কবিতা বুঝিনি আমি…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মাঝে মাঝে এমন হতো শূন্য বাড়িতে চুলা ধরাতে গিয়ে হাত কাঁপতো তাঁর। কাঁপতে কাঁপতে একের পর এক ম্যাচের কাঠি ভেঙে যেতো, চুলা জ্বালাতে পারতেন না। অথচ অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, জ্যামিতির উপপাদ্য আঁকার সময় নির্ভুল আঁকা হয়ে যেতো ৯০ ডিগ্রী কোণ। কখনো চুপ করে বসে থাকতেন দিনের পর দিন এক ঝোপ জঙ্গলে ছাওয়া বাড়িতে। আবার কখনো খাতায় কবিতার কয়েক ছত্র লিখে ছিঁড়ে ফেলে দিতেন জানালা দিয়ে বাইরে। প্রেমিকা গায়ত্রীর মতো কবিতার প্রতি ছিলো তার তীব্র ভালোবাসা, ছিলো তীব্র বিদ্বেষও।

বিনয় মজুমদারের শেষ জীবন এভাবেই কেটেছে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার ঠাকুরনগরের শিমুলপুরে। কবি বিনয় মজুমদারের সেটাই ছিলো এক নির্বাসিত জীবন।

একবার সেই বাড়িতে বসে সাক্ষাৎকার দেয়ার সময় তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েঢছিলো, কবি কে?

তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘যেখান থেকে আলো বেরোয়, সেই জায়গা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু জোনাকি! দেখেছ? আলো জ্বলে কিন্তু ঠান্ডা।’

—‘কবিতা বুঝিনি আমি; অন্ধকারে একটি জোনাকি যৎসামান্য আলো দেয়, নিরুত্তাপ, কোমল আলোক।’

আর কবিতা?প্রশ্নকর্তার প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছিলেন,

‘‘বাক্যং রসাত্মক কাব্যং।’’ ‘যা হুবহু মনে রাখা যায়, তা-ই হল কবিতা।’

শোনা যায়, বিনয় মজুমদার সেই একলা বাড়িতে থাকার সময় যে সব কবিতা লিখতেন তার সবই ছিঁড়ে দলা পাকিয়ে জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিতেন। আর কবির সেই পরিত্যক্ত ছত্রগুলো কুড়িয়ে নিতে আসতো কলকাতা, বনগাঁ এলাকার কিছু তরুণ। তারা সেগুলো কুড়িয়ে নিয়ে যেতো প্রতিদিন ভোরবেলা। বিভিন্ন পত্রিকায় সেই অসমাপ্ত কবিতা পৌঁছে দিতো তারা। ছাপা হতো এভাবে বিনয় মজুমদারের কবিতা।

২০০৩ সালের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার পত্রিকায় বিনয় মজুমদারের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার ছাপা হয়। সেখানে চশমার আড়ালে কোটরে ঢুকে থাকা নিজের আত্মমগ্ন গভীর চোখ প্রসঙ্গে রসিক বিনয় বলেছিলেন, ‘আমার চোখ দু’‌টো দেখেছ? কেমন? এক চোখে আমি তোমার ভেতরটা দেখছি, অন্য চোখে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড। একে ট্যারা বলে। এই ট্যারা চোখের সুবিধা শিবরাম চক্কোত্তি বলেছেন।’

সেই সাক্ষাৎকারে পলেস্তরা খসে পড়া বাড়ির ভেন্টিলেটার থেকে উঁকি দেয়া দুটি চড়াই পাখিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘দেখো, ওদের একটা গায়ত্রীর মতো না! ও কিন্তু পাঁচ ফুট নয় ছিল।’

কখনও দিনের পর দিন চুপ করে বসে থাকতেন। আবার বছরের পর বছর একটি শব্দও না-লেখার কঠিন জেদ। স্কিৎজোফ্রেনিয়ার রোগী। বাড়িতে এসে তাকে পুরস্কার দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। কিন্তু লোকজন দেখে দরজা বন্ধ করে স্বেচ্ছাবন্দি ছিলেন সেদিন তিনি। অথচ নিজেই বেরিয়ে পড়তেন জোনাকি, প্রজাপতি, হাঁস, পাখি আর মানুষ দেখতে। জলের মধ্যে মাছের খেলা দেখতেন। এসব দেখেই হয়তো লিখেছিলেন—‘‘একটি উজ্জ্বল মাছ একবার উড়ে/ দৃশ্যত সুনীল কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে স্বচ্ছ জলে/ পুনরায় ডুবে গেলো’’।

কর্মজীবন, হাসপাতাল আর পাগলা গারদের সময়টুকু বাদ দিলে গোটা জীবন আর স্বেচ্ছানির্বাসন কেটেছে তার সেই শিমুলপুরে। সেখানেই পড়ে আছে কবি বিনয় মজুমদারের স্মৃতি।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা
ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments