কাছের মানুষেরা সরে সরে যাচ্ছি দূরে, আরো দূরে!

কাটাঘুড়ি বিভাগে নিয়মিত লিখবেন বিশিষ্ট অভিনেত্রী ও পরিচালক আফসানা মিমি । জানাবেন এই জীবন ও আশপাশ নিয়ে তার সাতসতেরো ভাবনার কথা ।

আমার জন্ম ১৯৬৮ সালের ২০ ডিসেম্বর।
এ নিয়ে পরিবারে খানিক তর্ক আছে।
গুরুজনেরা কেউ বলেন ‘১৯৬৯’
মাঝে মাঝে আব্বাও খানিক সংশয়ে পড়ে যান।
বার্থ সার্টিফিকেট কখনও তোলা হয়নি, প্রয়োজন পড়েনি বলে।
আর আমারও এক বছর ছোট হয়ে যাবার আগ্রহ হয়নি কখনও।
কেবল বড়ই হতে চেয়েছি যে…
প্রায় প্রতি বছরই ২০ ডিসেম্বর জন্মস্থান হলি ফ্যামিলি, বর্তমানে রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালে যাই।
এই অপূর্ব ঘটনাটি ঘটতে শুরু করে কোন এক ডিসেম্বরে আমার জন্মদিন থেকে, সনটা মনে নেই।
মা হঠাৎ ডেকে বললেন, ‘ চল’
মাকে খুব ভয় পেতাম। ‘কোথায়?’
মা রহস্য ভালোবাসতেন। বললেন না কিছু। দোকানে গিয়ে ছোট্ট উপহার কেনা হলো।
নবজাতকের জন্য উপহার!
তারপর… পৌঁছালাম হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের নিওনেটাল ওয়ার্ডে।
মা বললেন, ‘এই খানে তুই জন্মেছিলি, ঘড়িতে তখন বেজেছিল রাত সাড়ে ন’টা। তোর জন্মের পর
সময়টা মনে রাখার জন্য লেবার রুমের দেওয়াল ঘড়িটা দেখে নিয়েছিলাম।’
মুহূর্তে মনে হলো ১৯৬৮ তে পৌঁছে গেলাম।
সারি সারি কটের ভিতর শুয়ে আছে নবজাতকেরা।
আমিও …
মুুগ্ধ হয়ে ঘুরে ঘুরে দেখছি…
মা বলে চলেছেন, ‘আমার খুব ভয় লাগতো, ভুল করে যদি অন্য কাউকে দিয়ে যায়! তাই তোকে যখন
আমার কাছে নিয়ে আসতো, নম্বর মিলিয়ে দেখে নিতাম।’
হাসি, মনে মনে বলি …
‘ছোটবেলা থেকে সেটাই যে আমার অভিমান! আমি এ বাড়ির কেউ নয়।
তাহলে তোমরা আমায় বোঝনা কেন?’
সেই থেকে প্রত্যেক বছর ডিসেম্বর মাস এলেই, এক রকমের অপেক্ষা শুরু হয় ২০ তারিখের…
অপেক্ষা করে থাকেন হাসপাতালের সিস্টাররাও…
আমার জন্মেও এই দিনটি আমার সবচেয়ে ভালোলাগার দিন।
ভাগ্যিস জন্মেছিলাম।
নইলে জীবনের রঙ-রূপ-রস চাখা হতো না যে!
নিজেকে নিয়ে উদযাপন আমার ভালোলাগে না।
ভালোলাগে নিজের জন্য উদযাপন।
একদা আমার জন্য এক দারুন উদযাপন হয়েছিলো…
সময়টা ২০০৫। নানা রকম উত্থান-পতনের বছর।
২০ ডিসেম্বর সন্ধ্যাটা কাউকে বরাদ্দ দিতে চাইনা। তবু…
সুবর্ণা আপার অনুরোধ, সন্ধ্যায় আসবেন অফিসে, জরুরি আলাপ আছে।
সব ছুটোছুটি সেরে যখন ফিরলাম, অফিস বাড়িটা অন্ধকারে ঢাকা!
খানিক সঙ্কায় বারান্দার সিঁড়িতে পা রাখতেই চমকে উঠলাম।
দোলনায় দীর্ঘদেহী একজন মানুষ বসে। অন্ধকারে চশমার কাঁচ জ্বলছে।
আলমগীর ভাই!
বিস্ময়ের ঘোর কাটবার আগেই আলো জ্বলে উঠলো।
‘কাছের মানুষ’ এরা সবাই।
কাছের মানুষেরা সব্বাই।
এমন ভালোবাসার গল্পটা বলতে ভীষণই ভালো লাগছে।
তারপর রাতভর আনন্দ-ফুৃর্তি, গান-গল্প। আর খাওয়া-দাওয়া ছাড়া আড্ডা জমে?
এই ‘বিস্ময়’ নাটকের পরিকল্পনা ছিলো সুবর্ণা আপার, সাথী আলমগীর ভাই।
কাছের মানুষের কলা-কুশলী সকলই ছিলেন, আর কৃঞ্চচূড়ার বন্ধুরা ছিল এই গোপনযজ্ঞের সহযোগী।
ফরিদী ভাই এক বাক্স উপহার দিয়েছিলেন যার সবকিছুই ছিলো সাদা!
গল্পটা বলতে গিয়ে মন কেমন করলো।
কিন্তু কিম্ভুত সব সমীকরণে বাধা পড়ে চলেছি নিয়ত…
কেবলই ছুটছি!
কাছের মানুষেরা সরে সরে যাচ্ছি দূরে, আরো দূরে!
বাড়ির দেওয়ালগুলোর মতো মনেরও দেওয়াল উঠছে
আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে প্রিয় মুখগুলো…
প্রিয় সর্ম্পকগুলো।
এভাবেই বুঝি একদিন সর্বস্বান্ত হবো আমরা।

৩ এপ্রিল, ২০১৬
ঢাকা।

ফটো ক্রেডিট : জান্নাতুল মাওয়া