কলকাতায় আজকাল আর পা রাখে না শীতকাল

সংঘমিত্রা রায়চৌধুরী দাসগুপ্ত

(কলকাতা থেকে): সূপর্ণাকে ডেকে ডেকে গলা ফাটিয়ে ফেললেও কলকাতায় আজকাল আর পা রাখে না শীতকাল। অভিমানে বুঝি? কার ওপর কে জানে! কাছাকাছি আসে, আশা জাগায়, এই বুঝি কড়া নাড়লো আমার দুয়ারে, আলমারি-তোরঙ্গ-ডিভানের ভেতর থেকে কুলু- কাশ্মীর- লুধিয়ানা-মন্টিকার্লো-পশমিনার রাশি নামিয়ে অধীর অপেক্ষায় থাকি…’ কি জানি সে আসবে কবে, যদি আমায় পড়ে তাহার মনে’, তবু মন ভেজে না তার। আনবাড়ি যায় সে, আমারই আঙিনা দিয়া।

শীত না আসুক, তার অনুষঙ্গগুলো এসে হাজির হয় যথাসময়ে,রমরমিয়ে।কড়াইশুঁটির কচুরি,ফিল্টার্ড কফি, ক্রীসমাস কেক, চড়ুইভাতি, থিয়েটার ফেস্টিভ্যাল।আর এই সময়ে যার জন্য মন-কেমন সবচেয়ে বেশী, ফলের দোকানে সদ্যোজাত শিশুর শিরা-ওঠা হাতের মত ঈষৎ সবজেটে কমলালেবুর স্তূপে চোখ পড়তেই যাকে ভীষণভাবে মিস করতে শুরু করি, সে আমার শৈশব- কৈশোরের অনেক দুপুরবেলা, অনেক পড়ন্ত বিকেল আর নিঝুম সন্ধ্যের সঙ্গী।আমার ও-বাড়ির ছাদ।

অধুনা ফ্ল্যাটবাড়ির দুর্ভাগা বাসিন্দা আমাদের ঘরের ওপর একটা ছাদ (সীলিং)আছে, কিন্তু বাড়ির মাথার ছাদ (রুফ)-টিতে আর ব্যক্তিগত মালিকানা নেই, আমার একার ছাদটি এখন বারোয়ারি টেরেস। রাসবিহারী মোড়ের কাছে, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী রোডের ওপর যে তে-তলায় আমার বড় হয়ে ওঠা,সেই বাড়িটায় কড়ি-বরগার উঁচু উঁচু সীলিং ছিল, পেল্লায় ঘর ছিল একেকটা,জানলায় খড়খড়ি ছিল, ডাইরেক্ট কারেন্ট ছিল আর ছিল মস্ত এক খোলা ছাদ, কার্নিশের পাশে দাঁড়ালে দূরে কালীঘাট মন্দিরের চূড়োটা দেখা যেতো।

ওই ছাদটা ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। সারা বছরই নানারকম দেওয়া-নেওয়া চলতো ওর সঙ্গে, দিনের একেকটা সময়ে একেকরকম গপ্পোসপ্পো। তীব্র গরমে লোডশেডিংয়ের সন্ধ্যায় দলবেঁধে আড্ডার জায়গা ছিলো ওই ছাদ।তারা চিনতে শেখা তখন থেকেই, মাঝেমাঝে আশেপাশের বাড়ি থেকে ভেসে আসা রেডিও-র গান, পিসি-কাকিমাদের আড্ডা শুনে একটু একটু পাকামি শেখা… সবকিছুর সাক্ষী ও।সাক্ষী আরো অনেককিছুর; প্রিয় বন্ধুর কানে কানে প্রথম ইনফ্যাচুয়েশনের স্বীকারোক্তি, প্রথম হৃদয়-ভাঙ্গার বেদনা, লুকিয়ে লুকিয়ে প্রথম আনন্দলোক…সব, সবকিছু।

তবে সবচেয়ে মজার সময় ছিল এই শীতকাল।হাওয়ায় একটু শিরশিরানির ছোঁয়া লাগতে না লাগতেই সকালবেলায় বড় গামলা ভর্তি জল বসিয়ে রাখা হতো ছাদে, রোদে গরম হলে ওই জলে স্নান করবে বাড়ির ছোটোরা। ছুটির দিনে , স্নানের আগে লক্ষীছাড়া আমাকে জোর করে সর্ষের তেল মাখিয়ে দিত মা, রোদে বসিয়ে। অ্যানুয়াল পরীক্ষার শেষে আর নতুন সেশন শুরুর আগে ক্রীসমাসের লম্বা ছুটির রোদেলা দুপুরগুলো কেটে যেত এখানেই। মধ্যাহ্নভোজনের পাটটি কোনোক্রমে চুকিয়ে দৌড় দিতাম, গপ্পের বই নিয়ে ঢুকে পড়তাম মাদুরের ওপর রোদ-পোহাতে থাকা লেপ-কম্বলের মধ্যে। একটু পরে মা এসে বসতো কাজকর্ম সেরে, হাতে উল-কাঁটা, কমলালেবু। মিঠে রোদটা ভারি ভালো লাগতো, আরো ভালো লাগতো মায়ের গায়ের ওমটা।দুটোই একসঙ্গে গায়ে মেখে নিয়ে কমলালেবু খেতাম দুজনে, খোসাগুলো ফেলতো না মা,রেখে দিতো সযত্নে, বেশিরভাগটা বেটে দুধের সর মিশিয়ে মাখিয়ে দিতো স্নানের আগে,শ্যামলা মেয়ের গায়ের রঙে একটু উজ্জ্বলতা আনার ব্যর্থ আশায়, বাকিটা পুড়িয়ে সন্ধেবেলা ঘরের কোণায় কোণায় রেখে দিলে মশা-টশার উৎপাত কমতো, ন্যাচারাল রুম ফ্রেশনারের কাজও হতো সেই সঙ্গে। একটু পরপর দাঁড় করিয়ে তৈরী-হতে থাকা সোয়েটারটা গায়ে ফেলে মাপ নিতো মা, গপ্পের মৌতাতটা ভেঙে যাওয়ায় খুব রাগ করতাম। আর্থারাইটিসে ভোগা মা-র এখন,ইচ্ছে থাকলেও, নিজের হাতে সোয়েটার বানিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য নেই আর। নামী ব্র‍্যান্ডের কোনো দামী সোয়েটারেই আর সেই ওমটুকু খুঁজে পাই না আমি।

শীত না পড়লেও,কেমন এক তীব্র ঠান্ডার শিরশিরানি ছড়িয়ে পড়ে সারা শরীর-জুড়ে।

ছবি: মানজারে হাসিন মুরাদ