কাদম্বিনী গাঙ্গুলী :প্রথম বাঙালী মহিলা ডাক্তার

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আহমেদ জহুর

কাদম্বিনী রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের চক্ষুশূল হয়ে দাঁড়ায়েছিলেন। ‘বঙ্গবাসী’ পত্রিকা পরোক্ষভাবে তাকে বেশ্যা বলেছিল। কাদম্বিনী তখন বঙ্গবাসী পত্রিকার বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। মামলায় জিতেও গিয়েছিলেন। হ্যা বন্ধুগণ, আমি ব্রিটিশ ভারতের প্রথম দুইজন মহিলা স্নাতকের একজন এবং ইউরোপীয় চিকিৎসা শাস্ত্রে শিক্ষিত দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মহিলা চিকিৎসক কাদম্বিনী গাঙ্গুলীর কথা বলছি।১৮ই জুলাই গেলো তাঁর ১৫৯তম জন্মবার্ষিকী। উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে তিনি পাশ্চাত্য চিকিৎসায় ডিগ্রী অর্জন করেন এবং আনন্দীবাঈ জোশীর সঙ্গে তিনিও হয়ে ওঠেন ভারতের প্রথমদিককার একজন নারী চিকিৎসক।

ব্রাহ্ম সংস্কারক ব্রজকিশোর বসুর সুযোগ্য কন্যা কাদম্বিনী গাঙ্গুলী ভারতের বিহারের রাজ্যের ভাগলপুরে ১৮৬১ সালের ১৮ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। তবে তাঁর পৈতৃক বাড়ি ছিলো বাংলাদেশের বরিশালের চাঁদশীতে। তাঁর বাবা ভাগলপুর স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন এবং তিনি অভয়চরণ মল্লিকের সঙ্গে ভাগলপুরে মহিলাদের অধিকারের আন্দোলন করেছিলেন। তাঁরা মহিলাদের সংগঠন এবং ভাগলপুর মহিলা সমিতি’ স্থাপন করেছিলেন ১৮৬৩ সালে। কাদম্বিনী তাঁর পড়াশোনা আরম্ভ করেন বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয়ে। এরপর বেথুন স্কুলে পড়ার সময়ে ১৮৭৮ সালে প্রথম মহিলা হিসাবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে পাস করেন । তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বেথুন কলেজ প্রথম এফ.এ (ফার্স্ট আর্টস) এবং তারপর অন্যান্য স্নাতক শ্রেণি আরম্ভ করে। কাদম্বিনী এবং চন্দ্রমুখী বসু বেথুন কলেজ থেকে প্রথম গ্র্যাজুয়েট হয়েছিলেন ১৮৮৩ সালে। তাঁরা বি.এ পাস করেন এবং তাঁরাই ছিলেন ভারতের প্রথম মহিলা গ্র্যাজুয়েট।

গ্র্যাজুয়েট হবার পর কাদম্বিনী দেবী সিদ্ধান্ত নেন তিনি ডাক্তারি পড়বেন। ১৮৮৩ সালে মেডিকেল কলেজে ঢোকার পরেই তিনি সমাজসংস্কারক ও মানবদরদী সাংবাদিক দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীকে বিয়ে করেন। বিপত্নীক দ্বারকানাথের বয়স তখন ৩৯ বছর এবং কাদম্বিনীর বয়স একুশ। কাদম্বিনী ফাইন্যাল পরীক্ষায় সমস্ত লিখিত বিষয়ে পাস করলেও প্র্যাকটিক্যালে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অকৃতকার্য হন । ১৮৮৬ সালে তাঁকে জিবিএমসি (গ্র্যাজুয়েট অফ বেঙ্গল মেডিক্যাল কলেজ) ডিগ্রি দেওয়া হয় । তিনি ছিলেন প্রথম ভারতীয় মহিলা, যিনি পাশ্চাত্য চিকিৎসারীতিতে চিকিৎসা করবার অনুমতি পেয়েছিলেন। মেডিকেল কলেজে পড়ার সময়ে তিনি সরকারের স্কলারশিপ পেয়েছিলেন।

তিনি পাঁচ বছর মেডিকেল কলেজে পড়াশোনার পর ইংল্যান্ডে যাবার আগে ১৮৮৮ সালে কিছুদিন লেডি ডাফরিন মহিলা হাসপাতালে কাজ করেন।

১৮৮৯ সালে বোম্বেতে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের পঞ্চম অধিবেশনে প্রথম যে ছয় জন নারী প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন কাদম্বিনী ছিলেন তাঁদের অন্যতম। পরের বছর তিনি কলকাতার কংগ্রেসের ষষ্ঠ অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন। কাদম্বিনী ছিলেন কংগ্রেসের প্রথম নারী বক্তা। তিনি গান্ধীজীর সহকর্মী হেনরি পোলক প্রতিষ্ঠিত ট্রানসভাল ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম সভাপতি এবং ১৯০৭ সালে কলকাতায় মহিলা সম্মেলনের সদস্য ছিলেন। এছাড়া তিনি ১৯১৪ সালে কলকাতায় সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। অধিবেশনটি মহাত্মা গান্ধীর সম্মানের জন্য আয়োজন করা হয়েছিল। চা বাগানের শ্রমিকদের শোষণের বিষয়ে কাদম্বিনী অবগত ছিলেন এবং তিনি তাঁর স্বামীর দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থন করেছিলেন, যিনি আসামের চা বাগানের শ্রমিকদের কাজে লাগানোর পদ্ধতির নিন্দা করেছিলেন। কবি কামিনী রায়ের সঙ্গে কাদম্বিনী দেবী ১৯২২ সালে বিহার এবং ওড়িশার নারী শ্রমিকদের অবস্থা তদন্তের জন্য সরকার দ্বারা নিযুক্ত হয়েছিলেন।

কাদম্বিনী গাঙ্গুলী হিন্দু রক্ষনশীল সমাজের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন। ১৮৯১ সালে রক্ষনশীল বাংলা পত্রিকা বঙ্গবাসী তাকে পরোক্ষভাবে বেশ্যা বলেছিল। কাদম্বিনী তখন এর বিরুদ্ধে মামলা করে জিতে গিয়েছিলেন। ‘বঙ্গবাসী’র সম্পাদক মহেশচন্দ্র পালকে অর্থ জরিমানা ও ছয় মাসের জেল দেওয়া হয়েছিলো।

কাদম্বিনী গাঙ্গুলী আট সন্তানের জননী ছিলেন। এ জন্য তাঁকে সংসারে অনেক সময় দিতে হতো। তিনি সূচিশিল্পেও নিপুণা ছিলেন। আমেরিকান বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ডেভিড কফ লিখেছেন, ‘কাদম্বিনী ছিলেন তাঁর সময়ের সবচেয়ে সফল এবং স্বাধীন ব্রাহ্ম নারী। তৎকালীন বাঙালি সমাজের অন্যান্য ব্রাহ্ম এবং খ্রিস্টান নারীদের চেয়েও তিনি অগ্রবর্তী ছিলেন। সকল বাধার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষ হিসেবে নিজেকে জানার তাঁর এই ক্ষমতা তাঁকে সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজে নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলা জনগোষ্ঠীর কাছে অনুপ্রেরণার উৎসে পরিণত করে।’ কাদম্বিনী ১৯২৩ সালের ৩ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন।

ছবি: গুগল

[email protected]

 

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]