করোনার ডায়েরি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কাজী জাওয়াদ, বার্মিংহাম থেকে

করোনা এখন পৃথিবীজুড়ে ভয়ানক এক অসুখ। মৃত্যুর চাদরের তলায় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে গোটা মানবজাতির অস্তিত্ব। থমকে গেছে মানুষের জীবন, থমকে গেছে দেশের পর দেশ। রুদ্ধশ্বাস আমাদের পৃথিবী। এমনি অবস্থায় নিজের ঘরেই বন্দী মানুষ। সেই বন্দী সময়ে ডায়েরি লিখছেন ইংল্যান্ড প্রবাসী সাংবাদিক, লেখক কাজী জাওয়াদ। তিনি দেশে প্রত্যক্ষ সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত ছিলেন লম্বা সময়। বিলেতে গিয়ে সাংবাদিকতা করেছেন বিবিস‘র বাংলা সার্ভিসে। প্রাণের বাংলায় এখন থেকে তার এই ডায়েরি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।

অল্প বয়সে বেশ ক’বার ‘সারা জীবন আমি যেন ভালো হয়ে চলি’ প্রতিজ্ঞা করে ডায়েরি লেখার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু কোনবারেই একদিনের বেশি এগুতে পারিনি। করোনার কারণে সঙ্গরোধে থাকায় আবার ডায়েরি লেখার ইচ্ছে হলো।     

০৪/০৩/২০২০

আজ আমাদের বার্ষিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার দিন। ডাক্তারের সঙ্গে আলাপ এবং আগামী বছরের স্বাস্থ্যরক্ষার পরিকল্পনা করা হলো। আমাদের দু’জনেরই রক্ত ও চক্ষু পরীক্ষার ফল ভালো। স্বাস্থ্য পরিকল্পনায় কোন পরিবর্তন নেই। কান্তা কোন শর্করা জাতীয় খাবার খায়না আর দিনে মাত্র দু’বার খায়। তাতে ওজন স্বাভাবিক মাত্রায় চলে এসেছে। ডাক্তার এই খাদ্যাভ্যাসের বিস্তারিত লিখে নিলেন। আর তিন মাস পর আবার পরীক্ষা করার ব্যবস্থা দিলেন। বললেন তখন ভালো ফল পেলে তারা অন্য রোগীদেরও এরকম খাবার খেতে বলবেন। সার্জারী থেকে বের হয়ে আমরা পাশের ম্যাকডোনাল্ডসের দোকানে গেলাম মাফিন আর কফি খেয়ে আনন্দ করার জন্য। হেঁটে হেঁটে বাসায় ফেরার পথে করোনা নিয়ে কথা হলো। জানুয়ারীর শেষদিকে বিলাতে করোনা এসেছে। ফেব্রুয়ারীর শেষ দিক থেকে তার প্রকোপ দেখা দিতে শুরু করেছে। রোগ আরো ছড়ালে আমরা কী করবো সেসব নিয়ে কথা বললাম দু’জন।

বিলাতে আক্রান্তের সংখ্যা ৮৭ বার্মিংহামে ২ মৃতের সংখ্যা শূন্য

০৫/০৩/২০২০

কাঁচা বাজারে গেলাম আমরা। সাধারনতঃ দু’সপ্তাহের বাজার করি একসঙ্গে। বাজারে তখনো করোনার প্রভাব পড়েনি বলেই মনে হলো। একটা ছোট মৃগেল মাছ কিনলাম, আর বেশ কিছু সব্জি। সব্জিগুলো বেশ তাজা ছিলো, বিশেষ করে ঢেড়শ আর কচুর লতি। আগেই কাঁচা মরিচ নিয়ে নিয়েছিলাম। দোকানে ঢুকেই আমি এই কাজটা করি। নাহলে ভুল হয়ে যায়। আজ ভুল হলে আমার দোষ হতো না। কারণ ও সঙ্গে ছিল। এখনও অত চিন্তা হচ্ছে না করোনা নিয়ে। বিলাতে আক্রান্তের সংখ্যা সামান্য বেড়েছে, ১১৬ জন মৃতের সংখ্যা ১, বোঝাই যায় এখনো প্রকোপ বাড়েনি।

ঢাকা থেকে এক বন্ধু, সরকারের বহিঃসম্পদ বিভাগের একজন সাবেক সচিব এসেছেন লন্ডনে। তিনি এলে প্রত্যেকবারেই দেখা না হলেও ফোনে আলাপ হয়। সন্ধ্যায় তার সঙ্গে প্রায় ঘন্টাখানেক আলাপ হলো। খুব ভালো লাগলো। করোনা পরিস্থিতি মূল আলোচ্য ছিল তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।

০৭/০৩/২০২০

সিলেট থেকে প্রকাশিত অনলাইন দৈনিক সিলেট পত্রিকার স্থানীয় প্রতিনিধি তাদের দশম বার্ষিকী উপলক্ষে দাওয়াত দিয়েছিল। ঘরোয়া ঐ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত ছিলাম জনা দশেক। বি

শেষ অনুরোধে যেতে হলো। সেখানে সবার সঙ্গে কনুই ছুঁয়ে হাত মেলানোর অভ্যাস করতে বললাম। একজন বললো আমি নাকি ভয় পেয়ে গেছি।

স্বভাবতই আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বেড়েছে আক্রান্ত ২০৯ এবং মৃত ২।

০৮/০৩/২০২০

নাশতার রুটি ডিম আমরা সেইন্সবেরি থেকেই কিনি। বিকেলের দিকে গেলাম। পুরোপুরি জৈব ডিম পাওয়া গেলনা। খোলা মাঠে চড়ে খায় এমন মুরগির ডিম নিতে হলো। কিছু আপেল, কমলা, কলা, পনির আর বরফ জমাট সব্জি নিলাম। আজ বিলাতে আক্রান্তের সংখ্যা ২৭৮। মৃতের সংখ্যাও বেড়ে ৩ হয়েছে। আমাদের বোধহয় কিছু প্রস্তুতি নেয়া দরকার। বিশেষ করে মুখে হাত না দেয়া আর হাঁচি দেয়ার সময় কনুই দিয়ে মুখ ঢাকার অভ্যাস করা দরকার। ঢাকায় তিনজন আক্রান্তের খবর পেলাম।

০৯/০৩/২০২০

১৯৭১ সালের ২৮শে মার্চ বার্মিংহামের স্মলহীথ পার্কে স্বাধীন বাংলার পতাকা ওড়ানো হয়েছিল। বিদেশের মাটিতে স্বাধীন বাংলার পতাকা ওড়ানোর ঘটনা সেটাই প্রথম ছিল। প্রতি বছরের মত এবারও আটাশে মার্চ দিবসটা পালনের প্রস্তুতির জন্য সভা ছিল আজ। স্থানীয় এক বাংলাদেশী রেস্টুরেন্টে। সেখানে আগত অনেকের সঙ্গে হাত মেলালাম। কেউ কনুই ব্যবহার করলেন না।

একজন বাংলাদেশী নাট্যকর্মীর সঙ্গে ফোনে আলাপ হলো সন্ধ্যায়। বললেন আগামী সপ্তাহে বাসায় আসবেন। আমি বললাম যদি আসতে পারেন। মনে হচ্ছিলো পরিস্থিতি ততদিনে বদলে যাবে।

১১/০৩/২০২০

বার্মিংহামে আক্রান্ত ২, দ্বিতীয় আক্রান্ত লোকটা অবসরপ্রাপ্ত এবং সম্প্রতি ইটালি থেকে ঘুরে এসেছে। তার সঙ্গে সংশ্রবে এসেছে এমন লোকদের জনস্বাস্থ্য বিভাগ যোগাযোগ করছে। লোকটাকে বাড়িতেই সঙ্গরোধ অবস্থায়

রাখা হয়েছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা করোনার আক্রমনকে মহামারী ঘোষণা করলো আজ। এতদিন খুব চিন্তা হয়নি। সার্স ভাইরাসের আক্রমনের সময় প্রতিদিন পঁচিশ মেইল দূরে যেয়ে কাজ করেছি। তখন কোন শংকা হয়নি। নিজেকে প্রবোধ দিলাম এবারেও কিছু হবেনা।

১২/০৩/২০২০

হাসপাতালে হৃদযন্ত্রের আলট্রাসোনো করতে যেতে হয়েছিল। প্রায় আধঘন্টা একজন একজন করে দু’জন ডাক্তার গায়ের সঙ্গে মিশে বুকের উপর ট্রান্সডিউসার চেপে ধরে নানা রকম ছবি তুললেন। আগে জিজ্ঞেস করেছিলেন কাঁশি বা জ্বর আছে কিনা। আমি তাদের পাল্টা জিজ্ঞেস করতে পারতাম। কিন্তু ভরসা ছিল তাদের তেমন কিছু হলে কাজে আসতে দেয়া হতোনা। মনে হচ্ছে করোনা নিয়ে উদ্বেগ মনে বাসা বাঁধতে শুরু করেছে। আজ বৃটেনে আক্রান্তের সংখ্যা ৫৯০, মৃতের সংখ্যা ১০। বার্মিংহামে এখনও আক্রান্ত ২। পুরোদেশের রেখাচিত্রটা ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠতে শুরু করেছে।

(চলবে)

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]