করোনাকালীন মানসিক স্বাস্থ্য …

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সাদিয়া নাসরিন

আমার আব্বার একটা মাইল্ড স্ট্রোক হয়েছে। এমনিতে আব্বা যথেষ্ট শক্ত মানুষ। তাঁর শারিরীক মানসিক জোর যে কোন যুবকের চাইতে ভালো। এখনো তিনি আমার চাইতে দ্রুতগতিতে তিন চার তলা সিঁড়ি ভাঙেন। যে কোন বিপদে পাহাড়ের মতো স্থির থাকেন। সারাজীবন বিশাল যৌথ পরিবারের ঝড় ঝাপটা একহাতেই সামলেছেন।

সেই মানুষটির মাথা এবং মন হঠাৎ একসঙ্গে ঝাঁকি খেয়েছে। প্রচন্ড সামাজিক মানুষটির মন এই হঠাৎ অবরুদ্ধতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। কর্মাসক্ত একজন মানুষ দীর্ঘমেয়াদি লকডাউনের কর্মহীনতা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা নিতে পারেননি। সন্তানবৎসল একজন বাবা যখন জেনেছেন তাঁর ছোট ছেলেটি যে হাসপাতালের ডাক্তার, সেই হাসপাতালের পিওনের করোনা, সেই দুশ্চিন্তা বহন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি।

এইরকম চিত্র হয়তো ঘরে ঘরে দেখা যাবে কিছুদিনের মধ্যেই। আজ সাতান্ন দিন ঘরে আছি আমরা। এই দীর্ঘ সময়ে আমাদের সঙ্গে আছে ভয়, উৎকন্ঠা, অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক, উদ্বেগ, ক্লান্তি এবং বিষন্নতা। আমরা কেউই জানিনা কবে এই পরিস্থিতি থেকে আমরা মুক্ত হবো। বা মুক্ত হলেও কবে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে আমাদের জীবন তাও জানা নেই।

দীর্ঘ মেয়াদী এই করোনা প্যানডেমিক একদিকে যেমন ঝুঁকির মুখে ফেলেছে আমাদের শারিরীক স্বাস্থ্য, তেমনিই নিরবে ক্ষতি করছে মানসিক স্বাস্থ্যের।

মার্কিন চ্যারিটি অর্গানাইজেশন হেনরি জে কায়সার ফ্যামিলি ফাউন্ডেশন (কেএফএফ)এর লকডাউনে অবরুদ্ধ মানুষের উপর মার্চের মাঝামাঝি চালানো এক জরিপে দেখা গেছে একমাসে ৩২ শতাংশ মানুষ করোনভাইরাস সম্পর্কিত উদ্বেগ ও চাপে আক্রান্ত, যা দু সপ্তাহ পর বেড়ে ৪৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

এই সংখ্যা আরো বাড়বে। দীর্ঘমেয়াদী ডিপ্রেশন, ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসর্ডার, এংজাইটি, শুচিবায়ুর মতো মানসিক রোগে আক্রান্তের হার বাড়বে। বেড়েছে পারিবারিক সহিংসতা, দাম্পত্য কলহ, আরো বাড়বে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিতর্ক বাড়ছ, আরো বাড়বে।

ট্রমাটাইজড মানুষ যতো বেশি ডিসঅর্ডারে ভুগবে তত বেশি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া করবেন সবকিছুতেই। সবাইকে শ্রেণীশত্রু মনে করবেন। ভায়োলেন্ট হবেন, ভিন্ডিক্টিভ হবেন।

এর থেকে পরিত্রাণের উপায় হলো নিজের এবং পরিবারের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি মনোযোগী হওয়া। শরীরের যত্নে যতোকিছু করছি আমরা, মনটাকে নিয়েও ঠিক একইরকম গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্যের প্ল্যান এবং এক্সিকিউশন দুটোই করতে হবে ঠান্ডা মাথায়।

কারণ, শরীরে আর মনে ফিট থাকলে আপনি যুদ্ধটা করতে পারবেন। শরীর মনের ক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া করোনা জয়ের জন্য আর কোন অস্ত্র আপনার হাতে নেই। আপনি কি জানেন, এইসময়ে আপনি একজন মানুষ অসুস্থ হওয়া মানে আপনার পুরো পরিবার মানসিকভাবে ভেঙে পড়া এবং চলমান স্বাস্থ্য সেবার সংকটকে আরো একটু বেশি বাড়ানো!

সুতরাং এই করোনা যুদ্ধে আপনি সবচে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকাটা রাখতে পারেন কিন্তু নিজেকে সুস্থ রেখে স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর চাপ কমিয়ে। তাই নিজেকে সচেতন রেখে, সাবধানে থেকে, নিজের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রেখে, চারপাশের সামাজিক দায়িত্বগুলো যথাসম্ভব পালন করে নিজের স্বাভাবিক জীবনযাপন চলমান রাখাটাই এইসময়ের সবচে কার্যকর অষুধ।

তার জন্য মনটাকে খুব যত্ন করতে হবে।

**মনের যত্নের প্রথম ধাপ হচ্ছে আশেপাশের টক্সিক মানুষ গুলোকে ডিসকার্ড করা। এদের ত্রিসিমানায় না থাকা। নেগেটিভ এনার্জির মানুষ আপনার সমস্ত উদ্যোগকে প্রশ্ন তুলে, অহেতুক স্ট্রেস বাড়িয়ে আপনাকে ডিপ্রেশনের রোগী বানিয়ে ছাড়বে।

** করোনা নিয়ে বেশি বেশি ভাবা বন্ধ করুন। সারাক্ষণ ওয়ার্লড মিটার, গুগল, আপডেট আপনাকে উদ্বেগ আর ট্রমা ছাড়া কিছুই দেবেনা। মনে রাখবেন আতঙ্ক আর সতর্কতা এক জিনিষ না। এই দুইয়ের ফাইনলাইনটা বুঝলে আপনি সতর্ক থাকবেন, আতঙ্কিত নয়।

বিশ্বাস করুন, আপনি আপনি চব্বিশ ঘণ্টা কান্নাকাটি করলেও করোনা চলে যাবেনা। শহীদ হয়ে গেলেও করোনা তার আক্রমণ থামাবেনা। আপনি তিরিশ দিন এক তরকারি খেলেও করোনার একটুও করুণা জন্মাবেনা। বরং প্রোডাক্টিভ কাজে কনসেন্ট্রেড করুন। সামনের পরিবর্তিত অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে কর্মপরিকল্পনা করতে শুরু করুন।

**সবচে জরুরি কাজটা হলো যতোটুকু সম্ভব মন ভালো রাখা। তার জন্য যা করতে আপনার ভালো লাগে আপনি সেই কাজটাই প্রায়োরিটিতে নিয়ে আসুন। পড়ুন, লিখুন, যা খুশি করুন। রাঁধুন, নাচুন, গান করুন, প্রার্থনা করুন, প্রেম করুন, ভিডিও চ্যাট করুন, ইচ্ছে হলে সব মুহূর্তের ছবি ফেইসবুকে দিন। তবু আপনি আপনার মতোই আনন্দে থাকুন।

**ডিসিপ্লিনের কোন বিকল্প নেই কিন্তু। অবশ্যই নিয়মিত এবং সময়মতো বিশ্রাম নিতে হবে। আই রিপিট, নিয়মিত এবং সময়মতো। পর্যাপ্ত ঘুমাবেন এবং সেটা ঘুমের সময়েই। সারাদিন ঘুমানো এবং সারারাত জেগে থাকা কোন অবস্থাতেই সুস্থ মানসিক স্বাস্থ্যের লক্ষণ নয়।

**সংসারের নারীটির প্রতি যত্নবান হোন। বেশিরভাগ সংসারেই নারীই প্রাথমিক এবং একমাত্র কেয়ারগিভার। যে কোন সংকটে তার ওয়ার্ক স্ট্রেস এবং মানসিক চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। তাছাড়া নারীর প্রি মিন্স্স্ট্রুয়াল ডিপ্রেশন, পোস্ট মেটারনাল ডিপ্রেশন, হরমোনাল ইমব্যালেন্স এইসব আলাদা মনোযোগ দাবী করে। তার বিশেষ প্রযোজনগুলো প্রায়োরিটিতে রাখুন। তার প্রতি সংবেদনশীল আচরণ করুন। তাকে সহযোগিতা করুন।

** অবশ্যই এই সময় বাড়ির শিশু এবং বয়ষ্কদের বিশেষভাবে যত্ন নিন। মনে রাখবেন, যে কোন দুর্যোগে সবচেয়ে বিপদাপন্নতা এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন কিন্তু শিশু এবং বয়ষ্করা। বয়ষ্ক মানুষটি হঠাৎ শিশুর মতো অবুঝ হয়ে উঠতে পারেন, শিশুরা বয়ষ্কদের মতো অ্যারোগেন্ট হয়ে উঠতে পারেন। তাদের প্রতি সংবেদনশীল হোন। বিশেষ করে তাদের সামনে আপনাদের কোনরকম অসভ্য ঝগড়া বা সহিংসতা দেখাবেন না।

**দীর্ঘসময় একঘরে আটকে থাকার ফলে সঙ্গীকে মাঝেমাঝেই ভীষণ ইরিটেটিং লাগতে পারে স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু বিরক্ত লাগলেই খুটখাট শুরু না করে বরং নিজেকে একটু সময়ের জন্য বিচ্ছিন্ন করে ফেলে নিজের সঙ্গে সময় কাটান। বেঁচে থাকলে ঝগড়া ঝাটি করার অনেক সময় পাওয়া যাবে। কটা দিন না হয় এড়িয়েই গেলেন। না হয় ক্ষমাটা আপনিই করলেন! সরিটা না হয় আপনিই বললেন। বিশ্বাস করুন, হেরে গিয়েও চমৎকার জেতা যায়।

**কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। প্রার্থনা করুন। প্রার্থনা আপনাকে নত হতে শেখাবে, কৃতজ্ঞতা পরিবর্তিত অবস্থার সঙ্গে কোঅপ করতে সাহায্য করবে। ভেন্টিলেটরের কাছে যাওয়ার আগে দিনে একবার হলেও মনে করুন কী পরিমাণ নি:শ্বাস আপনি এ পর্যন্ত বিনামূল্যে প্রকৃতির কাছ থেকে নিয়েছেন। কী পরিমাণ স্নেহ ক্ষমা ভরসা আপনি মা বাবার কাছে পেয়েছেন। কী পরিমাণ ভালোবাসা আপনি মানুষের কাছে পেয়েছেন। কী পরিমাণ পুষ্টি আপনি প্রাণীর কাছ থেকে গ্রহণ করেছেন।সেইসব ঋণ স্বীকার করুন।

** সামর্থ্য অনুযায়ী দান করুন, মানুষের পাশে দাঁড়ান। বিশ্বাস করুন, দান আপনার মানসিক শক্তি বাড়াবে বহুগুণ। এবং একজন অসহায় মানুষ যখন আপনার হাতটি ধরে উঠে দাঁড়াবে, যে শান্তি আপনি পাবেন, তার কোন তুলনা হয় না। তাছাড়া অসহায় প্রতিবেশিকে সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করাটা মানুষ হিসেবেই কিন্তু আপনার নৈতিক সামাজিক দায়িত্ব।

**আপনি সেটা করতে পারলে ভালো, না পারলেও সমস্যা নেই। মানুষকে সাহায্য না করার অপরাধে কেউ আপনাকে বকবেনা। কিন্তু যে মানুষগুলো নিজের আনন্দে সর্বোচ্চ সামর্থ্য নিয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে তাঁদেরকে আক্রমণ করাটা মোটেও সুস্থতার লক্ষণ নয়।

**দয়া করে সারাক্ষণ ন্যাগিং করে নিজের ও অন্যের ডিপ্রেসন বাড়াবেননা। ফেইসবুকে কে খাবারের ছবি পোস্ট করলো, কে শাড়ির শো অফ করলো, কে ত্রাণের ছবি দিলো, কোন অনলাইন সেলার লাইভে আলো, সবকিছু নিয়ে আপনাকে স্ট্রেস কেন নিতে হবে বলুনতো? এরা তো কেউ চুরি ডাকাতি করছেনা। সবাই প্রাণপণ চেষ্টা করছেন এই দমবন্ধ পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক থাকার। এই চেষ্টাটাকে যতদুর সম্ভব ভালোবাসুন। না পারলে কিছুদিন সোশ্যাল মিডিয়া থেকে বিরতি নিন।

** যদি খুব বেশি ট্রমাটাইজড হয়ে যান, তাহলে প্রফেশনাল হেল্প নিন। বন্ধুদের মধ্যে যারা কাউন্সেলিং করতে পারেন তাদের সঙ্গে কথা বলুন। প্রয়োজনে ইমেডিকেশন করুন। পরিবারের সঙ্গে শেয়ার করুন।

** এই আমাদের সবার জীবনেই দুস্তর পারাবার পাড়ি দেওয়ার গল্প আছে। আছেনা? কতোবার আচমকা ঝড়ে নিশ্চিহ্ন হতে হতে, ধুলায় মিশে যেতে যেতে উঠে দাঁড়িয়েছিনা আমরা? সেইসব দিনের কথাগুলো মনে করুন। আপনি জানেন, এই দু:সময়ও আপনিই জয় করতে পারবেন। মানুষের শক্তি সীমাহীন। তাই নিজের ক্ষমতার উপর আস্থা রাখুন।

দিনে একবার হলেও মনে করুন, এই মৃত্যুজনপদ চিরদিন থাকবেনা, খুব দ্রুতই সব সবুজ হবে। কোন ঝড়ই চিরদিন থাকেনা। আঁধার যতোই ঘন হোকনা কেন, সূর্য উঠলেই তা কেটে যায়।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]