রাতে নকশাকার ক্যাসিনোর সবুজ পানীয় আকন্ঠ গিলে হেসেছিল উন্মাদের হাসি

চেঁচিয়ে বলেছিল, ‘সব হতভাগা ভাগাড়ে যাবে, অলিতে গলিতে পচে যাবে! সবাই যাবে!!

চুপচাপ সরে যাই। কীইবা আর করতে পারি আমি?

হীরামন, তুই তো জানিস আমার বন্ধুরা সকলেই বিত্তবান

তাই ওদের কেউ কুকুরের পেটে গেলে আমার হয়ত তেমন আফসোস হতো না

কেননা আমিও তো কুকুরই ছিলাম বন্ধু মহলে

আমাকেও জিভটা বের করে ওদের সব হ্যাঁ-তে-ই হ্যাঁ মেলাতে হতো

এছাড়া আর কি করতে পারতাম আমি?

শ্রেণি বিভাজনের কঠোর নীতি ভুলে ওরা আমার বন্ধু হয়েছিল

খাদ্য বস্ত্র বাসস্থানের মত মৌলিক চাহিদা মিটিয়েছিল

সান্ধ্য আড্ডার একজন জোকারের এর চেয়ে বেশি আর কী পাওয়ার থাকতে পারে?

হীরামন, বিষণ্ণতা আমায় জোকার করেনি করেছে ধূর্ত শেয়াল, একটা হিংসুক খল শেয়াল

যার এ-কান ও-কান হাসির আড়ালে নিরেট ফাঁদ

অপেক্ষা করে থাকে

আমার পচনশীল হাসিতে গলা মিলিয়ে নকশাকার

বলেছিল, ‘বুঝলে হে! এই গলিটা শুধু নয়

পৃথিবীর প্রতিটি শহরে এরকম গলি উপগলি

কানাবাড়ি আর তোমার মতো এক একটা জোকার আছে, জানো তো? নকশায় ফাঁক রাখতে নেই? তাই মানচিত্রে গলিটা লুকিয়ে ফেললাম

হা হা হা হা হা…..

তার অট্টহাসিতে চমকে যাই

পালিয়ে যাই।

হীরামন, আমাকে যারা চিনেছিল তারা সকলেই অন্ধ হয়েছিল, হয়েছিল মূক বধির।

অথচ বুকের খাঁচায় তোর সবুজ ডানায় দুঃখ বুনি, মানবিক আবেগ পুষি, ভালোবাসি।

হীরামন, হীরামন আজ কিন্তু তোর মুক্তি

আয় তোকে উড়িয়ে দেই নগর তোরণে, ভুলিয়ে দেই গত জন্মের পাপ।

তারপর?

তারপর অন্ধকার গলিটায় তীব্র অপেক্ষমান কুকুর দুটোর সামনে বসে থাকব আমি

একজন জোকার কিংবা কুকুর।

রুনা লেইস

শিকারী

ঠিক কোথায় কোন জায়গা থেকে তোমার আবার শুরু হবে রণসাজসজ্জার সবকিছু আয়োজন ভেবে পাচ্ছিনা।
অথচ আমাকে সেই অনুযায়ী নতুন পরিকল্পনাগুলো ভেবে রাখতেই হচ্ছে,
সাজাতে হচ্ছে কার্যপরিক্রমা,
সমাবেশ বিন্যাসের কল্পতরু গুলোকে ছড়িয়ে দিতে হচ্ছে উর্ধমুখী আড়াল তুলে দিতে,
প্রাচীরের বিকল্পে সাজাতে হচ্ছে পুষ্পধারী বৃক্ষের সারি।

পায়ের নীচে সবুজ গালিচায় উপচে পড়বে তোমার জন্য
ফসলের সৌরভ এমনটাই ভাবতে হচ্ছে,
মৌচাকের মধুময় মদির গন্ধে কি তুমি হতবিহ্বল হবে?

তুলতুলে মেঘের আলোয়ানে ঢাকা সুদৃঢ় পাথুরে পাহাড়ের নীলিমা
আর ঝর্ণাধারায় দূরন্ত উচ্ছাসে
তুমি কি কিছুটা হলেও চমকিত হবে?
চারদিকে উৎসুক মানব চিৎকার নয়
বরং পলাশ রাঙানো নিঝুম নির্জনতার মাঝে দোয়েলের শিস তোমাকে শান্তি দেবে এরকমটাই ভাবতে হচ্ছে।

তোমার প্রোফাইল আর নথিপত্রে জীবনবৃত্তান্ত নাড়তে নাড়তে
আর প্রজেক্টারে তোমার সবগুলো অবয়বের কাঠিন্য ঘাটতে ঘাটতে যতটা বুঝতে পারছি
এ যাত্রা অনুমানে নয়, আমাকে সুচারুভাবে সাহায্য নিতে হবে
আমার এতোকালের অভিজ্ঞতা আর প্রখর প্রজ্ঞার কাছে।
এতোটুকু ভুলেরও ক্ষমা নেই চুড়ান্ত সময়ের সন্ধিক্ষণে।

এ যাবৎ তোমার অনিয়ন্ত্রিত অথচ চুড়ান্ত গোপন ও পরিবর্তনশীল
জীবন যাপনের কোন নিশানা খুঁজে পাইনি কোথাও,
কী বেশে, কী রূপে কখন কোথায় আসবে তুমি তাও জানিনি বিন্দুবিসর্গ,
শুধু এটুকু জেনেছি সুশৃঙ্খল ও নিপুণ হত্যাকাণ্ডে তোমার সুখ্যাতি জগৎজোড়া,
শিকার নিজেই দ্বিধাহীন কাছে যেতে চায় তোমার,
স্বেচ্ছায় হেসে হেসে তোমার কাছে নাকি ধরা দেয়
তারপর অবলীলায় খুন হয়ে যায়।
তুমিও ঠোঁটের কোণে মৃদুহাসি হাতের উল্টোপিঠে মুছে
দৃঢ় পায়ে হেঁটে যাও পূব থেকে পশ্চিম দিগন্তের দিকে।

এই পৌরাণিক পাললিকতার দেশে
হয়তোবা এটাই তোমার প্রথম আগমন,
শিকারীর বেশে তুমি,
আমিও নিশ্চিত প্রথম শিকার হতে ইচ্ছুক তোমার।
আমারও শতজন্মের সাধ দেখবো তোমার সেই দৃষ্টি ,
যে দৃষ্টি হেনে জীবনকে বানাও প্রস্তর,
আমারও এক পলকের সাধ, এ জন্মেই মেটাবো আকুল তৃষ্ণা
তোমার রক্তস্রোতে করে স্নান।
মুখোমুখি দাঁড়াবো যখন তুমিও জেনে যাবে,
অর্জুনের জন্মভূমিতে প্রতিটি নারীপুরুষ
জন্মসূত্রেই কতোটা চতুর শিকারী।

রাশেদুল বারী

নদী

আমার একটা নদী আছে
সময় পেলে ঘুরতে এসো
হাতটা ছুঁয়ে নতমুখে এমনিই একটু লাজুক হেসো।
বিনিময়ে কি চাই তোমার?
যা আছে সব দেবো আমার ।
দুহাতে চরণ ধুয়ে দেবো
ঘাস ফুলের মল দেবো
কাশফুলের মালা দেবো
আঁজলা ভরে বুকে রাখা
ভালোবাসার জ্বালা দেবো।

আমার একটা নদী আছে
সময় পেলে ঘুরতে এসো
হাতটা ছুঁয়ে নতমুখে দোহাই তোমার একটু হেসো।
বিনিময়ে কি চাই তোমার?
যা আছে সব দেবো আমার।
দুহাতে চরণ ধুয়ে দেবো
মাটির সোঁদা গন্ধ দেবো
সদ্য লেখা ছন্দ দেবো
চোখের জলে নেমে আসা
ভালোবাসার গন্ধ দেবো।

আমার একটা নদী আছে
সময় পেলে ঘুরতে এসো
হাতটা ছুঁয়ে নতমুখে ঠোঁট কামড়ে একটু হেসো।
বিনিময়ে কি চাই তোমার?
যা আছে সব দেবো আমার।
দুহাতে চরণ ধুয়ে দেবো
ভালোবাসায় ছুঁয়ে দেবো
কান্না পেলে দেখো কেমন
তোমার সকল কষ্টগুলো
নদীর জলে ধুয়ে দেবো।

মাসুদুর রহমান

রূপকথা  

বদল হয়ে গেছে চিলেকোঠা    ছাদ    দালান
কাঁচা বাজারের আঁশটে গন্ধ   চালের আড়ৎ
বিকেল রোদ গড়িয়ে বালিকার চুল
পুজোর ঘন্টায় দূর পাহাড়ের হাতছানি
পাতালে লুকোন রাজ রাজড়াদের শহর
সেগুন বনের ফাঁক গলে বেরিয়ে আসা সাদা পরী
দ্বিচক্রযানে আগুন পাখির ছায়া
অরন্যে ডুবে যেতে যেতে কদম ফুলের হাসি

বদল হয়ে গেছে স্কুলবাস, দ্বিচক্রযান
অট্টহাসি, প্রানের সহচর, অবৈষয়িক বন্ধুবর

ছাদ ভর্তি জোছনা
বাদুড়ের আর্তনাদ
ঘুণ পোকার কান্না

কেন যেন বদল হতে হতে স্মৃতিগুলো
একসময় রূপকথা হয়ে যায়।

এস আফ্রোদিতি মিলান

রাজর্ষি পালিয়ে ভুল করোনি, ভালো আছো
এস আফ্রোদিতি মিলান

দেশ থেকে পালিয়ে
তোমরা আসলে বেঁচেই গিয়েছো রাজর্ষি
প্রতিটা দিন একশবার মরে বেঁচে থাকার চেয়ে!!
আমাদের দিন আর রাত সব তো ভয়,  একা আর দুজনে
লাশ হয়ে কিম্বা ধর্ষণের শিকারে!!
নিরপত্তা কোথাও নেই রাজর্ষি পরম আদরের বাবার কোলেও না।
পরিস্থিতি কিভাবে সম্পর্ক শেষ করে দেয়,  বদলে দেয় মানবতা !!
তোমাদের দিন রাত কি চমৎকার আলোময় নির্ভয়ে চলতে পারো,
ভাবি কংক্রিটের শহরে সত্যিকারের মন,  মানবতা অভিলাষী স্বপ্নগুলো আসলে তোমাদের সেই শহরেই রাজর্ষি !!
আমাদের জন্মভূমি প্রিয় দেশ,  প্রিয় শহর,  চেনা পথ তবুও
দিনের আলোয় পথ চলতে গিয়েও হঠাৎ-ই থেমে যেতে হয় কখনো কখনো!
সেদিন কি হয়েছে জানো রাজর্ষি ?!
অফিস থেকে ফিরছিলাম কি ভেবে যেনো খুব পরিচিত একজনের বাসায় গেলাম সেখানে অবশ্য পরিচিত কেউ নেই এখন আর
একজন আশ্রিতা কে পেলাম ভয়ে কোণঠাসা আমাকে দেখেই চমকে  উঠলো যেনো
পাশে যেয়েই শুনি বাড়িওয়ালার নির্মম অত্যাচারের কথা
নাহ রাজর্ষি পালিয়ে আমি আসিনি, এতটা ভিতু আমি নই সে তুমি জানো,
সোজা বাড়ীওয়ালার কলার চেপে আশ্রিতার পায়ের উপরে!!
আশ্রিতা কতবার মরেছে বেঁচেছে সে হিসেব সেও জানেনা হয়তো।
কি জানি তাকে বাঁচিয়ে দিতে পেরেছিলাম কিনা আদৌ !!
কতশত এমন ঘটনা ঘটে প্রতিটা দিন!!
তুমি এসব দেখা থেকে বেঁচেই গিয়েছো রাজর্ষি !!
প্রতিদিন এসব বাঁচা মরায় আমরা অভ্যস্ততায় পথ চলি ঠিক-ই
মনে মনে পালানোর যে ছক আঁকিনা তাও কিন্তু নয়!!
কিন্তু ওই যে কি এক অদৃশ্য মায়াতে মন আটকানো
সেখান থেকে পালাতে পারিনা
তুমি পেরেছো রাজর্ষি
মনে মনে এটাও ভাবি তুমি তো তথাকথিত মধ্যবিত্তের গন্ডিতে ছিলেনা তাই পেরেছো হয়তো!!
আবার এটাও ভাবি  তোমার আবেগ মধ্যবিত্তের বাঁধভাঙা আদুরে আহ্লাদিত আবেগগুলোকেও ছুঁয়ে যায় কি গভীর ভাবে
(যে সত্যিকারের মানুষ সে আসলে কোনো গন্ডিতে থাকেনা
এটা তোমাকে দেখেই বুঝেছি)
সব হিসেবে শুধু ভাবনারা বাঙালী মানেই কি আবেগ তাড়িত?
বটেই তো
দেশের জন্য তোমার মন কাঁদে ছুটে আসো সময় সুযোগে।
যে দেশ তোমাকে কিছুই দিতে পারেনি!
আচ্ছা রাজর্ষি অজস্রবার বাঁচা মরার এই দেশটাকে তবুও ক্যানো ভালবাসা বলোতো?!

ভালবাসি আমরাও কিন্তু তবুও পালাতে চাই মনে মনে
অজস্র ক্যানোর উত্তর এক কথাতে দেয়া যায়না আসলে !!
রাজর্ষি তুমি, তুমি পালিয়ে গিয়ে ভালোই করেছো
আসলে দেশ থেকে নয়,  পালাতে পেরেছো
শালীনতা অশালীনতার
সব আঙুল দেখানো প্রশ্নবোধক থেকে, পালাতে পেরেছো প্রতিদিন একটু একটু করে যন্ত্রণাকাতর মৃত্যু থেকে !!
যানজট আর দম বন্ধ হয়ে আসা প্রিয় শহরটাকে ফেলে রেখে তুমি ভালো-ই করেছো, আসলে সামনেই এগিয়েছো…..!
বেঁচেছো……
রাজর্ষি একদিন ঠিক পালাবো আমি তোমার মতো করে,
কোথাও না কোথাও,
তোমার শহরে না হোক অন্য কোনো শহরে!!
আমার দম বন্ধ হয়ে যায় রাজর্ষি….
পালাতে আমাকে হবেই সে হোক রুদ্রমনের আকাশের ঠিকানায়
কিম্বা তোমার আমার দিন রাতের হিসেবে!!
আমি ভালো নেই
তুমি ভালো থেকো রাজর্ষি!!….

ছবি:প্রাণের বাংলা । অলংকরণ: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box