কমলকাকুরা শুধু গল্প গাথা হয়ে থেকে যায়…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সুরঙ্গমা রায়চৌধুরী দাসগুপ্ত

তখন পাড়া ছিল সব গায়ে গায়ে লাগানো,আর একেকটি পাড়ার হর্তাকর্তাবিধাতা ছিলো একেকজন মস্তান।কখনো বা একজনের দখলে থাকতো একাধিক পাড়া।আমার ছেলেবেলার পাড়াটি ছিলো রাসবিহারী মোড় আর উজ্জ্বলা সিনেমা-হলের মাঝামাঝি,শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী রোডের ওপর,কালীঘাট পার্কের ঠিক উল্টো দিকে।বেশ জমজমাট জায়গা, কালীঘাট পার্কে সকাল-বিকেল ফুটবল, বাস্কেটবল,লাগোয়া যোগেশ মাইম হলে স্বয়ং যোগেশ দত্ত মহাশয়ের মাইম প্রশিক্ষণ ক্লাস,বিকেলবেলা মাঝেসাঝেই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। তিনতলার খড়খড়ি-দেওয়া জানলায় দাঁড়িয়ে থাকলে কাকভোর থেকে নিশুতরাত পর্যন্ত বাস- ট্যাক্সি- টানা রিক্সার মিছিল (অটোর আবির্ভাব হয়নি তখনো কোলকাতায়), আর ছিলো ঘটাংঘটাং আওয়াজ তুলে মন্থরগতি সরীসৃপের মতো ট্রাম।আদিগঙ্গায় বান(হাই টাইড) এলে গলগলিয়ে ঘোলাটে জল ঢুকে থৈথৈ করতো সামনের রাস্তা,পাশের গলি।পালাপাব্বনে বেড়ে যেত কালিঘাট মন্দির ফেরত মানুষের যাতায়াত,দেহাতী মহিলাদের মাথায়,সিঁথিতে লেপা থাকতো কমলারঙের মেটে সিঁদুর।তারপর একসময়ে শুরু হলো পাতালরেলের কাজ।রাস্তা খুঁড়ে খুঁড়ে ইয়াব্বড় বড় গর্ত,বর্ষাকালে তাতে জল জমে মশাদের আনন্দযজ্ঞ,মাঝেমধ্যে ধস, রাস্তাজুড়ে ছড়ানো বিশাল বিশাল লোহার বীম, হাইড্রা-ক্রেন, ডায়নোসরের মত দেখতে কীসব মেশিন দিয়ে ক্রমাগত বাড়ি মেরে মেরে বীমগুলোকে মাটির মধ্যে পোঁতা হতো,সেই আওয়াজে শুধু যে মাথা দপদপ করতো তাই নয়, বাড়ির কড়িবরগার ছাদও কেঁপে কেঁপে উঠতো।ছিলো দিনভর খাটুনির শেষে সন্ধ্যে ঘন হয়ে নামলে তাঁবুর বাইরে বসে বিহারী শ্রমিকদের ছাতু মাখার থালা বাজিয়ে অদ্ভুত সুরে গান।

আর ছিলো ঝগড়া আর মারামারি,এতটাই নিয়ম করে যে কোনো কারণে কিছুদিন গ্যাপ পড়ে গেলে মনটা উসখুস করে উঠতো।কী কী কারণে হতো সেসব এখন আর ভালো মনে নেই,তবে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান ম্যাচের সন্ধ্যে আর দোলের দিন দুপুরবেলা- এই স্লটদুটো ছিলো বাঁধা।শুরুতে লক্ষণকাকুর পান-বিড়ির দোকানের পাশের রোয়াকে বসে আড্ডা,তা থেকে পা- টানাটানি হয়ে তক্কাতক্কি,তারপর তুমুল ঝগড়া, হাতাহাতি-ধস্তাধস্তি অবধি গড়াতো। দোলের দিন অবশ্য এর সঙ্গে সোডার বোতল ছোঁড়াছুঁড়িও চলতো, পেটে দু-পাত্তর পড়তো বলেই সম্ভবত। আর এইসব ‘বাওয়াল’, প্রতিটিই, অনিবার্যভাবে শেষ হতো কমলকাকুর হস্তক্ষেপে। কমলকাকু, আমাদের পাড়ার একমেবাদ্বিতীয়ম মস্তান-কাম-রবিনহুড।চলাফেরায় জেনসন অ্যান্ড নিকলসনের ‘হোয়েনেভার ইউ সী কালার, থিঙ্ক অফ আস’গোছের একটা ব্যাপার থাকলেও কথাবার্তায় ছিলো এক আপাত- বৈষ্ণবোচিত বিনয়। আবার যেকোনো উত্তপ্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে এক্কেবারে অন্য অবতারে অবতীর্ণ হত কমলকাকু। তখন কারো সাধ্যি ছিল না মুখের ওপর একটা কথা বলার।এই প্রশ্নাতীত কর্তৃত্বের উৎস কী ছিলো আমার জানা নেই। কোনো রাজনৈতিক হোমড়াচোমরার কাছে তার টিকিটি বাঁধা ছিলো কিনা সেসব বুঝতাম না ওই বয়সে। ছিলো হয়তো, তবে কথায় কথায় সেই জুজু দেখিয়ে বশ্যতা বা সম্ভ্রম আদায় করার অভ্যেস ছিলো না একেবারেই, টাকাপয়সাও যে প্রচুর কামিয়েছিল তেমনটিও নয়। খুব ছোটোবেলার একটা ছবি এখনো আবছা মনে পড়ে, কী কারণে যেন আমার ঠাকুমা কমলকাকুকে বকাঝকা করছেন(চাকরিবাকরির চেষ্টা না করে পাড়ায় মাতব্বরি করে বেড়ানোর জন্য বোধহয়), আর কাকু ভিজেবেড়ালটির মত মাথা নীচু করে চুপ করে শুনে যাচ্ছে। দেখে কে বলবে, এই লোকটার সম্মতি ছাড়া পাড়ায় কোনো গাছের একটা পাতাও নড়ে না??

তারপর আস্তে আস্তে, বড় হতে হতে,একসময়ে হঠাৎ দেখি এই উদার,পরোপকারী, চওড়া সিনাওয়ালা মস্তানদের জেনারেশনটাই যেন ভ্যানিশ হয়ে গেছে ম্যাজিকের মত। আর সেই জায়গাটা নিয়ে নিয়েছে ‘মাস্টারমশাই আপনি কিন্তু কিছু দেখেননি’ ব্র‍্যান্ডের অস্ত্রধারী মস্তানরা, বিশেষ বিশেষ রঙ আর ছাপ্পা-ওয়ালা ঝান্ডাধারীরা, পৌনে-সোয়া-আধা সব নেতারা। রান্নাঘর থেকে শোয়ারঘর- শ্যেনদৃষ্টিতে নিয়ন্ত্রণে রাখেন সবকিছু, বাড়িওয়ালা- ভাড়াটে, শাশুড়ী- বৌমা, স্বামী-স্ত্রী, শ্রমিক- মালিক, প্রতিবেশী.. সব্বার ঝগড়া মেটান, ঝগড়া না থাকলে আগে ঝগড়া লাগান, তারপর মেটান।ফাঁকা পুকুর পেলেই বোজান আর ফাঁকা জমিজায়গা পেলেই প্রোমোটিং করেন। এঁদের একতলা টালির চালের বাড়ি দেখ-না-দেখ মার্বেলখচিত তিনতলা হয়ে যায়,উঠোনে লজঝড়ে সাইকেলের জায়গায় শোভা পেতে থাকে রয়াল এনফিল্ড। আস্তে আস্তে এরা ছড়িয়ে পড়তে থাকে,পাড়া থেকে ইস্কুল-কলেজ-আপিস, প্রোমোটিং থেকে ক্লাব,ক্লাব থেকে সিন্ডিকেট, সিন্ডিকেট থেকে রামনবমীর মিছিল…. সবজায়গায়।

কমলকাকুরা শুধু গল্প গাথা হয়ে থেকে যায় কোনো কোনো মানুষের মনে……..….

ছবি: গুগল ও লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]