কমলা-ফুলির গ্রামে…

অর্ণব সরকার

“কমলা-ফুলি কমলা-ফুলি,কমলালেবুর ফুল।

মংপু অর্কিড বাগানে

কমলা-ফুলির বিয়ে হবে, কানে মোতির দুল।।”

এই ছড়া আকারে গানটি এখন সম সময়ই বাড়িতে শোনা যায় কারণ গানটি বাড়ির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটির খুব পছন্দের। খাবার সময়, ঘুমানোর সময় backgound music এ গানটি চলছেই। হঠাৎ একদিন তার আবদার হলো, সে কমলাফুলি বিয়ে দেখবে, কমলাফুলির বিয়েতে নেমন্তন: খেতে যাবে। বাড়ির সবাই পড়লাম চিন্তায়, তার ইচ্ছা কিভাবে পূরণ করা যায়। খোঁজ শুরু হলো কমলা-ফুলি কে কোথায় পাওয়া যাবে? তার পর তার বিয়ে, সঙ্গে নেমন্তন: খাওয়ানো। অনেক ভেবে উপায় একটা বেরোলো। কাছাকাছি কমলা-ফুলি( কমলা লেবু আর কমলা লেবুর ফুল) এর সবচেয়ে ভালো খোঁজ পাওয়া গেলো একটি গ্রামে যার নাম “সিটঙ” যাকে অনেকে কমলালেবুর গ্রাম ও বলে। জায়গা ঠিক হবার পর দিনটি ও ঠিক করে ফেলা হলো। তিনি তো সারাদিন একটাই কথা জপে যাচ্ছেন আমরা কবে যাবো, আর কতদিন বাকি। এইভাবে সেই দিনটি এসে গেল। সিটঙ যাবার অনেকগুলো রাস্তা থাকলেও, আমরা মংপু হয়ে যাবো বলে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম। যাবার পথে সেবক মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে এগিয়ে চললাম। শান্ত, সবুজে তিস্তার পাশ দিয়ে এগিয়ে চললাম। রোম্ভির কিছুটা আগেই বামদিকে খাড়াই উঠে গেলাম মংপুর রাস্তায়। এর পর এঁকেবেঁকে চলতে চলতে পৌছালাম মংপু। প্রথমে আমরা দেখলাম কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের বাড়ি যা এখন ঠাকুরের ব্যবহৃত জিনিসের সংগ্রহশালা। উনার বসার ঘর, স্নানের ঘর, ব্যবহৃত আসবাবপত্র সবকিছুই ঘুরে দেখলাম। তারপর বেরিয়ে পড়লাম অর্কিড নার্সারি দেখার উদ্দেশ্যে। ওখানকার caretaker এর কথায় এখন অর্কিড এর উপযুক্ত সময় না হওয়ায় অর্কিডের সংখ্যা অনেক কম আছে। জায়গাটি চারিদিক টা ভালো করে ঘুরে আমরা রওনা দিলাম সিটঙ এর উদ্দেশ্যে। যাবার পথে যোগিঘাটটা দেখে নিলাম। যোগিঘাট হলো রিয়াঙ নদীর ওপর একটি ব্রিজ এবং ছোট একটা পাহাড়ি জনপদ।

মংপুতে রবীন্দ্র সংগ্রহশালা

এর পর কিছুটা এগিয়ে যেতেই চলে এলো আমাদের গন্তব্য। রুম এ পৌঁছে দুপুরের খাওয়া দাওয়া সেরে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে বেরোলাম আশেপাশের গ্রামটা ঘুরে দেখতে। চারিদিকটা দেখে মনে হচ্ছে কেউ যেন কমলা রং বালতিতে গুলে গাছে গাছে ছড়িয়ে দিয়েছে। তিনি তো চারিদিকে গুটি গুটি পায়ে দৌঁড়ে বেড়াচ্ছেন, কমলা লেবু কুড়িয়ে একজায়গায় জড়ো করছেন। সঙ্গে গুন গুন করে চলেছেন ” কমলা-ফুলি, কমলা-ফুলি”। বিকেলটা গরু, ছাগল, মুরগিদের সঙ্গে কমলা বাগানে তার ভালোই কাটলো, সঙ্গে আমাদেরও। আর সন্ধ্যাটাতো ছিলো মোমো আর মোমোময়। ঘরের জানালায় বসে পাশের পাহাড়ের মিটমিট করে জ্বলা আলোর রূপ দেখতে দেখতে কখন রাত্রি হয়ে গেল টেরই পাওয়া গেলো না।

আহা কি দারুন

রাত্রিটা জম্পেশ করে ঘুমিয়ে সকাল সকাল উঠে হাটাপথে বেরিয়ে পড়লাম সকালের সিটঙ এর সৌন্দর্য দেখতে। দেখে তাড়াতাড়ি ফিরে এলাম, কারন আজ আশেপাশের জায়গা ঘুরে দেখতে যাবো। সকালের খাবার পালা সেরে আমরা প্রথম গেলাম অহলদাড়া দেখতে। সেখানে দাঁড়িয়ে সামনে যা দেখলাম তা ভাষায় বর্ণনা করার ক্ষমতা আমার নেই তার সাক্ষ্য হিসেবে কিছু ছবি দিলাম। সঙ্গে তার (কাঞ্চনজঙ্ঘা) দেখাও পেলাম। আর আমাদের সঙ্গে ছিলো নানা রঙের প্রচুর প্রজাপতি। এরপর আমরা সেখান থেকে বেরিয়ে গেলাম একটা পুরোনো লেপচা মনাস্ট্রি দেখতে। দেখলাম সেখানকার কিছু কিছু ইতিহাসও জানলাম। এরপর আমাদের ড্রাইভার ভাই আমাদের নিয়ে গেল কাছের একটা সুন্দর কমলা বাগানে। কমলাবাগানটিতে কিছুটা সময় কাটিয়ে ফেরার পথে একটা পুরনো সময়ের গির্জা দেখে রুমে ফিরে এলাম।

লজ্জায় সে মেঘের আড়ালে চলে গেল

এসেই আমরা দুপুরের ভোজনটা সেরে নিলাম। সঙ্গে চলছে ম্যাডামের গণনা, সে ভাবছে তার কমলাফুলি বিয়েতে তখনও পর্যন্ত তিনবার নেমন্তন: খাওয়া হয়ে গেলো। আমি বললাম “এখনো একবার বাকি মাম্মাম”। তখন তার খুশি কে দেখে। সে চললো তার নতুন বন্ধুদের(homestay -র চারটি পোষ্য) সঙ্গে খেলা করতে। আর আমি চললাম সন্ধ্যাবেলায় থংবার স্বাদ নেবার ব্যবস্থা করতে। এরপর সন্ধ্যায় থংবার’র নিতে নিতে আকাশের দিকে তাকাতেই দেখা গেল মেঘ সরে পূর্ণিমার চাঁদ জ্বল জ্বল করছে। যেন সেও তার লোলুপ দৃষ্টি নিয়ে আমার থংবার’র দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু তাকে চেখে দেখার আবদার করতেই সে যেন লজ্জায় মেঘের আড়ালে মুখ লুকালো। কিছু পর আমিও চললাম ঠান্ডা থেকে বাঁচতে লেপের আড়ালে। পরদিন ফেরার পালা।

বাগোরার কিছুটা আগে থেকে তার দর্শন পাওয়া গেলো।

সকালে উঠে আমরা প্রাতঃরাশ সেরেই সবাইকে বিদায় জানিয়ে ফেরার জন্য রওনা দিলাম। ম্যাডাম ও তার বন্ধুদের ছলছল চোখে বিদায় জানালো। এরপর আমরা চিমনি, বাগোড়া, কার্শিয়াং হয়ে শিলিগুড়ি ফিরলাম। ম্যাডাম ঘরে ঢুকেই বলে বসলো “বাবা আবার কবে যাবো কমলা-ফুলির গ্রামে?” আমরাও ম্যাডামের প্রশ্নের উত্তর খোঁজা শুরু করলাম। খুঁজে পেলেই আপনাদেরও জানাবো।

ছবি: লেখক