করোনা উত্তর পৃথিবী

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদার

সেদিন আমি বেঁচে থাকবো কিনা জানি না। জানি না আমার কতজন স্বজন বান্ধব এই অতিমারীর গ্রাসে পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে যাবে। এটাও জানি না পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার কত শতাংশ এই অতিমারীর প্রলয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। আমরা জানি না, কবে মানুষের চলাচল আবার স্বাভাবিক হবে। কবে এক দেশ থেকে অন্য দেশে, এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে, এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যাতায়াত আবার অবারিত হবে।
তবে যেদিন সব স্বাভাবিক হয়ে আসবে সেদিন এই পৃথিবী সম্ভবত একই চেহারায় ফিরে আসবে না। জার্মানিতে নিজের ঘরে অন্তরীণ ডানা সেদিন এই কথাই বলছিলো। বললো, ওর গবেষণা পরিচালকের সঙ্গে এমন কথাই বলছিলো সে। ডানা বললো, বাবা, দেখবে করোনার পর মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, একটা দেশের সঙ্গে অন্য দেশের সম্পর্ক। মানুষের ভ্রমণের ধরণ, জীবন সম্পর্কে এই পৃথিবীর মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, সবই আমূল পাল্টে যাবে।

ডানার সঙ্গে কথা হয়েছিলো এটুকুই। কিন্তু কথাটা এর পর থেকে আমাকে ভাবিয়ে যাচ্ছে। আগ্নেয়গিরির মুখ থেকে লাভাস্রোত প্রবল বেগে নেমে এসে যেমন মুহূর্তে ছাইয়ের গাদায় পরিণত করে সবুজ পৃথিবী আর তার জীবনকে, তেমনিই নিঃশব্দ পায়ে দ্রুত ঝাঁ চকচকে কোলাহল মুখর পৃথিবীকে এক নিস্তব্ধ শ্মশানে পরিণত করছে করোনা। আমাদের অহংকার, আমাদের ঔদ্ধত্য, আমাদের প্রদর্শনকামী জেল্লা সবকিছু নিয়ে পাততাড়ি গুটিয়ে আমরা এখন ঘরের ভেতর বসে সামাজিক গণমাধ্যমে মিউমিউ করছি। এই সেদিন নববর্ষে পরবো বলে যে কুর্তা কিনেছি, ছুটিতে বেড়াতে যাবো বলে যে পরিকল্পনা করেছি, এখানে ওখানে গান গেয়ে আর বক্তৃতা দিয়ে বেড়ানোর পরিকল্পনা সবই এখন বিদ্রুপের চোখে মিটমিট করে হাসছে আমাদের দিকে তাকিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে রোজ সকালে নিমগাছের তলায় বসে আমাদের সহকর্মী বন্ধুদের চায়ের আড্ডা কতদিনের জন্য মুলতুবি হলো জানি না। আমাদের সকলের, আবিশ্ব আমাদের সকলের বাইরের পৃথিবীর সব মুখর উদযাপন আজ মুখ থুবড়ে পড়েছে।

আমাদের গান বন্ধ। শ্লোগান বন্ধ। নামাজ বন্ধ। আরতি বন্ধ। রবিবারের গির্জা বন্ধ। তীর্থযাত্রা বন্ধ, মধুচন্দ্রিমা বন্ধ। বাউন্সার স্ট্রেট ড্রাইভ, ব্যানানা কিকের উল্লাস বন্ধ। ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান,শরণার্থী অনুপ্রবেশকারী, দেশদ্রোহী দেশপ্রেমিক ইত্যাকার বিচিত্র বয়ানগুলির মুখে তালা পড়েছে। অতিমারীর মুখে পাসপোর্ট ভিসা নাগরিকত্ব উইপোকা সব কর্পূরের মত উধাও। ঘরের চার দেওয়ালে বন্দী আমরা সামাজিক গণমাধ্যমে উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে আছি সারা পৃথিবীর তাবৎ গবেষক আর বিজ্ঞানীদের দিকে। যদি কোনো ভেষজ, কোনো প্রতিষেধক, কোনো নিরাময় বেরোয়।

প্রতিটি মানুষ আসলে দুটো মানুষ। একজন, জীব প্রকৃতির বাঁচার নিয়মকে সর্বস্ব করে বাঁচে। এই মানুষ, ওই ব্যক্তি মানুষটি মাত্র। মানুষের মধ্যে থাকা দ্বিতীয় মানুষটি ভেতরে বাস করে। সে নিজের মধ্যে সর্বকালের মানুষকে দেখতে পায়। সে বাঁচে মরে সকলের জন্য। সর্বকালের জন্য। রবীন্দ্রনাথ ‘মানুষের ধর্ম’ প্রবন্ধের ভূমিকায় বলেছেন, ‘মানুষের একটা দিক আছে যেখানে বিষয়বুদ্ধি নিয়ে সে আপন সিদ্ধি খোঁজে। সেইখানে আপন ব্যক্তিগত জীবনযাত্রানির্বাহে তার জ্ঞান, তার কর্ম, তার রচনাশক্তি একান্ত ব্যাপৃত। সেখানে সে জীবরূপে বাঁচতে চায়।
কিন্তু মানুষের আর-একটা দিক আছে যা এই ব্যক্তিগত বৈষয়িকতার বাইরে। সেখানে জীবনযাত্রার আদর্শে যাকে বলি ক্ষতি তাই লাভ, যাকে বলি মৃত্যু সেই অমরতা। সেখানে বর্তমান কালের জন্যে বস্তু সংগ্রহ করার চেয়ে অনিশ্চিত কালের উদ্দেশে আত্মত্যাগ করার মূল্য বেশি। সেখানে জ্ঞান উপস্থিত-প্রয়োজনের সীমা পেরিয়ে যায়, কর্ম স্বার্থের প্রবর্তনাকে অস্বীকার করে। সেখানে আপন স্বতন্ত্র জীবনের চেয়ে যে বড়ো জীবন সেই জীবনে মানুষ বাঁচতে চায়।’

অতিমারী আমাদের সামনে এই সত্যই তুলে ধরেছে, আমরা কেউই ব্যক্তি হয়ে কিংবা হিন্দু-মুসলমান, ব্রাহ্মণ-দলিত, হিন্দুস্তান-পাকিস্তান বা প্রাচ্য-পাশ্চাত্য ইত্যাদি খণ্ডিত সত্তায় বাঁচতে পারব না। দুর্যোগ এলে ঈশ্বর, ধর্মগ্রন্থ, সীমান্তের কাঁটাতার- কেউই আমাদের বাঁচাতে পারে না।
আমাদের জগৎ ও জীবনের একমাত্র নিয়ন্তা প্রকৃতি এবং বিজ্ঞানই একমাত্র এর সুলুক সন্ধান করে ব্যাখ্যা হাজির করতে পারে।

করোনা-উত্তর পৃথিবীতে মানুষ কি রবীন্দ্রনাথ কথিত ভেতরের মানবের পরিচয়ে প্রকৃতির সন্তান হয়ে বিজ্ঞানের সাধক হয়ে বাঁচবে? নাকি আরো বেশি পশুত্বকে আঁকড়ে আরো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিচিতি সত্তার কারাগারে বন্দী হয়ে পরস্পরের প্রতি জিঘাংসা ও প্রকৃতির নির্বিচার লুন্ঠনের নেশায় অবিচল থেকে নিজেদের অবলুপ্তির পথ সুনিশ্চিত করবে? জানি না, মাঝেমাঝে আশা জাগে, আবার নিভে যায়।

ব্যক্তি আমি বাঁচি আর নাই বাঁচি, করোনা-উত্তর পৃথিবী অনেকটাই যে বদলে যাবে সে নিয়ে আমার সন্দেহ নেই।

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]