কলকাতার মঞ্চে লাল সালু

ঊর্মি রহমান

প্রাণের বাংলায় ‘দূরের হাওয়া’ কলামে নিয়মিত লিখতে শুরু করলেন উর্মি রহমান। একদা বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে কর্মরত উর্মি রহমান ঢাকার বিভিন্ন দৈনিক ও সাপ্তাহিকে সাংবাদিক হিসেবেও কাজ করেছেন। এখন বসবাস করেন কলকাতায়। যুক্ত রয়েছেন নানান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মোর্চায়। দূরের হাওয়া মানেই তো দূর পৃথিবীর গন্ধ। অন্য দেশ, অন্য মানুষ, অন্য সংস্কৃতি। কিন্তু মানুষ তো একই সেই রক্তমাংসে। সমাজ, মানুষ, আন্দোলন আর জীবনের কথাই তিনি লিখবেন প্রাণের বাংলার পৃষ্ঠায়।

সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ

কলকাতায় বসবাসের একটি প্লাস পয়েন্ট ভালো নাটক দেখা। তবে সবসময় ভালো ভেবে গেলেও যে নাটক সেরকম ভাল হয়, তা নয়। একবার তো খুব নামকরা অভিনেতার (মঞ্চ ও বড় পর্দার) লেখা ও পরিচালনায় এক ঘন্টার একটি নাটক দেখতে গিয়ে খুব হতাশ হয়েছিলাম। তারপরই তিনঘন্টার নাটক দেখতে গেলাম ‘তথাগত’। কোথা দিয়ে সময় চলে গেল, বুঝতেই পারলাম না। মন্ত্রমুগ্ধের মত সে নাটক দেখেছিলাম। কখনো কখনো এরকম খুব ভাল নাটক দেখার সৌভাগ্য হয়। আমাদের এখন সিনেমার চেয়ে নাটক দেখাতেই আগ্রহ বেশী। তাই সেদিন বন্ধু ভানু যখন বলল, ‘লাল সালু’ দেখতে যাবো কিনা, তখন এক কথায় রাজী হয়ে গিয়েছিলাম। মূল কারণ, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্’র ‘লাল সালু’ আমার প্রিয় উপন্যাস। এটি একটি কালজয়ী উপন্যাস। দেখার আগ্রহ ছিলো মঞ্চে একে কিভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আমরা বেশ কয়েকজন বন্ধু মিলে গেলাম বাড়ির কাছেই মধুসূদন মঞ্চে। ভানু, রত্না, দিলীপ, কানু আর আমরা দু’জন, সাগর ও আমি।

থিয়েটার গ্রুপ প্রাচীর নতুন প্রযোজনা ‘লাল সালু’। পরিচালনায় অবন্তী চক্রবর্তী, নাট্যরূপ কৌশিক চট্টোপাধ্যায়। নাটক কেমন লাগলো বলার আগে একটা কথা বলি, প্রথমে ঘোষণায় বলা হলো, আমরা সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহো’র নাটক দেখবো। রচয়িতার নামের উচ্চারণ এভাবে করতে কখনো শুনিনি। আমি নিশ্চিত ‘ওয়ালিউল্লাহ্’ নামটির সঠিক উচ্চারণ এদেশে অনেকেই জানেন এবং একটু খোঁজ নিয়ে নিলে ভাল হতো। আমাদেরও শুনতে এত শ্রুতিকটু লাগতো না। নাটকে প্রায় সকলের অভিনয় ভাল, যদিও মজিদের চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছেন, তাঁকে যতটা ধূর্ত, তার চেয়ে বেশী কমিক্যাল লেগেছে। অভিনেতারা সকলেই একটু উচ্চগ্রামে সংলাপ বলাতে সবসময় সেটা বোঝা যায়নি। অনেক ঘটনা দেখানো হয়েছে যা উপন্যাসে নেই। তবে ধর্মান্ধতা, ধর্মব্যবসার উপকরণ ও মৌলবাদ দেখাতে তার কিছু কিছু প্রয়োজন ছিল মেনে নিচ্ছি। তবু যেন মনে হচ্ছে এই কালজয়ী উপন্যাসে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ যা বলতে চেয়েছেন, তার সবটুকু যেন ধরা পড়েনি।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্’র এই উপন্যাস প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৪৮ সালে। তিনি এই গ্রন্থের জন্য বাঙলা একাডেমী পুরস্কার পান ১৯৬১ সালে এবং ১৯৮১ সাল নাগাদ এই বইটির ১০টি সংস্করণ বেরিয়ে যায়। কাহিনীর পটভূমি চল্লিশের দশক। সে সময়ের মুসলমান সমাজ যা ছিল, আজ আর সেরকম নেই। কলকাতায় বসবাস করতে এসে দেখেছি, এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মুসলমানদের সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানে না। আমরা ছোটবেলায় পাড়ার অ-মুসলমান বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করেছি। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দু, খৃষ্টান ও বৌদ্ধ ছেলেমেয়েদের সঙ্গে পড়েছি। কার্যক্ষেত্রেও সহকর্মী হিসেবে তাদের পেয়েছি। তাদের অনেক কিছুই আমরা জানি, বলতে পারি আমরা পরস্পর সম্পর্কে জানি। কলকাতায় দেখেছি, এখানে সমস্যা অজ্ঞতাজনিত। এখানে হিন্দু-মুসলমানে মেলামেশা খুব কম। আমার এদেশীয় বন্ধুরা সেটা স্বীকার করেছেন। এমনকি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখেছি, অনেক বক্তাই নির্দ্বিধায় বলেছেন, ‘আমরা মুসলমানদের সম্পর্কে কিছু জানি না।’ আর তা থেকেই সন্দেহ, সমস্যা, অসহিষ্ণুতা ইত্যাদি আসে ও বাড়ে। ‘লাল সালু’ উপন্যাসের কালটা যদি নাটকের দর্শকরা না বোঝেন, তাহলে তাঁদের মনে হতে পারে, মুসলমান সমাজ এখনও সেরকমই আছে।

এদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধারণা, এখনও মুসলমানরা চারটি বিয়ে করে বা তারা প্রচুর- ধর্মান্ধ। অথচ চল্লিশের দশকের সমাজকে পেছনে ফেলে মুসলমান সমাজ যে অনেক এগিয়ে এসেছে, সে খোঁজ না রাখলে তাদের বোঝা যাবে না। সম্প্রতি ভারতে তিন তালাক নিষিদ্ধ করার আন্দোলন হয়েছে, ইমেইল বা এসএমএস করে তালাকনামা পাঠিয়েছে স্বামী এবং তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে স্ত্রী। মামলায় তারা জয়ী হওয়াতে সম্প্রতি আইনও পরিবর্তন করা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশসহ অনেক মুসলমান-প্রধান দেশেই এই আইন ষাটের দশকেই নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। এখানে এখনও অনেকের ধারণা মুসলমানরা বাংলাভাষী হয় না। আমি কিন্তু জেনেছি পশ্চিমবঙ্গের মাত্র ২% মুসলমান উর্দুভাষী, যদিও তাদের অধিকাংশ কলকাতায় থাকে। বাকী ৯৮% মুসলমান বাংলাভাষী  এবং তারা কলকাতার বাইরে থাকে।

‘লাল সালু’ নাটকের শুরুতে যদি নাটকের রচনাকাল বলে দেওয়া হত, মুসলমান সমাজের যে পরিবর্তন হয়েছে, সে সম্পর্কে দু’টি কথা বলা হত, তাহলে হয়ত এই নাটক দেখে এখানকার মুসলমান সমাজ সম্পর্কে ভুল ধারণা হবার আশঙ্কা থাকত না।

ছবি:গুগল