কাঠের সেই উটটি

ড: সেলিম জাহান

ড.সেলিম জাহান। আমেরিকার মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অভ্যাগত অধ্যাপক হিসেবে পড়িয়েছেন, পড়িয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কাজ করেছেন জাতিসংঘেও। লেখাপড়ার বিষয় অর্থনীতি হলেও লেখালেখি, আর তাঁর চিন্তার দিগন্ত একেবারেই ভিন্ন এক পৃথিবীর গল্প। প্রাণের বাংলার জন্য এবার সেই ভিন্ন পৃথিবীর গল্প ধারাবাহিক ভাবে লিখবেন তিনি। শোনাবেন পাঠকদের নিউইয়র্কের একটি দ্বীপে তার বসবাসের স্মৃতি।

কন্যার হাতে জিনিষটি তুলে দিতে পেরে একটি স্বস্ত্বির নি:শ্বাস ফেললাম। এমন আহামরি কিছু বস্তু নয় – কাঠের একটি ছোট উট। নিয়ে এসেছি সেই সুদূর রুজভেল্ট দ্বীপ থেকে। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম জেষ্ঠ্যা কন্যাকে যে উটটি তাকে দেবো, সে প্রতিশ্রতি রক্ষা করতে পেরে বড় তৃপ্ত লাগলো। কন্যা সেই সেগুন কাঠের উটটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগলো পরম মমতায়, তারপর এক সময়ে সেটিকে আস্তে করে নামিয়ে রাখলো খাবার টেবিলে ওপরে।

আমার জানা মতে, একখন্ড একক কাঠ থেকে তৈরী উটটির বয়স ৭০ বছর। উটটির মালিক ছিলেন স্বনামধন্য সাহিত্যিক অধ্যক্ষ ইব্রাহীম খাঁ। কোথা থেকে তিনি উটটি পেয়েছিলেন, আমার জানা নেই – হতে পারে মধ্যপ্রাচ্য ভ্রমনের সময়ে কেউ তাঁকে উটটি উপহার দিয়েছিলো, অথবা অন্য কিছু। সে যাই হোক, তিনি সে উটটি উপহার দিয়েছিলেন তাঁর পুত্রবধূকে। সে উপহার ছিলো তাঁর পুত্রের বিবাহ উপলক্ষ্যে চল্লিশ দশকের শেষের দিকে।সে বিয়ে অবশ্য বেশীদিন টেঁকে নি – কিছুদিন পরেই বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। পিতৃগৃহে প্রত্যাবর্তনের কালে বধূটি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন সে উটটি। তারপর তিনি সেটি সম্ভবত: উপহার দিয়েছিলেন তাঁর জৈষ্ঠ্যভ্রাতা প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীকে। সত্তুর দশকে আমি উটটিকে শোভা পেতে দেখেছি অধ্যাপক চৌধুরীর গুলশানস্হ বসার ঘরে।সে ঘরের মাঝখানে ছিলো একটি আম্র-আকৃতির নীচু টেবিল। ভারী সুন্দর ছিলো টেবিলটি। প্রথমে একটি বড় আকৃতির শোয়ানো আমের ওপরে ছিল শোয়ানো একটি মাঝারি আকৃতির আম এবং তার ওপরে আবারো শোয়ানো ছিলো একটি ছোট আকৃতির আম। এ তিন স্তরের আম্র টেবিলের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকতো। পরবর্তী সময়ে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতে এলেন, তখন উটটি বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকায় এলো তাঁর বসার ঘরে। তারপর উটটির আবাসস্হল হলে নয়া পল্টনের ‘গাজী ভবনে’, আবারও অধ্যাপক চৌধুরীর বসার ঘরে।

গত দশকের মধ্যভাগে অধ্যাপক চৌধুরীর রোগাক্রান্ত মধ্যম কন্যা বেনু বাবার কাছে ঐ উটটি চায়। আমি দীর্ঘদিন ধরে জানি যে, ঐ উটটি তার ভারী পছন্দের ছিলো। স্নেহাতুর পিতা দীর্ঘ রোগাক্রান্ত কন্যাকে উটটি দিয়ে দেন। সেই থেকে ওটি আমাদের রুজভেল্ট দ্বীপের বাড়ীতে ছিলো। সেও তো একযুগ হয়ে গেলো। বেনু ওটার খুব যত্ন নিতো – ধূলোবালি ঝাড়তো, মুছতো, তেল ঘষতো। আমার কন্যারাও খুব ভালোবাসতো উটটিকে – বলা চলে, এ জড় জিনিসটি আমাদের পরিবারেরই একজন সদস্য হয়ে গেলো।

বেনু চলে যাওয়ার পরেও উটটি আমাদের বাড়ীতে রয়ে গেলো তাঁর পুরোনো জায়গায়। তার পূর্বমনিবত তার যতটা যত্ন করতো, আমি ততটা পারতাম না। খুব সম্ভবত: আমার মন-মানসিকতা তেমনটা ছিলো না। বছর দুই আমাদের জৈষ্ঠ্য কন্যা নিউইয়র্কে আমার কাছে বেড়াতে এসে আমার কাছে উটটি চাইলে – ঠিক একদিন তার মা যেমনটি তার মাতামহের কাছে চেয়েছিলে। হয়তো তার মায়ের কথা ভেবেই এক দূর্বলতা তার মনে জন্ম নিয়েছিলো। তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে ওটি তাকে দেবো।

উটটি তাকে দেয়ার মাধ্যমে কন্যাকে দেয়া আমার প্রতিশ্রুতি রক্ষিত হলো। কিন্তু সেই সঙ্গে আমার মনে হলো যে, উটটির হয়তো একটি দীর্ঘ পরিক্রমা শেষ হলো। হয়তো ভবিষ্যতের কোন এক দিন আমার দৌহিত্রীও তার মায়ের কাছে ঐ উটটি চাইবে – যেমন তার মা চেয়েছিলো তার মাতামহের কাছে, যেমন তার মাতামহী চেয়েছিলেন তার প্রমাতামহের কাছে। কে জানে?

লেখক:ভূতপূর্ব পরিচালক

মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং 

দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগ

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী

নিউইয়র্কযুক্তরাষ্ট্র

ছবি: লেখক


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box