কাছের মানুষ…

ইরাজ আহমেদ

কৈশোরে তাদের সঙ্গে দেখা হতো। শৈশবেও তারা ছিলো। এই যেমন, বাড়ি রঙ করার মিস্ত্রী, জুতাসেলাই করা লোকটা, পুরনো খবরের কাগজের ক্রেতা, দুধওয়ালা, আইসক্রীমে বিক্রেতা, ঠ্যালাগাড়ি চালক-আরো কত কে! স্বজনের মতো, বন্ধুর মতো এই শহরে তারা ছিলো কোনো একদিন।তারা যে আমাদের অনাত্নীয় সেটাই ভুলে যেতাম তখন। এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি, এক পাড়া থেকে আরেক পাড়ায় তাদের সঙ্গে সম্পর্কের সুতোটা লম্বা হতে থাকতো। আজকাল তেমন মানুষ আর কোথাও দেখি না। দেখা মিললেও এই প্রাণহীন শহরে তাদের আর তেমন করে জানা হয় না।  

প্রতি বছর শীতকালে বাড়ি রঙ করতে লোক আসতো। একই লোক প্রতি বছর আসায় ওদের সঙ্গে সখ্য তৈরী হয়ে গিয়েছিলো। রঙের বালতি ঝুলিয়ে বড় বড় বাঁশ হাতে আসতো রঙমিস্ত্রী। ওরা বাড়ির দেয়াল থেকে পুরনো রঙ ঘষে তুলতো শিরিষ কাগজ দিয়ে।সাদা রঙের গুড়ায় ভরে যেতো চারপাশ, মাথার চুল। মিস্ত্রীদের সঙ্গে গল্প হতো। দেয়াল রঙ করার সময়টা ছিলো আরো রোমাঞ্চকর। রঙের গন্ধে ঘর ভারী হয়ে উঠতো। মিস্ত্রীরা ভাঁড়া লাগিয়ে ওপরে উঠে রঙ করতো। তখন আমিও ওদের সঙ্গে রঙ করার কাজে লেগে যেতাম। লোকগুলো বেশীরভাগ সময় তাদের গ্রামের বাড়ির গল্প করতো। শহরে কোনো বস্তিতে কষ্ট করে থাকে সে জীবনের কথা বলতো। আমি শুনতাম তাদের গল্প্ কেন যে শুনতাম তা এখনো বুঝি না। কিন্তু একধরণের আত্নীয়তা তৈরী হয়ে গিয়েছিলো ওই মানুষগুলোর সঙ্গে। বছরের শেষে তারা আসতে দেরি করলে মন খারাপ হতো। রঙের ওই কিছুদিন পড়াশোনাও থাকতো না। ছুটির আবহাওয়া বিরাজ করতো বাসায়।কাজ ফুরিয়ে তারা চলে গেলে কয়েকটা দিন মন খারাপ করে থাকতাম।

এমনি সখ্য ছিলো নারিন্দা সুইপার কলোনী থেকে আসা পরিবারটির সঙ্গে। তখন আমাদের পাড়ায় সেফটি ট্যাংক আর বাথরুম পরিস্কার করতেই আসতো তারা। এখনকার মতো সেই শহরে স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। তারা আসতো দলেবলে। বাড়ির বউ, তার শাশুড়ি, ছেলে, মেয়ে। বউ আর শাশুড়ি আসতো হাতে বড় ঝাড়ু নিয়ে। তাদের কোমরে ঝুলতো চা খাওয়ার জন্য টিনের মগ। কানে গোঁজা থাকতো মোটা চুরুট। আমাদের বাসায় কাজ করতে এসে তারা প্রথম বসে থাকতো উঠানে। আমার দাদু ওদের চা দিতো। চা খেয়ে দুই মহিলা চুরুট ধরিয়ে টানতো। ওদের বাচ্চাগুলো খেলতো উঠানে। তারা কথা বলতো অর্ধেক বাংলা অর্ধেক মাদ্রজী ভাষায়। কারণ তাদের পূর্ব পুরুষরা একদা মাদ্রাজ থেকেই এসেছিলো এ দেশে। মহিলাটির এক কিশোর পুত্র ছিলো। আমার বয়সীই হবে। তার সঙ্গে মার্বেল খেলতাম উঠানে।

যতদূর মনে পড়ে এই পরিবারটিকে আমি প্রথম দেখি ঢাকার নয়াপল্টনে থাকার সময়।তারপর যতবার ভাড়াটে বাড়ি বদলাতে হয়েছে তারাও আমাদের কাজ করার জন্য গেছে সঙ্গে সঙ্গে। এদের পুরো পরিবারকে ওষুধপত্র দিয়ে সাহায্য করা হতো বাসা থেকে। এদের সঙ্গে এক ধরণের সম্পর্কে জড়িয়ে গিয়েছিলাম আমরা।ওই মহিলার শাশুড়ি আমাকে ‘ছোটা বাবা’ বলে ডাকতেন আজো মনে আছে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে আমরা কিছুদিন ছিলাম নয়া পল্টন এলাকায়। তখন পুরনো খবরের কাগজ কিনতে আসতো এক বৃদ্ধ। বাবা সাংবাদিক হওয়ায় মাস শেষে অনেক পত্রিকা জমা হতো বাড়িতে। বৃদ্ধ মানুষটা নিয়ম করে মাসের শেষ রবিবার(তখন সাপ্তাহিক ছুটির দিন) চলে আসতেন আমাদের বাসায়। ঝুড়ি ভরে অনেক কাগজ নিয়ে যেতেন। কাজ শেষ হলে কোনোদিন তাকে চা দেয়া হতো। দরজায় বসেই চা খেতেন আর গল্প করতেন বাবার সঙ্গে। সেই মানুষটা আমাদের ভাড়াটে বাড়ি বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে চলে আসতেন নতুন পাড়ায়। আবার শুরু হতো খবরের কাগজ কেনাবেচা। সেই বৃদ্ধ কোনো মাসে না-এলে বাবাকে দেখতাম চিন্তিত হয়ে পড়তো। অসুস্থ হয়ে পড়েনি তো আমাদের ফেরিওয়ালা?

আমার বেড়ে ওঠার সময়টা কেটেছে সিদ্ধেশ্বরী এলাকায়। সেখানে ছিলো এক মুচি। দুপুরবেলা পাড়ায় তার হাঁক শোনা যেতো। কখনো রাস্তায় পেলে প্রায় জোর করে জুতা মেরামত করতো। তখন খুব ঝকঝকে জুতা পড়তে পেতাম না। মানুষটা পা থেকে প্রায় জোর করে জুতা খুলে নিয়ে কাজ করে দিতো। আপত্তি করলে গম্ভীর গলায় বলতো-এহন পয়সা লাগবো না। পরে দিয়েন, কামটা তো কইরা দেই।

বিষয়টা অনেকটা দাবির মতো ছিলো।

চারপাশে তখন অদ্ভুত সব মানুষ ছিলো। পথে কখনো দেখা হলে মনে হতো আপনজনের সঙ্গে দেখা হয়েছে। শান্তিনগর এলাকায় বিশাল কাঁচা বাজারে ছিলো বাবার পরিচিত এক মাছওয়ালা। বাবা কাজের সূত্রে বিদেশে গেছে হয়তো।আমি কোনো কাজে বাজারে গেছি। ডেকে হাতে মাছ ধরিয়ে দিতো ব্যাগে ভরে। নিতে না-চাইলে বলতো-দাদা দ্যাশের বাইরে…নিয়া যান কাকা, ট্যাকা পরে দিয়েন।

ছোট ভাইটার জ্বর, দুধওয়ালা এসে খবর নিয়ে যেতো, বইয়ের দোকানের মালিক পথে ডেকে জানতে চাইতো লেখাপড়ার খবর। পথ চলতে সবাই তখন আপন মানুষ ছিলো সেই শহরে। এখন আর সেইসব কাছের মানুষ কোথাও দেখি না।

ছবিঃ প্রাণের বাংলা