কবি রফিক আজাদ : আপনারে ভুলতে পারি না ওস্তাদ!

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লুৎফর রহমান রিটন, লেখক

কবি রফিক আজাদের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ছিলো অপরূপ দ্যুতি মাখা। তিনি আমাকে দেখলেই তাঁর চোখেমুখে এক ধরণের আনন্দ-ঝিলিক ফুটে উঠতো। গোঁফজোড়াও হেসে উঠতো তাঁর। আর আমি মেতে উঠতাম শিশুতোষ উচ্ছ্বাসের প্রবল মূর্ছনায়। আসলে রফিক আজাদের চরিত্রে এমন একটা প্রভাব বিস্তারী শক্তি ছিলো যে শক্তির কাছে টিকে থাকাটাই মুশকিল ছিলো। এটা আমার জানা ছিলো বলেই তাঁকে দেখা মাত্র বিপুল শক্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়তাম আমিও, জাস্ট ক্রিজে টিকে থাকার জন্যে। সেটা রফিক ভাই বুঝতেন এবং আমাকে পরাভূত করার মহান দায়িত্ব থেকে নিজেই অব্যাহতি নিতেন। উলটো আমাকেই ভাসিয়ে নিতেন হাস্যরসের তীব্র স্রোতে।
এতো স্মৃতি তাঁকে ঘিরে! কোনটা রেখে কোনটা বলি! একটা ঘটনার কথা বলতেই হয়।

১.
আশির দশকের শেষান্ত।

রফিক আজাদের সঙ্গে লেখক

বাংলা একাডেমি প্রেসে কী একটা কাজে গিয়েছি। আফজাল সাহেব ছিলেন প্রেস সেকশনের বিশেষ করে কম্পোজ সেকশনের প্রধান। তাঁর টেবিলের সামনে রফিক আজাদসহ একগুচ্ছ মানুষ। (কবি আসাদ চৌধুরীও কি ছিলেন?) বিরাট আড্ডা চলছে। আমাকে দেখেই হইহই করে উঠলেন রফিক ভাই–আরে মিয়া আসো আসো। তোমাকেই তো খুঁজছি। এই যে দেখো এই কবিতাটায় একটু চোখ বুলাও তো, কোনো ভুল মানে বানান ভুল বের করতে পারো কি না।
প্রুফের বান্ডেলটা ছিলো মাসিক ‘উত্তরাধিকার’এর প্রকাশিতব্য সংখ্যার। রফিক আজাদের কবিতার শিরোনামটি ছিলো–‘বালক ভুল করে নেমেছে ভুল জলে’। কবিতাটা আমি উচ্চকণ্ঠে পাঠ করতে করতে প্রুফ সংশোধন করছি। টুকটাক একটা দু’টো খুচরো ঝামেলা বের করছি। এবং মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছি। ‘বালক ভুল করে পড়েছে ভুল বই/পড়েনি ব্যাকরণ পড়েনি মূল বই…।’ আমার বুঝতে বাকি থাকে না কবিতাটা কিঞ্চিৎ ছড়াগন্ধি বলেই আমাকে পড়াচ্ছেন রফিক ভাই। পুরো কবিতাটা পাঠ করে প্রবল উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়লাম আমি–আরে রফিক ভাই! কবিতায় আপনার হাতটা তো দারুণ! লেগে থাকলে একদিন আপনার হবে। বাংলা কবিতায় আপনার সম্ভাবনা বিপুল।

আমার এরকম মন্তব্যে এমন উচ্চকণ্ঠে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন রফিক ভাই যে একবার মনে হলো বাংলা একাডেমি ভবনটাই বুঝি ভেঙে পড়বে হুড়মুড়। অট্টহাসি থামলে তিনি আমার পিঠে কঠিন একটা চাপড় মেরে বলেছিলেন–‘বেটা, এই কারণেই তোমাকে ভালো লাগে। মিয়া, তুমি একটা জিনিসই বটে। হাহ হাহ হাহ।’

২.
রফিক ভাইকে নিয়ে খুব বড় একটা স্মৃতিগদ্য লিখবো বলে সেই কবে থেকে বসে আছি! কিন্তু লিখতে বসলেই চোখ কি রকম ঝাপসা হয়ে আসে। এক প্যারা দুই প্যারা লেখার পর আর এগোতেই পারি না। ভালোবাসা আসলে শক্তি যোগায় যেমন, তেমনি দুর্বলও করে দেয়। রফিক ভাইয়ের ক্ষেত্রে আমার দ্বিতীয়টি ঘটে। আপার ল্যাপটপ স্ক্রিনটা কী রকম আবছা আর ভেজা ভেজা মনে হয়। কী বোর্ডে আঙুলগুলো থেমে থাকে। কোনো বাক্যই রচিত হতে চায় না। এক ধরণের কষ্ট আর বেদনাবোধ আমাকে স্থবির করে দেয়।
রফিক আজাদ নামের মানুষটাকে আমি ভালোবাসতাম খুব।
১৯৯৫ সালের আগস্ট মাসে ‘ছোটদের কাগজ’ নামে একটা মাসিক পত্রিকার প্রকাশনা শুরু করেছিলাম। পত্রিকাটির সূচনা সংখ্যায় কবি রফিক আজাদ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিয়ে একটা ছড়া লিখেছিলেন আমার প্যাঁচে পড়ে। জানামতে ওটাই ছিলো কবি রফিক আজাদের লেখা প্রথম এবং একমাত্র ছড়া।

৩.
আমাদের বন্ধু আবেদীন কাদের কিছুদিন আগে কবি রফিক আজাদকে নিয়ে একটা স্ট্যাটাস লিখেছিলেন। ওখানে আমি মন্তব্য করতে গিয়ে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছিলাম।
লিখেছিলাম–মীনাকুমারী ও রফিক আজাদকে নিয়ে রচিত আপনার স্ট্যাটাসটা আমাকে স্মৃতিতাড়িত করলো। বিশদে বলি।–

সস্ত্রীক রফিক আজাদ

বঙ্গবন্ধু এভেনিউতে ‘খাবার দাবার’-লাগোয়া ভবনটির তিনতলা থেকে ‘মুখোমুখি’ নামে একটি পাক্ষিক ট্যাবলয়েড পত্রিকা প্রকাশিত হতো। মুখোমুখি ছিলো বাংলাদেশে প্রথম ফটোকম্পোজে মুদ্রিত চাররঙা ট্যাবলয়েড সিনে পত্রিকা। পত্রিকাটি প্রকাশের মাসখানেক আগে এক বিকেলে চলচ্চিত্র সাংবাদিক (চিত্রালী) আবদুর রহমান আমাকে ধরে নিয়ে গিয়ে সেই অফিসে একটা ঝকমকে চেয়ার-টেবিলে বসিয়ে দিলেন। বললেন–আমি পত্রিকা করছি। তোমাকে থাকতেই হবে। প্রথম সংখ্যা থেকেই প্রিন্টার্স লাইনে আমার নাম ছাপা হলো সহকারী সম্পাদক হিশেবে। পত্রিকার ডিক্লারেশন ছিলো আলমগীর ফয়েজ নামের এক ভদ্রলোকের নামে। বিটিভির সংবাদ পাঠিকা লায়লা বানুর স্বামী ছিলেন আলমগীর ভাই। খুব আমুদে মানুষ ছিলেন তিনি। আমার সঙ্গে কথা বলতেন ঢাকাইয়া এক্সেন্টে। তিনিই ছিলেন প্রকাশক, মুখোমুখির। সম্পাদক আবদুর রহমান। এক সংখ্যায় মীনাকুমারীকে নিয়ে একটা বড়সড় ফিচার ছাপা হবে। আমি বললাম, এই ফিচারের সঙ্গে একটা কবিতা গেলে ভালো হয়। আমি যোগাযোগ করলাম রফিক আজাদের সঙ্গে। বললাম–টাইম নাই ওস্তাদ কাইলকাই লাগবো একটা কবিতা। মীনাকুমারীর উপ্রে ফিচার যাইবো। এক হাতে কবিতা দিবেন অইন্য হাতে সম্মানী লইবেন। বাকীর কারবার নাই। অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে তিনি আমাকে বলেছিলেন–নগদে যখন, তখন পাইবা। এবং রফিক আজাদ অবিশ্বাস্য কম সময়ে এক দিন পরেই আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন তাঁর অসামান্য একটা কবিতা–‘দুঃখের অপর নাম মীনাকুমারী’। আহা, আজ আপনার স্ট্যাটাসটা পড়ে দুর্দান্ত সেই কবিতাটার উৎস জানা হলো। কী কাকতালীয় ব্যাপার। আপনি ফিচারটা পড়ালেন। তাঁর মাথায় মীনাকুমারী খেলা করছিলো আর ঠিক সেই সময়েই আমি কী না তাঁর কাছে কবিতা চাইতে গেলাম মীনাকুমারী বিষয়েই! জীবনে কতো রহস্যই না থাকে!

৪.
রফিক আজাদের সঙ্গে আমার দারুণ কয়েকটা ছবি আছে, বিভিন্ন সময়ের। পুরনো একটা ছবি খুঁজে পেলাম। ছবিটা তুলেছিলো বিখ্যাত আলোকচিত্রি আমাদের কন্যা শাওলির বর নাদিম ইকবাল। ছবির ক্যাপশনে আমি লিখেছিলাম মাত্র দুটি বাক্য–

‘কবিতার মাঝখানে পড়ে স্যান্ডুইচ অবস্থা ছড়ার!
১৭ অক্টোবর ২০১৫ শনিবার দুপুরে কানাডার টরন্টোতে দেলওয়ার এলাহীর বাড়িতে বাংলা কবিতার দুই কৃতিপুরুষ রফিক আজাদ এবং আসাদ চৌধুরীর সঙ্গে ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন।’

আজ তাঁর প্রয়াণ দিবস।
আপনারে ভুলতে পারি না রফিক ভাই। কেনো চইলা গেলেন! ভালো থাইকেন ওস্তাদ!

ছবি: লেখক ও গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]