কবিদের ধূসর শহরে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

‘রূপসী বাংলা’র কবি জীবনানন্দ দাশ কেবল বনের হিজল গাছ আর শালিকের হলুদ ঠ্যাং দেখেননি মনোরম সন্ধ্যায়। তাঁর কবিতায় শহরের মরোণত্তীর্ণ কাঠামো পাঠককে ডেকে নিয়ে যায় ভিন্ন এবং ভয়ংকর এক জলবায়ুর দিকে। যেখানে নগরীর মহৎ রাত্রিকে তার মনে হয়েছে লিবিয়ার জঙ্গলের মতো। শহর ঘুমায় না লোরকার কবিতায়। নিউইয়র্ক শহর কবির কাছে মাংসভুক কুমিরের মতো জেগে থাকে। বোদলেয়ারের অচেনা মানুষ ভালোবাসে শহর নয়, উঁচুতে চলিষ্ণু মেঘদল। শহর পৃথিবীজুড়ে এমনি করে কবিদের সামনে এগিয়ে দিয়েছে বিমুখ প্রান্তরের শূন্য পানপাত্র। তবু শহর, ধূসর শহর কবিদের আচ্ছন্ন করেছে, দখল করেছে আবার তাড়া করে ফিরেছে দানবের মতো। শহর নিয়ে রচিত হয়েছে অসাধারণ সব কবিতা।

প্রাণের বাংলার এই সংখ্যায় প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো ‘কবিদের ধূসর শহর’।

কবিদের শহর কেমন হয়? সেখানে রাত্রি বুঁদ হয়ে থাকে নক্ষত্রভর্তি আকাশে, বসন্ত সেখানে চিরকালের ঋতু? সেখানে বৃষ্টি পড়ে বারো মাস? কবিতায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নগরের ধারণা বিক্ষত, অস্থির, নিরাশ্রয় আর প্রেমহীন।কবি সমর সেন কলকাতা শহরে লম্পটের পদধ্বনি শুনতে পেয়েছিলেন। বাংলাদেশের কবি হুমায়ূন কবির লিখেছিলেন, ‘এ কেমন শহরে তুমি দাঁড়ালে সখা, কৃষকের পদপাত নেই!’

শহর আসলে কবিদের কাছে চিরকাল এক উদ্বাস্তু, উন্মূল ভূগোলের ধারণা।দু‘দুটো বিশ্বযুদ্ধ পেরিয়ে এসেও নগর কবিদের আশ্রয় হয়ে ওঠেনি। হয়তো কখনোই ছিলো না। কিন্তু কবিদের জীবনযাপন আর কবিতার সাক্ষী হয়ে পৃথিবীতে আলোচিত হয়েছে বহু শহর। পরবর্তী সময়ে দর্শনীয় স্থান হয়ে উঠেছে শহরগুলো। স্পেনের কবি লোরকা নিউইয়র্ক শহরের কবি ছিলেন না।লেখাপড়া করতে গিয়েছিলেন সেখানে। কিন্তু সেখানে কবির শহরবাসের গল্প কিন্তু বিদ্যুতের ফলার মতো চমকে দিলো তাঁর ‘স্লিপলেস সিটি’ কবিতায়। এক নির্ঘুম শহরের অন্তর্গত রক্তক্ষরণের ছবি সেই কবিতার প্রতিটি চরণে আজও পাঠককে জানান দেয় ক্ষত-বিক্ষত শহরের অর্ন্তলোককে। লোরকার নিউইয়র্ক শহরের নির্ঘুম রাত্রি জীবনানন্দ দাশের কাছে এসে ধরা দেয় লিবিয়ার জঙ্গল হয়ে। কেমন সে জঙ্গলের ধারণা? কে দেখেছে লিবিয়ার জঙ্গল রাত্রিবেলা!কিন্তু শহরের রাত্রিকে লিবিয়ার জঙ্গলের সঙ্গে তুলনা করে জীবনানন্দ দাশ যেন এক উদ্বাস্তু শহরকেই উড়িয়ে আনলেন নিউইয়র্কের আত্মা থেকে। ‘রূপসী বাংলা’র মায়াময় জগত থেকে সেই শহর জীবনানন্দের অনুভূতিকে তীব্র এক অনুভবের যাত্রায় ফিরিয়ে দিলো। তাঁর কাছে শহর হয়ে উঠলো রাস্তার বিকেল, বন্দরের ওষ্ঠ, লাশকাটা ঘর, সরোজিনীর মৃত্যু। ‘রাত্রি’ কবিতায় এলো ফিয়ার লেন, টেরিটিবাজার, নিগ্রো যুবক যা জীবনানন্দের গ্রামের মোহনীয় অথচ নিস্তরঙ্গ রূপকে ভেঙে দিলো।

শহরের গল্প কবিরা বলে যেতে থাকেন তাদের নিজস্ব ক্ষরণের সঙ্গে মিলিয়ে। প্যারিস শহরে কবি শার্ল বোদলেয়ারের আবাসস্থল ছিলো পিমোডান নামে এক হোটেল। ওই হোটেলের একটি ঘরে বসেই তিনি লিখেছিলেন তাঁর সমালোচিত অথচ বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘ফ্লাওয়ার্স অফ ইভেল-এর বেশিরভাগ কবিতা। ওই হোটেলের কাছেই হ্যাশিশসেবীদের ক্লাবে যোগ দেন বোদলেয়ার। শহর জীবনের সব অসঙ্গতি আর নিজের ভেতরের যন্ত্রণার স্বরকে হয়তো তিনি মুছে দিতে চেয়েছিলেন হ্যাশিশের উন্মত্ত নেশার কাছে সমর্পিত হয়ে। উশৃংখল, উৎক্ষিপ্ত এক সময় বয়ে গেছে তখন প্যারিস শহরে। নেশা, গণিকা, অসুখ আর জীবনের প্রতি অনাস্থা নরকের ফুল হয়ে ফুটে উঠেছে তাঁর কবিতায়।

এই ঢাকা শহর কবি আবুল হাসানকে খণ্ড-বিখণ্ড করেছিলো যন্ত্রণার করাতে। তিনি ভিতর বাহির কবিতায় লিখলেন, ‘আমার শরীর খোঁড়, দুঃখময় আত্মার গাঁথুনী, দ্যাখো আমি ঠিকই খণ্ডিত ইটের মতো খুলে যাবো সহজেই, কিছুই থাকবো না।’

দুঃখময় শহরকে প্রত্যাখ্যান করতে চেয়েছিলেন হাসান। কিন্তু পেরেছিলেন কি? তাঁর অভিন্ন হৃদয় কবি বন্ধু নির্মলেন্দু গুন শহরবাসের অসারত্বকে নিজের কবিতায় প্রকাশ করেছেন এভাবে, ‘এ শহরে রাত্রি এলে মাতৃহীন/ গণিকার স্তন্য চুষে খাই।’শহর একজন মানুষকে কোথায় যে একা করে দেয়, উদ্বাস্তু করে দেয় তার ধারাবাহিক তো লিখে চলেন কবিরাই।

আবুল হাসান জীবনের হাত ছেড়ে দিয়েছিলেন মাত্র ২৮ বছর বয়সে। আর আর্তুর র‌্যাবো ৩৭ এ। স্বভাবে ভীষণ বোহেমিয়ান এই দুই কবি তাদের শহরবাসের জীবনকে যেন পুড়িয়ে ফেলে শুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। নগরে এক ধরণের আশ্রয়হীন কবিরা এভাবেই যাপিত জীবনের আয়ুকে সংক্ষিপ্ত করে আনতে চান। আবুল হাসান ভালোবেসেছিলেন এই ঢাকা শহরের আরেক কবি সুরাইয়া খানমকে। তাদের প্রেম পরিণতি পায়নি কোনোদিন। বন্ধু গুণকে চিঠিতে হাসান একবার লিখেছিলেন, তিনি নির্জনতা খুঁজছেন। সুরাইয়াও তাকে আর সেই নির্জনতা দিতে পারেন না। আবুল হাসানের এই চিঠি নগরে নির্বাসিত বহু কবির আত্মাকেই উন্মোচিত করে দেয়। আবুল হাসান র‌্যাবোর মতোই ঘুরে বেড়িয়েছেন এই শহরে। সুইপার কলোনীর মদের দোকান, রথখোলার দেশী মদের আড্ডায় নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ক্ষয় করে ফেলেছেন নিজের আত্মা।কী খুঁজেছিলেন আবুল হাসান? নির্জনতা, মৃত্যু?

র‌্যাবোও প্যারিস শহরের অলিগলি, নেশার ঠেক আর নিষিদ্ধ পল্লী চষে বেড়িয়েছেন। তার ঠোঁটে মাটির তৈরি ধূমায়িত পাইপ। হাতে তুলে নিয়েছিলেন তীব্র নেশার পাত্র। যেন জীবনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাতে চেয়েছিলেন কবি। নগরের নরকের এক ঋতুর স্বাদ নিতে চেয়েছিলেন হয়তো। প্যারিস শহরের জীবনে তিনিও বেছে নিয়েছিলেন আত্মধ্বংসকারী জ্বর। ঝড় উঠেছিলো কবি পল ভ্যালেরির সঙ্গে তাঁর সমকামী সম্পর্ক নিয়ে।

কলকাতার কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ও এমনি খুঁজে বেরিয়েছেন কলকাতার তলায় আরেকটি কলকাতাকে।  রাতের পর রাত শক্তি, সুনীল, তুষার রায় এবং আরও অনেক কবি ঘুরে বেড়িয়েছেন সেই শহরে। কী খুঁজেছেন তারা নগরাত্মার কাছে? সেই অন্বেষণের কিছু চিহ্ন রয়ে গেছে তাদের কবিতায়। তাঁদের অস্থির দিনলিপি হয়তো ধূসর শহরের কাছে তৈরি করেছে কিছু ঋণও।

কবিদের ধূসর শহরে পানশালার দেয়াল জানে তাদের  গল্প। জানে পতিতাপল্লীর ঘর, যৌনকর্মীদের বারোয়ারি ভঙ্গি। নেশার আচ্ছন্নতা তাদের মনে রাখে। মনে রাখে উচ্ছন্নতা, ক্লান্তিবোধ।

নগর জীবনের বিমুখতা, মায়াহীন বেঁচে থাকা কবিরা গ্রহণে অক্ষম। তাই তারা কখনো কখনো ধূসর শহর ছেড়ে চলে যান কোনো দূর মফস্বলে, গ্রামে। সেই প্রত্যাবর্তনের পথে তাদের জন্য কী অপেক্ষা করে থাকে সে ভিন্ন গল্প। নির্দয়, অনাত্মীয় শহর সেসব গল্প জানতে আগ্রহীও নয়। একমাত্র কবিতাকে অবলম্বন জেনে নগরে কবিরা হয়ে থাকেন নিঃসঙ্গ প্যারাট্রুপার।মেঘদল থেকে নেমে আসা একলা মানুষ। তবু পৃথিবীর বিভিন্ন শহর বিখ্যাত হয় কবিদের-ই ভবঘুরে জীবনের আলোতে।

ইরাজ আহমেদ
ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box