কাগজ-জীবন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জয়দীপ দে

আমরা বোধহয় পত্রিকার স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা খোঁজার শেষ প্রজন্ম। আমরা বলতে আশি ও নব্বইয়ের দশকে যারা আমরা বড়ো হয়েছি। আমাদের সময় বিনোদনের সুযোগ খুব সীমিত ছিলো। স্যাটেলাইট আসেনি। টিভি বলতে সাদাকালো ন্যাশনাল টিভিতে বিটিভি। তাও ভালো অনুষ্ঠান প্রতিদিন থাকতো না। মঙ্গলবার নাটক, শুক্রবার ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান। বাকি দিন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক অনুষ্ঠান দেখতে দেখতে আমাদের বিস্বাদ ধরে যেতো। তখন আমাদের প্রতিদিনের বিনোদনের উৎস ছিল পত্রিকা।

বাবা নিয়মিত আজকের সূর্যোদয় রাখতেন। সঙ্গে সংবাদ। আমি বিদ্রোহ করে যায়যায়দিন ও ভোরের কাগজ রাখতে শুরু করলাম। কিন্তু ঠিকই বাবা বুধবার বাসায় ফেরার সময় হাতে করে আজকের সূর্যোদয় নিয়ে আসতেন। সূর্যোদয়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় বিষয় ছিল ‘গেদু চাচার চিঠি’। যুক্তি দিয়ে কিভাবে লিখতে হয় সেটা সেখান থেকে শিখেছিলাম। শিখেছিলাম কাউকে সমর্থন করলে তার সবকিছু অন্ধভাবে মেনে নিতে নেই। মোজাম্মেল হক সাহেবের মৃত্যু সংবাদ শুনে কথাগুলো মনে পড়ে গেলো।

তখন যায়যায়দিন ছিলো খুবই চৌকস একটা সাপ্তাহিক। ১৯৮৩ সালে প্রথম প্রকাশিত হলেও এরশাদ সরকারের রোষানলে পড়ায় আশির দশকে অনিয়মিত হয়ে পড়ে। নব্বইর শুরু থেকে এটি বিকশিত হতে থাকে। অন্য পত্রিকা যখন দেশের আটপৌরে রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকতো, যায়যায়দিনের দৃষ্টি তখন বিশ্বময়ব্যাপ্ত। তখনও ইন্টারনেট আসেনি। বিশ্বকে জানার অপার আগ্রহ। সে ক্ষুধার আগুন কিছুটা হলেও নিভতো যায়যায়দিন পড়ে।

শফিক রেহমান ইংল্যাণ্ডের জীবনযাত্রা নিয়ে লিখতেন। এক ইঞ্জিয়ার ভদ্রলোক ইরাক থেকে সেখানকার চালচিত্র নিয়ে লিখতেন। প্যারিস আমেরিকা ইতালি বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন লিখতো। প্রায় বিষয়ভিত্তিক সংখ্যা হতো। পাঠকরা রাশি রাশি লেখা পাঠাতো। সেসব সুসম্পাদিতভাবে ছাপা হতো।

প্রচ্ছদ প্রতিবেদনগুলো ছিলো খুবই তথ্যসমৃদ্ধ ও উপভোগ্য। বিভুরঞ্জন সরকার, স্বদেশ রায়ের মতো মেধাবী সাংবাদিকরা স্টোরি করতেন। প্রচ্ছদ করতেন চারুকলার শিক্ষক মাকসুদুর রহমান। মাত্র বাই-কালারে কতো আকর্ষণীয় কাজ করা যায় তা তখনকার যায়যায়দিন না দেখলে বোঝা যাবে না। মোট কথা একটা ইউনিক উইকলি ছিলো সেটা। তারা ডেমক্রেসিওয়াচ নামে তরুণদের একটা সংগঠন গড়ে তুলে দেশব্যাপী। কম্পিউটার ও ইংরেজি শেখানোই ছিলো এদের মূল লক্ষ্য। যাতে তরুণরা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে। আমি তাতে যোগও দিয়েছিলাম। শেষের দিকে সবকিছু কেমন নষ্ট করে ফেলেন সম্পাদক শফিক রেহমান।

১৯৯৮ সালে তিনি সাপ্তাহিকটিকে দৈনিক করেন। ট্যাবলয়েড পত্রিকা ছিলো। কনটেন্ট গ্যাট-আপ নিউজ সব ছিলো অন্যরকম। মনে হতো না দেশি কোন পত্রিকা। কিন্তু বেশিদিন চালিয়ে যেতে পারেননি। আবার যায়যায়দিন সাপ্তাহিকের ফর্মে চলে আসে। এর মধ্যে তিনি মৌচাকের ঢিল নামে একটা পত্রিকাও করেন। এই দুই পত্রিকার মূল বৈশিষ্ট্য ছিলো, এখানে পাঠকই লেখক। তেমন বড়ো কোন লেখকের লেখা ছাপ হতো না। কিন্তু বড়ো আকর্ষণীয় ছিলো লেখাগুলো। এই পাঠককে লেখক করে তোলা, তাকে গুরুত্ব দেয়া এই সংস্কৃতিটি পরবর্তীতে সকল পত্রিকা লুফে নেয়।

যায়যায়দিনের আগে ভীষণ জনপ্রিয় পত্রিকা ছিলো বিচিত্রা। ৯৭-তে সরকারি পত্রিকা দৈনিক বাংলা বন্ধের পর এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠান সাপ্তাহিক বিচিত্রাও বন্ধ হয়ে যায়। প্রথম আলো গ্রুপের অর্থায়নে শাহাদৎ চৌধুরী বিচিত্রার সেট-আপ নিয়ে সাপ্তাহিক ২০০০ বের করেন। দারুণ জনপ্রিয় হয়। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। রফিকুন্নবীর কার্টুন। বৈচিত্র্যময় বিষয়। এ সময় আসে বিভুরঞ্জন সরকারের সম্পাদনায় আসে সাপ্তাহিক চলতিপত্র। সেটাও সাড়া ফেলে পাঠকমহলে। পরে এখন, এই সময়, সাপ্তহিক নামের ক্ষণজীবী কিছু সাপ্তাহিক পত্রিকা আসে। প্রত্যেকটিই ছিলো মানসম্পন্ন। আমি অবশ্য চিত্রালি, শৈলী, সচিত্র সন্ধানী, চিন্তা, রোববার, হলিডে নিয়মিত পড়িনি। মাঝে মাঝে দেখেছি। পত্রিকাগুলো দুর্দান্ত ছিলো।

এত গেলো সাপ্তাহিক পাক্ষিকের খবর। আশির দশকে পত্রিকা বলতে ছিল সংবাদ আর ইত্তেফাক। সরকারি লোকেরা পড়তেন দৈনিক বাংলা। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে এসে দৈনিক পত্রিকার জগতে বিপ্লব ঘটে গেলো। এসময়কাল ছিলো বাংলা পত্রিকার স্বর্ণযুগ। গণতন্ত্রের সুবাতাসে পরিপুষ্ট হয়ে উঠেছিলো পত্রিকাগুলো। ১৯৯১ সালে এলো আজকের কাগজ। তারুণ্যের মুখপত্র হয়ে উঠল পত্রিকাটি। কিংমেকার সম্পাদক নাইমুল ইসলাম খান মাত্র ১ বছর কাজ করে পত্রিকা জগতকে পুরো চমক দেখিয়ে দিলেন। সংবাদ ফিচার কার্টুন সবকিছুতেই নতুনত্ব। শিশির ভট্টাচার্যের কার্টুন ছিল চোখ টাটানো। ব্যঙ্গ করার দুঃসাহসে মুগ্ধ হয়ে যেতাম। মুক্তমনা সাংবাদিক ও লেখকরা হাত খুলে লিখতে লাগলেন।

আজকের কাগজের জনপ্রিয়তাকে টেক্কা দিতে সবাই যেন উঠে পড়ে লাগলো। এতো দিনের বাংলার বাণী সেও গা ঝাড়া দিয়ে উঠলো। ইত্তেফাক তার সাবেকি খোলস ভাঙলো। আজকের কাগজকে অনুকরণ করে প্রতিক্রিয়াশীল পত্রিকাগুলোও দারুণ নিউজ ও ফিচার ভরে উঠলো। মওলানা মান্নানের ইনকিলাব নতুন রূপে আবির্ভূত হলো। তাদের পাক্ষিক পূর্ণিমায় দারুণ সব লেখা ছাপা হতো। সেসময় প্রত্যেকটি পত্রিকার বিশেষ সংখ্যাগুলো ছিলো সংগ্রহে রাখার মতো। বিশেষ করে বছর শুরু ও শেষের, পয়লা বৈশাখের, বিশ্বকাপ কিংবা অলিম্পিকের। আর প্রত্যেক পত্রিকার উদ্বোধনী ও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যাগুলো হতো ডাউস ডাউস। অনেক লেখা আর ছবিতে থাকতো ঠাসা। আমরা পত্রিকা স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আগে দেখতাম কারো কোন বিশেষ সংখ্যা আছে কিনা।

বছর না ঘুরতেই আজকের কাগজের সাংবাদিকরা ঘর ভেঙে এসে ভোরের কাগজ গড়লেন। কমিউনিস্ট পার্টির একতা পত্রিকা ছেড়ে সম্পাদক হিসেবে যোগ দিলেন মতিউর রহমান। কিন্তু জনপ্রিয়তা পেতে সময় লাগলো। ৯৫-৯৬ তে পাঠকপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। তখন আমরা সংবাদ ছাড়া কোন পত্রিকাই নিয়মিত নিতাম না। বিশেষ দিন একেকটি পত্রিকা রাখা হতো। ৯৬ সাল থেকে সংবাদ ছেড়ে ভোরের কাগজ নিতে শুরু করি আমরা। প্রথম যে ধাক্কা খেলাম, অন্য পত্রিকার মতো লতানো প্যাচানো নিউজ নেই। উমুক পৃষ্ঠায় দ্রষ্টব্য সেটা নেই। পাতার খবর পাতায় শেষ। পৃষ্ঠাগুলো ছিমছাম। অল্প কথায় অল্প সংবাদ। জায়গা না হলে এক দু’টা খবর যেত ভেতরে। প্রথম পাতায় তারা মন্তব্য প্রতিবেদন ছাপাতেন। আবেদন খান, মতিউর রহমান চমৎকার সব লেখা লিখতেন। আব্দুল গফফার চৌধুরীর লেখা দারুণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। চৌধুরী সাহেব আগে আজকের সূর্যোদয়ে লিখতেন।

তবে সংবাদের চেয়ে কার্টুন আর ফিচারের আকর্ষণ ছিলো বেশি। একটা সামান্য বনফুল নিয়ে শেষের পাতায় বক্স নিউজ হতে পারে সেটা ধারণাতেই ছিল না আমাদের। একজন সাংবাদিক দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে খবর পাঠান। সেটা একটা শিরোনাম দিয়ে ছাপা হতো। মেলা নামে একটা সাপ্তাহিক ক্রোড়পত্র ছিলো। এর প্রত্যেকটা ফিচার মনে হতো জীবন্ত। চারপাশের ছোটখাটো বিষয়কে এতো সুন্দরভাবে তুলে ধরতো, অবাক হয়ে যেতাম। খেলা আর বিনোদন পাতার জন্য ভোরের কাগজ তখন সবার উপরে। এছাড়া শব্দজব্দ। কুইজ। কার্টুন। অবসর কাটানোর এন্তার আয়োজন।

বেলাল বেগ, দ্বিজেন শর্মা, উৎপল শুভ্র, অঘোর মণ্ডল, রাসেল ওনীল, ওবায়েদুল করিম চন্দন, আব্দুন নূর তুষার, আনিসুল হক, জাফর ইকবাল, ফখরে আলম, মাসকাওয়াত হোসেন এদের লেখার জন্য মুখিয়ে থাকতাম।

দুই বছর পর এলো জনকণ্ঠ। ভোরের কাগজ এর পাশে অনেকটা ম্লান হয়ে গেলো। প্রথম বারো পৃষ্ঠার (ইনকিলাবও হতে পারে) পত্রিকা। ফলে প্রচুর সংবাদ উন্নতমানের সম্পাদকীয় আর ফিচার দেখে আমরা অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমি গোগ্রাসে শওকত ওসমান, মুনতাসির মামুনের লেখা পড়তাম।

কিন্তু বেশিদিন সেই জৌলুস ধরে রাখতে পারেনি জনকণ্ঠ। পাঠক আবার ভোরের কাগজে ফিরে আসে। ভোরের কাগজে পাঠকদের জন্য সাপ্তাহিক একটা পাতা ছিলো। সেটা দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো। সেই পাতায় লেখার সুবাদে আমি ভোরের কাগজ পরিবারের সঙ্গে মিশে যাই। দীর্ঘদিন পত্রিকা পড়তে পড়তে পত্রিকার সঙ্গে যে সখ্য গড়ে উঠে তাতে স্বপ্ন দেখি পত্রিকায় কাজ করার। এদিকে ৯৮ সালে ভোরের কাগজ ভেঙে অনেকেই প্রথম আলোয় চলে যান। অনেকটা আজকের কাগজের মতো। ভোরের কাগজে যারা থেকে যান তারা পড়েন চরম অনিশ্চয়তায়। মালিক পক্ষ অর্থ ছাড় দিতে রাজি নয়। ফলে পত্রিকার কাগজ কেনার সামর্থ্য নেই। সাংবাদিকের বেতন তো অনেক দূর।

বেনজির আহমেদ তখন পত্রিকাটির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। আমার প্রায় যাওয়া হত ৮ লিংক রোড বাংলা মোটরের সে অফিসে। অমিত হাবিব, সঞ্জীব চৌধুরী, অঘোর মণ্ডল, শিবব্রত বর্মণ, পুলক গুপ্ত, শ্যামল দত্ত, আবিদা নাসরীন কলি, নঈম তারিক, জায়দুল হাসান পিন্টু, সমরেশ বৈদ্যে, শবনম ফেরদৌসী, জুলফিকার আলি মানিক, কাজী তাপস, রহমান মুস্তাফিজ, আরিফ জেবতিকের মতন সাংবাদিকরা তখন রীতিমতো লড়াই করে পত্রিকাটিকে ধরে রেখেছেন। ভালো সার্কুলেশন ছিলো। ভালো ভালো নিউজ হতো। মনে আছে জহির রায়হান হত্যা রহস্যভেদ করে দারুণ আলোড়ন তৈরি করেছিল পত্রিকাটি সেই আকালেও।

কিন্তু লড়াই বেশিদিন টিকিয়ে রাখা গেল না। যারা ভালো মানুষি দেখিয়ে পত্রিকা ছাড়লো না, তারা পড়লো মহাবিপদে। আমরা বুঝলাম মিডিয়ায় আবেগ আর সততার মূল্য নেই। যা হোক এর মধ্যে শফিক রেহমানের আবার দৈনিক করার বাই উঠলো। এবার অবশ্য তরল আবেগ থেকে নয়। পরিপক্ক পরিকল্পনা নিয়ে। হাতে বিরাট বাজেট। নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতো পত্রিকা করবেন। এর পেছনে অনেক গল্প। অনেক কাহিনী। সেটা বলতে গেলে পাঠকের ধৈর্য চ্যুতি ঘটবে। পেশাগত অনিশ্চয়তায় থাকা সাংবাদিকরা যেন একটা খড়কুটো পেলো।

তখনকার সবচেয়ে ধনী পত্রিকা ছিলো জনকণ্ঠ। তার বিশাল স্থাবর ভবনে অফিস। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে জমকালো জনকণ্ঠেও শোনা গেলো ভাটার টান। বাংলার বাণী তো বন্ধই হয়ে গেলো। সবার আগে গেলো সরকারী দৈনিক বাংলা। যার সুস্থির চাকরির কারণে শামসুর রাহমান, আহসান হাবীবের মতো কবিরা বিকশিত হতে পেরেছিলেন। তবে এতো কিছুর মাঝে নিশ্চল ছিল ইত্তেফাক। সে তার সাবেকী ঠাট বাট কিভাবে যেন দুই ভাইয়ের যুদ্ধের মধ্যে ঠিকই ধরে রেখেছিলো। সংবাদ চললো আদমজী জুটমিলের মতো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।

ভোরের কাগজের কল্যাণে আমাদের কাছে গুরু হয়ে উঠেছিলেন সঞ্জীব চৌধুরী। দলছুটের সঞ্জীব দা। তাঁর বোহেমিয়ান জীবন আমাদের দারুণ আকর্ষণ করতো। তার গল্প, তার গান, তার ফিচার- সবকিছুতেই মুগ্ধতা। ভোরের কাগজের ফিচার বিভাগের এতো উৎকর্ষের পেছনের নীরব কারিগর ছিলেন উনি। নব্বইয়ের শেষের দিকে ভোরের কাগজের চারতলায় চাঁদের হাট বসত তাকে ঘিরে। গানের লোক বাপ্পা মজুমদার আসতেন। গান নিয়ে চলতো পরিকল্পনা। মডেল-অভিনেত্রীরা আসতেন পত্রিকায় একটু জায়গা পাওয়ার আশায়। একজন যশপ্রার্থী মডেল নিয়মিত আসতেন, যিনি পরে হয়ে উঠলেন জয়া আহসান। আব্দুন নূর তুষার আসতেন শুভেচ্ছার স্ক্রিপ্ট ঠিক করতে। আনজির লিটন আহসান হাবিব আসতেন আড্ডা মারতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক ঝাঁক তরুণ আসতো। তারা আড্ডার ফাকেঁ এটা ওটা লিখে দিতো। বলা হতো কন্ট্রিবিউটর। এদের একজন নবনীতা এখন বিরাট সেলিব্রেটি।

সেই চাঁদের হাটেও অমবস্যার আলো নামলো। সঞ্জীব’দার মতো একটা ভার্সেটাইল ট্যালেন্টকে বিদায় করে দেয়া হলো। উনি প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা দৈনিক যায়যায়দিনে যোগ দিলেন। তার সঙ্গে যোগ দিলেন দেশের বাঘা বাঘা সব সাংবাদিক। অন্যান্য পত্রিকা থেকে অন্তত কয়েকগুণ বেশি বেতন অফার করলো যায়যায়দিন। কিন্তু পত্রিকা বের হয় না। প্রায় আড়াই বছর তাদের কেবল প্ল্যানিংয়ের কাজে ব্যস্ত রাখা হলো। পরে শুনলাম এটা এক ধরনের গ্রাউন্ডেড করার পলিসি। যাতে এই সব মেধাবী সাংবাদিকরা পত্রিকা বা টিভিতে কাজ করতে না পারে। কারণ এরা কাজের সুযোগ পেলেই সরকারের বিরুদ্ধে লিখবে।

সাপ্তাহিক যায়যায়দিনে বিজ্ঞাপন দেখে দৈনিকে কাজ করার জন্য আবেদন করলাম। মজার ব্যাপার যেদিন অনার্স শেষ বর্ষের শেষ পরীক্ষা দিয়ে বাসায় ফিরেছি, সেদিনই আবেদনটা করলাম। ২০০২-এ যে পরীক্ষা হওয়ার কথা সেটা হলো ২০০৫-র শেষে। তখন ভাবতাম একটা চাকরি পাওয়াই অনেক।

২০০৬-র ফেব্রুয়ারিতে যায়যায়দিনে কাজ শুরু করি। জুনের ৬ তারিখ পত্রিকাটা বের হয়। সময়গুলো ভালোই কেটেছিল। অনেক কিছু শিখেছি। উঁচু নিচু অনেক মানুষের সঙ্গে মিশেছি। সে বছরের অক্টোবরের শেষে সরকার ফল করে। একদিন ঢাকা অফিসের সাংবাদিকরা যেয়ে দেখেন তেজগাঁর লাভ রোডের অফিসের সামনে ছাটাইয়ের নোটিশ। আমাদের চিফ ও ডেপুটি দুজনের চাকরি গেলো। দায়িত্ব পেলেন রবোট মার্কা একজন। উনি আমলা হিসেবে ঠিক আছেন, রিপোর্টার হিসেবে নন।

যে সাংবাদিকদের আড়াই বছর বসে খাওয়ানো হলো, পত্রিকা প্রকাশের ৫ মাসের মাথায় তাদের চাকরি নেই। এদিকে সম্পাদক লন্ডন যাওয়ার পথে বিমানবন্দর থেকে আটক হলেন। আমরা যা বোঝার বুঝে গেলাম।

শতাব্দীর শুরুতে ইত্তেফাকের নাম করা বার্তা সম্পাদক গোলাম সরওয়ার পত্রিকা জগতে একটা ধাক্কা দিলেন। যমুনা গ্রুপের অর্থায়নে বের করলেন দৈনিক যুগান্তর। সেটাও আকর্ষণীয় একটি পত্রিকা ছিলো। হাসানুজ্জামান সাকীর কল্যাণ আমিও লিখেছি সেখানে। বছর পাঁচেক পর এই গোলাম সরওয়ার সাহেব যুগান্তর ছেড়ে বের করলেন সমকাল। টাকা দিল হামীম গ্রুপ। সেটাও বেশ জনপ্রিয় হলো। তিনি আবার যুগান্তরে ফিরে গেলেন। কিছুদিন পর ফিরে এলেন সমকালে। পুরো বিষয়টা আমার কাছে রহস্যজনক মনে হলো। এরও আগে বেক্সিমকো গ্রুপের অর্থায়নে নব্বইয়ের শেষের দিকে একটা ক্ষণজীবী দৈনিক এসেছিল। মুক্তকণ্ঠ। প্রবীণ সাংবাদিক কে জি মুস্তফা হলেন সম্পাদক। এতো জাক জমক পত্রিকা আমি কম দেখেছি। এরাই প্রথম বই আকারে ৩২ পৃষ্ঠার ম্যাগাজিন দিল পত্রিকার সঙ্গে। নাম প্রবাহ। এদের ব্রডশিটের সাহিত্য পাতার নাম ছিল খোলা জানালা। সম্পাদনা করতেন আবু হাসান শাহারিয়ার। এমন সাহিত্য পত্রিকা আর হয়নি। এতো বর্ণাঢ্য। এতো জৌলুসী। মুগ্ধ হয়ে পড়তাম। এর পরে আজকের কাগজও একটা সাহিত্য পাতা বের করে। নাম সুবর্ণরেখা। সেটাও দারুণ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছিলো।

আরো ৫ বছর পর কালের কণ্ঠ এলো বসুন্ধরা গ্রুপের অর্থায়নে। তখন বুঝলাম এ আর কিছু না, শিল্পপতিরা মিডিয়ায় তাদের প্রভাব বিস্তারে নেমেছেন। আমি কোন একসময় ভোরের কাগজের পাঠক সংগঠন করতাম। সে সূত্রে কোন পত্রিকা হলেই তাদের স্থানীয় লোকজন ধরতে পাঠক সংগঠনে যুক্ত হওয়ার জন্য। আমি সযত্নে তা এড়িয়ে গেছি। প্রকৃত প্রেম তো জীবনে একবারই হয়।

২০০৭-র তত্ত্বধায়ক সরকারের আমলে ২ টাকা দামের একটা পত্রিকা দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠে তার শর্ট এন্ড স্মার্ট নিউজের জন্য। আমাদের পরিচিত অনেকেই তাতে যোগ দেন। সেখানে আবু হাসান শাহরিয়ার দারুণ দারুণ সব কলাম লিখতেন। আজকের কাগজের সেই সাড়াজাগানো সম্পাদক নাইমুল ইসলাম খান এটির সম্পাদনায় ছিলেন। বেশ জনপ্রিয় হয়েছিলো। এর অফিসেও আমি গিয়েছি। এক গাদা সাংবাদিক। কারো মুখে হাসি নেই। বসার ভালো জায়গা নেই। শ্রম শোষণের একটা দৃষ্টান্ত যেন।

এই ফাকেঁ বলে নেই, সেসময় চমৎকার কিছু বিষয়ভিত্তিক  সাপ্তাহিক বা মাসিক হত। যেমন বিজ্ঞান নিয়ে হত সাপ্তাহিক অহরহ। ক্রীড়া ম্যাগাজিন ছিলো অনেক। আমি প্রায় পড়তাম ক্রীড়ালোক। খেলোয়াড়দের পোস্টার ও স্টিকার মিলত পত্রিকার সঙ্গে। নারী পত্রিকা বেগম জনপ্রিয় ছিলো। পরে এলো অনন্যা। আসল কথাই বলা হয়নি। তখন প্রায় সকল কিশোরের হাতে থাকত রহস্য পত্রিকা। আমাদের স্কুলে ছেলেরা বেঞ্চের নিচে লুকিয়ে রহস্য পত্রিকা পড়তো। আমি পড়তাম না। আমার ভয় লাগতো। আমি পড়তাম মিসির আলি।

এদিকে ভোরের কাগজ ছেড়ে যারা প্রথম আলোয় গেলেন তাদের কয়েকজনের সঙ্গে আমাদের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিলো। ৯৮-র নভেম্বরে প্রথম আলো বেরুল। তারা বলত ভোরের কাগজের ভবিষ্যৎ নেই। প্রথম আলোয় লিখ। লেখা প্রতি টাকা। ওমা, বছর পাঁচেকের মাথায় এরাও সব চাকরি হারালেন। এতো নিবেদিতপ্রাণ মেধাবী মানুষদের এই পরিণতি আমাকে ভীত করে তুললো।

পরে বুঝলাম খবরের কাগজের মানুষের খবর কেউ রাখে না। ঝলমলে ছাপার আড়ালে কষ্টগুলো চাপা পড়ে যায়। এ দুঃখে পারফরমেন্স রেটিং-এর টপে থাকা সত্ত্বে ২০০৬-র নভেম্বরে চাকরিটা ছেড়ে দেই। শপথ করি এই রঙের দুনিয়ায় আর থাকবো না। এ দেশে সৎ জীবনযাপন করে মিডিয়ায় টিকে থাকা কঠিন। আমার মনে আছে এক ভদ্রলোক উপজেলা সংবাদদাতা হওয়ার জন্য ঘুরঘুর করতেন। আমাদের সিনিয়ররা তাকে পাত্তা দিতেন না। পরে শুনি উনি মস্ত ধনী। শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের শেয়ার আছে তার। তাহলে এই লাইনপ্রতি সম্মানীর চাকরি উনি চান কেন? আমার কাছে বেশ রহস্যের মনে হলো। নাকি নিছক শখ। তখন সিনিয়ররা বললেন, এ লোক সাংবাদিকতা করেই এসব করেছে। এখন আর কেউ তাকে প্রশ্রয় দেয় না, তার অপকর্ম সবার জানা। তাই তিনি নতুন পত্রিকায় ঢুকতে চান। তার টাকা প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন পরিচয়। এই পরিচয় ভাঙিয়ে যা করার উনি করবেন।

অথচ এক মাস বেতন বন্ধ থাকলে আমাদের কলিগদের মুখ কালো হয়ে যেতে দেখতাম। কিন্তু সাংবাদিক বলতে আমরা এদেরকেই বুঝি। এদেরকেই সন্দেহ করি। ক্ষেত্রবিশেষে ঘৃণাও। আড়ালে যারা শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের মালিক হয়ে যাচ্ছে তাদের খবরই জানতে পারি না।

লেখক: কলেজ শিক্ষক

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]