করোনার ডায়েরি ২

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কাজী জাওয়াদ, বার্মিংহাম থেকে

করোনা এখন পৃথিবীজুড়ে ভয়ানক এক অসুখ। মৃত্যুর চাদরের তলায় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে গোটা মানবজাতির অস্তিত্ব। থমকে গেছে মানুষের জীবন, থমকে গেছে দেশের পর দেশ। রুদ্ধশ্বাস আমাদের পৃথিবী। এমনি অবস্থায় নিজের ঘরেই বন্দী মানুষ। সেই বন্দী সময়ে ডায়েরি লিখছেন ইংল্যান্ড প্রবাসী সাংবাদিক, লেখক কাজী জাওয়াদ। তিনি দেশে প্রত্যক্ষ সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত ছিলেন লম্বা সময়। বিলেতে গিয়ে সাংবাদিকতা করেছেন বিবিস‘র বাংলা সার্ভিসে। প্রাণের বাংলায় এখন থেকে তার এই ডায়েরি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।

১৩/০৩/২০২০

বার্মিংহামে আক্রান্ত তিনজন বেড়ে হয়েছে মোট ৫ জন। সিটি কাউন্সিল জানিয়েছে সংখ্যাটা ১০ হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ঘটনা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানাবে। হয়তো তারপর তাদের কাজের চাপ এত বেড়ে যাবে যে অত ঘন ঘন সংবাদ বিজ্ঞপ্তি তারা দিতে পারবে না। তাই শুধু জটিল বা জরুরী কোন আক্রান্তের ব্যাপারে স্থানীয় সংবাদপত্রকে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানাবে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের খবর অনুযায়ী আমি ঝুঁকিপূর্ণদের দলে। বিশ বছর আগে হৃদয় অলিন্দে রক্তের প্রবাহ টিকিয়ে রাখার জন্য পাঁচটা ধমনী   কেটে ঘুরপথে নিতে হয়েছে। বাইপাস বললে সবাই চেনে। এখানে ডাক্তাররা বলে ক্যাবেজ বা বাঁধাকপি। করোনারী আর্টারী বাইপাস গ্রাফটিং বা সিএবিজি থেকে। এজন্য চিন্তার পারদটাও উপরে উঠছেনা তা হলফ করে বলা যাবেনা। বিলাতে আক্রান্তের সংখ্যা ৭৯৮ মৃতের সংখ্যা ১১।

১৪/০৩/২০২০

সিঙ্গাপুর থেকে বড়মা, মানে বড় ছেলের বৌ জানালো তারা ভালো আছে। নাতনী ইলমার স্কুল খোলা আছে কিন্তু কার্যক্রমে কাটছাট চলছে। আরো জানালো মালয়েশিয়ায় তাবলীগের এক জামাতে যাওয়া বেশ কয়েকজন আক্রান্ত হয়েছে। বিলাতে আক্রান্তের সংখ্যাটা এক হাজার ছাড়িয়ে হলো ১,১৪০, মৃতের সংখ্যা একটু লাফ দিয়ে বেড়ে হলো ২১। চিনে আক্রমনের রেখাচিত্রের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে এই বৃদ্ধি। তাহলে কি এটাই

১৫/০৩/২০২০

সপ্তাহের বাজার প্রায় শেষ হয়ে আসায় গিয়েছিলাম সেইনসবেরি সুপার মার্কেটে। সেখানে সব কিছু পেলাম না। বিশেষ করে টয়লেট রোল কেনা জরুরী হয়ে পড়েছিল। কিন্তু পুরো তাক খালি। সাধারনতঃ ৯টা রোলের প্যাকেট কিনি। একটা রোলও নেই। নুডলস, পাস্তা কিনতে যেয়ে দেখলাম দুটো প্যাকেট পড়ে আছে। কেউ নিচ্ছেনা। তুলে ট্রলিতে রাখলাম। মনে সন্দেহ হতে শুরু করেছে সংকট বাড়তে শুরু করলে খাবার পাওয়া যাবে তো! পাউরুটি কিনতে যেয়ে দেখি একটু বেশি দামের কম শর্করার রুটি আছে শুধু। আমার জন্য মন্দ না। তাই একটা রুটি বেশি নিলাম। হাত মোছার বা ধোয়ার কোন কিছুই পেলাম না। কয়েক প্যাকেট বিস্কুট কিনে ফিরে এলাম বাসায়। আগের দিন ফার্মেসিতে খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম তাদের কাছে কোন রকম মাস্ক নেই। স্যানিটাইজারও নেই। বিলাতে আক্রান্তের সংখ্যা ১৩৯১, দু’দিনেই পাঁচশো বেড়ে গেছে। একটু চিন্তা হচ্ছে, ঢাকায় কি অবস্থা। পত্রকুঞ্জ মানে আমাদের পারিবারিক গ্রুপে সকলের খবর পাই। পরিবারের সবার মধ্যে একটা চাপা আতংক রয়েছে। প্রথম আলো থেকে খবর পাচ্ছি, প্রবাসীদের দেশে ফিরে আসা নিয়ে আতংক আছে। কোন কোন প্রবাসীর উপর স্থানীয়্রা চড়াও হয়েছে এমন খবর পাচ্ছি ফেসবুকে। ভাবছি মানুষতো এমন হওয়ার কথা নয়। মানুষতো লড়ে, জয়ী হয়।

১৭/০৩/২০২০

সকালে হামিদ ভাই ফোন করেছিলেন। আমার বন্ধু। বয়সে একবছর কম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে এমএসসি করার পর বিলাতে চলে আসেন।বার্মিংহামেই তার সঙ্গে পরিচয় হলেও রাজশাহীতে হলে আমার এক বন্ধুর সঙ্গে একই ঘরে থাকতেন বলে ঘনিষ্ঠতা। দুই সঙ্গরোধীর মধ্যে আলাপ হলো। বললাম জীবনে আর দেখা হবে কিনা জানি না। কোন অন্যায় করে থাকলে মাফ করে দেবেন। আর অসুস্থ না হলে যেন মাঝে মাঝে ফোনে কথা হয়। কান্তা আর তার আয়ুর্বেদিক প্রশিক্ষন নেয়া বোনের উপদেশে নানা রকম বনজ বা ফলজ ধন্বন্তরী বানাচ্ছে। ডালিমের খোসা সিদ্ধ করে তার সাথে হলুদ মিশিয়ে আধা কাপ খাইয়ে দিল। ওটার নাম নাকি পোমাগ্রেনেট চা। চিরতা ভেজানো এমন তিতে না। এরপর নাকি আস্ত রসুনের কোষ খেতে হবে। সজনে ডাটা চিবুলাম দু’দিন।

সৌধ কবিতা ও ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীত প্রচারের সংগঠন। মূল সংগঠক কায়সার সরোদ ও তবলার যুগল বন্দী আসর সঙ্গে শিল্পীদের সঙ্গে আড্ডার দাওয়াত দিয়ে রেখেছিল। প্রখ্যাত সরোদিয়া সিরাজ আলী খান আসবেন, চলে এসেছেন, ভারত থেকে। কাছাকাছি এলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। টিকেট কেটেও না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। সরকারের তরফে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমন না করার উপদেশ দেয়া হচ্ছে।

১৮/০৩/২০২০

যায়েন সকালেই জানালো বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে দুটোর দিকে। আমি বললাম বাসে যাওয়ার দরকার নেই, গাড়িতে করে নামিয়ে দেব। সকাল দশটার দিকে বসলাম অনলাইনে খাবার কেনার জন্য। আনুমানিক দু’সপ্তাহের বাজারের তালিকা বাছাই করে দাম পরিশোধ করতে যেয়ে দেখি আগে বাসায় পৌঁছে দেয়ার বা দোকান থেকে নিয়ে আসার জন্য সময় ঠিক করে নিতে হবে। কিছুতেই সেটা করা গেল না। মনটা দুঃখে ভরে গেল। তাহলে কী না খেয়ে মারা যেতে হবে। ধীরে ধীরে শংকা ঢুকছে মনে।

দু’বছর আগে মক্কা থেকে মদিনা যাওয়ার পথে আমাদের দু’জনকে দুটো স্যানিটাইজার দেয়া হয়েছিল। যায়েনকে ওর একটা দিলাম। বিকালে তুলে আনতে যেয়ে দেখি ও কোত্থেকে একটা মাস্ক যোগার করেছে। রাতে যায়েন আর আমি মিলে আমাজন, ইবে বা অন্য যেটায় সম্ভব হয় কিছু জিনিষ কেনার চেষ্টা করলাম। আমাজনে কেনার সময় দেখালো ২/৩ দিনের মধ্যে টয়লেট রোল পাঠাবে। কিন্তু কেনা হয়ে গেলে তারা জানাচ্ছে তাদের আর মজুদ নেই, কবে পাঠাতে পারবে তার কোন ঠিক নেই। কেনার আদেশ বাতিল করে দিলাম। বিলাতে আক্রান্তের সংখ্যা ২৬২৬, বার্মিংহামে ৫২। কোন কিছুতে মন বসাতে পারছি না।

১৯/০৩/২০২০

সব কিছু স্বাভাবিক, কিন্তু কিছুই স্বাভাবিক নয়; যেখানেই থাকুন – সব কিছু স্বাভাবিক কিন্ত কিছুই স্বাভাবিক নয় । বিবিসিতে সাবেক সহকর্মী, এখন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট অধ্যাপক প্রিয়ভাজন আলী রিয়াজ ফেসবুকে পোস্ট লিখলো। সত্যি, সবকিছু স্বাভাবিক, কিন্তু কিছুই স্বাভাবিক নয়। একটা আশা জাগানিয়া খবর চাই।

বার্মিংহামের ‘ঝুট’ কোম্পানীর একটা ফার্মেসীতে ২০০ মিলি লিটার তরল প্যারাসিটামলের দাম হাঁকা হচ্ছে ২০ পাউন্ড। তরল প্যারাসিটামল বাচচাদের দেয়া হয়। ক্রেতারা কাঁদতে কাঁদতে স্থানীয় কাউন্সিলরের কাছে নালিশ জানিয়েছে। ফার্মেসীটায় এক সপ্তাহ আগেও ৩২টা প্যারাসিটামলের প্যাকেট ১.৩৯ পাউন্ডে বিক্রি করা হতো। এখন তার দাম চাইছে ১০ পাউন্ড। ঝুট কোম্পানী টুইটারে জানিয়েছে ‘তারা সঙ্গে সঙ্গে তদন্ত করে দেখেছে যে শুধু একটা দোকানেই দাম বাড়ানো হয়েছিল তাই ক্রেতাদের দাম ফেরত দেয়া হবে।’

চিত্তস্থিত করো জাওয়াদ। নিজেই নিজের মনকে বললাম। না, আজ ব্লাইন্ডনেস ছবিটা দেখবো। বিকেলে বাইরে, বাসার চারপাশেই হাঁটলাম প্রায় তিন কিলোমিটার। ফিরে এসে ছবিটা কিনে দেখলাম। কাল্পনিক এক শহরে এক অজানা মহামারী দেখা দিয়েছে। বলা ভাল দেখা বন্ধ করে দিয়েছে। অদ্ভুত সেই মহামারী। একজন ট্যাক্সি ড্রাইভার হঠাৎ ট্রাফিক বাতিতে গাড়ি থামিয়ে অন্ধ হয়ে গেল। অন্ধত্বও অদ্ভুত, সে সব কিছুই সাদা দেখছে। একজন বিখ্যাত চক্ষু চিকিৎসকের কাছে গেলে সে পরীক্ষা করে কিছুই পেলনা। সেই চোখের ডাক্তারও কিছুক্ষণের মধ্যে অন্ধত্বে আক্রান্ত হলো। কোনভাবে তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লো। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে সেনাবাহিনী নামানো হলো। শহরের আক্রান্তদের সঙ্গরোধে রাখার জন্য পরিত্যক্ত একটা মানসিক হাসপাতালে আটকে রাখা হলো। তাদের কিছু খাবার দেয়া হচ্ছে, কিন্তু সেগুলো পৌঁছে দেয়ার, খাইয়ে দেয়ার কেউ নেই। ডাক্তারকেও সেনাবাহিনী ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় তার স্ত্রী তার সঙ্গে বন্দী দলের সঙ্গে মিশে গেল। আশ্চর্যজনকভাবে ডাক্তারের স্ত্রী অন্ধ হলো না। ঐ বন্দীশালায়, কারণ তাদের পাহারা দেয়ার জন্য অস্ত্রধারী সৈন্যরা কেউ বের হতে চাইলেই গুলি করে মেরে ফেলছে। সেখানে কিছু অপরাধী শ্রেনীর অন্ধ অন্যদের খাবার আটকে রেখে তাদের টাকা পয়সা লুটে নিচ্ছে। এক পর্যায়ে তারা দাবী খাদ্যের বিনিময়ে মেয়েদের দেহদানে বাধ্য করে। ডাক্তারের স্ত্রী বদলা নেয়ার জন্য ধর্ষণকারী অপরাধীদের নেতাকে একটা কাঁচি গলায় ঢুকিয়ে খুন করে। তারপর তার আরো কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে পালায়। (কোন কোন দৃশ্য পরিবারের সবার সঙ্গে বসে দেখার জন্য আপত্তিকর মনে হতে পারে।) নোবেল পুরষ্কার জয়ী পর্তুগীজ লেখক জোযে সারামাগোর উপন্যাসের অনবদ্য কাহিনী। ছবিটা দেখে মনে পড়লো ১৯৮৮ সালের বন্যার সময় বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে প্রচারিত ধারাবাহিক ছবি ‘ভি’-র কাহিনী। সেটাও ভিন্নগ্রহ থেকে পৃথিবী দখল করতে আসা এলিয়েনদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একদল মানুষের বিজয়ের কাহিনী।

(চলবে)

ছবিঃ গুগল     

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]