কলকাতায় বর্ষবরণ

ঊর্মি রহমান

প্রাণের বাংলায় ‘দূরের হাওয়া’ কলামে নিয়মিত লিখতে শুরু করলেন উর্মি রহমান। একদা বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে কর্মরত উর্মি রহমান ঢাকার বিভিন্ন দৈনিক ও সাপ্তাহিকে সাংবাদিক হিসেবেও কাজ করেছেন। এখন বসবাস করেন কলকাতায়। যুক্ত রয়েছেন নানান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মোর্চায়। দূরের হাওয়া মানেই তো দূর পৃথিবীর গন্ধ। অন্য দেশ, অন্য মানুষ, অন্য সংস্কৃতি। কিন্তু মানুষ তো একই সেই রক্তমাংসে। সমাজ, মানুষ, আন্দোলন আর জীবনের কথাই তিনি লিখবেন প্রাণের বাংলার পৃষ্ঠায়।

কয়েক বছর আগেও কলকাতায় বসে বৈশাখ মাসের প্রথম দিনটিকে বছরের আর দিনগুলো থেকে আলাদা করা যেতো না। অবশ্যই হালখাতা হতো। বাড়ি বাড়ি ভাল খাওয়া-দাওয়া হতো, যদিও সব ক্ষেত্রে সেটা বাঙালি খাবার নয়, পোলাও-মাংস জাতীয় ভূড়িভোজ। একবার তো দু’জন জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকাকে বাঙালি খাবারের রেস্টুরেন্টে নিয়ে টেলিভিশনে অনুষ্ঠান করা হলো। নায়িকা শাড়ি পরার কষ্টটুকু করেননি, একটা ড্রেস পরেছেন এবং অধিকাংশ সময় ইংরেজীতে কথা বলে গেছেন। উল্লেখ্য, এবার তিনি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন। যাহোক, সেই দিনটিতে আমি মনে মনে ঢাকা চলে যেতাম আর খুব মন খারাপ নিয়ে বাংলাদেশ ও বিলেতের বন্ধুদের পাঠানো শুভেচ্ছাবাণী পড়ে সময় কাটাতাম।

কিন্তু এখন সে ছবিটা পাল্টে গেছে। গত তিন বছর ধরে এখানেও ধুমধাম করে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করা হচ্ছে। আমাদের অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্য গর্বের কথা, বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উৎসব উদযাপন থেকে কিছু মানুষ অনুপ্রেরণা পেয়ে এখানে মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু করেছে। আমাকেও তারা ডেকে নেয়। এখন তো আমি তাদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছি। ফলে আমারও বছরের প্রথম দিনটা রঙে, ছন্দে, আনন্দে কাটে। আমি যে গ্রুপে আছি, তাদের নাম, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা কলকাতা’। না, আমরা বছরের একটি দিনের জন্য বাঙালি হই না। আমরা সারা বছর সম্প্রীতি, সমন্বয় ও বাঙালি সংস্কৃতিকে তুলে ধরার লক্ষ্যে অনুষ্ঠান করি। আর মিশ্র সংস্কৃতির দেশ ভারতে সেটা খুব জরুরী, বাংলাদেশের জন্য ততটা নয়।

বলা বাহুল্য বছরটা শুরু হয় বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা দিয়ে। তার প্রস্তুতি শুরু হয় মাসখানেক আগে। সৌভাগ্যবশতঃ এখানে একটি সুইমিং ক্লাব আছে, তার কর্ত্তৃপক্ষ আমাদের জায়গাটা ব্যবহার করতে দেন। শিল্পীরা সবাই কিন্তু ঢাকা চারুকলা অনুষদ থেকে পাশ করে এসে বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে থাকেন। গ্রুপের সদস্যরা নানা বয়স ও পেশার মানুষ। কাজের দিনে সবাই কাজ সেরে সেখানে জড়ো হন, কেউ বা শিল্পীদের নেতৃত্বে কাজে সাহায্য করেন, বাকীরা শিল্পকর্মগুলো একটু একটু করে গড়ে উঠতে দেখার আনন্দ উপভোগ করেন। বলা বাহুল্য সেই সঙ্গে আড্ডা, চা ও বেগুনী-চপ খাওয়া চলে। ঐ পাড়ায় ঠিক এই সময় চমৎকার আমের চপ তৈরী হয়। পহেলা বৈশাখের আগে আমরা বিভিন্ন অঞ্চলে, বাজারে, রাস্তার মোড়ে প্রচার সভা করি। সব মিলিয়ে একটা উৎসবের পরিবেশ তৈরী হয়ে যায়।

এবার উৎসবের পরিধি বাড়িয়ে আমরা চারদিন করেছিলাম। শুরু হয়েছিল চৈত্রাবসানে দু’দিনব্যাপী গাজন উৎসব দিয়ে। ফকির, বাউল, ঝুমুরিয়া এসেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের নানা অঞ্চল থেকে। রাস্তার পাশেই সেটা অনুষ্ঠিত হয়। আমাদের চেনা-জানা মানুষরা ছাড়াও পথচারীরাও দাঁড়িয়ে সেটা উপভোগ করেন আর এসব লোক সঙ্গীতের সুরে ও তালে নেচে ওঠেন। এরপর তো বৈশাখের প্রথম দিন মঙ্গল শো্ভাযাত্রা আছেই। তারপর ৪ঠা বৈশাখ অনুষ্ঠিত হলো সোনার বাংলা নামে বাংলাদেশ ও ভারতের দু’টি বাংলা ব্যান্ডের গান নিয়ে সংগীত সন্ধ্যা। আমাদের সৌভাগ্য বাংলাদেশ থেকে ‘জলের গান’ তাতে অংশ নিয়েছিল আর তাদের সঙ্গে ছিলো এখানকার তরুণদের ব্যান্ড ‘পরিধি’। ‘জলের গান’ যে কলকাতায় এত জনপ্রিয় আমার জানা ছিল না। সেদিনের অনুষ্ঠানে তাদের গানের পাশাপাশি ‘পরিধি’ও মাতিয়ে দিয়েছিলো।

এবার আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রায় স্কুলের অনেক বাচ্চা অংশ নিয়েছিলো। ছিলেন বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। ছিলেন রূপান্তরকামীরা। আর ছিলেন সমাজের নানা স্তরের নানা বয়স ও পেশার মানুষ। ঢাক, গান, নাচ ও সেই সঙ্গে আমাদের শিল্পী ও ছেলেমেয়েদের বানানো হাতি, ময়ূর, নৌকা, দণ্ডপুতুল, নানা রকম মুখোশ, ছাতা, পাখা, চরকি, দোতরা বিশাল আকৃতির সরা। এইসব দৃষ্টিনন্দন উপকরণের কারণেই কিনা জানি না, পরদিন প্রায় সব কাগজে আমাদের শোভাযাত্রার ছবি বেরিয়েছে। কারো কারো মুখে শুনেছি, কর্তব্যরত পুলিশরাও এই শোভাযাত্রা উপভোগ করেছেন। তাঁদের একজন বলেছেন, সারা বছর যত মিছিল তাঁদের সামলাতে হয়, তার মধ্যে এরকম শোভাযাত্রা তাঁদেরও আনন্দ দেয়। তাঁদের একজন তো তাঁর ছেলের জন্য একটা চরকি চেয়ে নিলেন। সেদিন প্রচণ্ড গরম ছিলো। সকালে বেরিয়েও সেই দাবদাহ থেকে মুক্তি পাইনি। ঘেমেনেয়ে একাকার হয়েছি, কিন্তু তাতে আনন্দে ভাটা পরেনি।

এখন শুধু আমরা নই, কলকাতায় আরো শোভাযাত্রা বের হয়। অন্য শহরেও হচ্ছে। আমাদের সংগঠনের সহযোগিতায়, আমাদের গ্রুপেরই ছেলেরা সুন্দরবনেও গত দু’বছর ধরে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করছে। হয়তো একদিন ঢাকার মত এখানেও সত্যি সত্যি এটা বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসবে পরিণত হবে।

ছবি: লেখক

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক