শীতের কাঁপন লাগল যখন…

আন্জুমান রোজী (কানাডা থেকে): কানাডার শীত ও শৈত্যপ্রবাহ নিয়ে লিখতে গিয়ে হিমশীতল জমাট-ঠাণ্ডা অনুভব করছি। বাইরে এখন জীরো ডিগ্রী টেম্পারেচার। কনকনে শীত হাড্ডিমজ্জায় কাঁপন ধরিয়ে দেয়। ঘরে ওমওম গরমে বসে থেকেও অনুভূতিতে শীতটা জেঁকে বসে আছে জমজমাট। প্রাণের বাংলার সম্পাদিকা আবিদা নাসরিন কলি যখন কানাডার শীত নিয়ে কিছু লিখতে বললেন, তখন থেকেই শীতের প্রকোপ যেন আরো বেড়ে গেলো। কারণ, কানাডার শীত এক যন্ত্রণাকর বেদনা; বিরক্তিকর, হতাশাব্যাঞ্জক। বিমর্ষ এক ভাব নিয়ে শীতের দিনগুলো পার করতে হয়। চারদিকে ধূসর শুভ্রতা ক্লান্তির ছাপ বাড়িয়ে দেয় আরও বহুগুণ। এরই মধ্যে জীবন বয়ে চলে জীবনের নিয়মে, থেমে থাকে না কোনো কিছু। শীতেও কিছু সুখসুখ অনুভূতি আছে বটে তবে গ্রীষ্ম প্রধান দেশের মানুষের কাছে শীতটা সেভাবে আনন্দ নিয়ে আসেনা। যদিও এ দেশে শীত উদযাপনের অনেক ব্যবস্থা আছে।  শীত নিয়ে লিখতে বসে দেখি স্মৃতির পাতায় বাংলাদেশের শীত এসে ভিড় করছে। আহা, বাংলাদেশের শীত ! কী যে নরম কোমল অনুভূতি ! শীতের মিঠেল রোদের আদর, সে কী ভুলা যায় ! ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশকে মননে আগলে রেখে কানাডার প্রতিটি ঋতুর সাথে মিল খুঁজে বেড়াই। এখানে সব ঋতুর মধ্যে বাংলাদেশকে খুঁজে পেলেও শীতে আর খুঁজে পাওয়া যায়না। বোধ হয় কষ্টটা ওখানে। ভুলে থাকার আশ্রয়টা থাকে বরফের আস্তরে। কানাডায় শীতের অভিজ্ঞতার কথা আমার কিছু প্রিয়ভাজন, সুহৃদ লেখকবন্ধুদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম। শীত নিয়ে তাদের কিছু অনুভূতি এখানে তুলে ধরা হলো।

রওশন আরা বেগম (স্যোসাল এক্টিভিস্ট): …জীবনের ২৩টি বছর কাটিয়েছি গ্রীস্ম প্রধান দেশে। সেখানকার গরম ঠাণ্ডার মধ্যে খুব বেশী পার্থক্য নেই। বরফ পড়া ঠাণ্ডা যে কী তীব্র, তা কখনো অনুভবে আসেনি। সেই বরফপড়া ঠাণ্ডার দেশ উত্তর আমারিকার টরোন্টোতে এসে হাজির হই আজ থেকে বিশ বছর আগে। সময়টি ছিল মার্চের মাঝামাঝি। শীতের তীব্রতা তখন কিছুটা কমের দিকে। তার পরেও দেখতে পাই সাদা বরফ মাটিতে পড়ে আছে, পাতাশূন্য গাছের কঙ্কালটি মাটির সঙ্গে গেঁথে আছে।। আর শীতের তীব্রতা, এই নতুন দেহে ঘরের উষ্ণতার বাইরে একেবারেই অনুপযুক্ত। আস্তে আস্তে সেই ঠাণ্ডাকেই জীবনের সঙ্গে সহনীয় করে তুলেছি জীবনের প্রয়োজনেই। এখন শীত আসার আগেই চেয়ে থাকি বরফ পড়ার আশায়। বরফ না থাকলে এখানকার ক্রিসমাসের উৎসব যেন অসম্পূর্ন থেকে যায়। আর এর সঙ্গে আরো যুক্ত আছে ছেলে মেয়েদের কিছু খেলাধুলা। নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত চলে শীতের তীব্রতা। এই সময় তাপমাত্রা বেশী নীচের দিকে থাকে ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারী পর্যন্ত, প্রায় মাইনাস ১০/১৫ তে তাপমাত্রা নেমে যায়। এই শীতের পোশাক একেবারেই আলাদা। স্কুল গোয়িং বাচ্চাদের স্নো প্যান্ট, স্নোবুটস ও হেবি জ্যাকেট, গ্লোভস, টুপি পড়ে স্কুলে যাওয়া লাগে। তাছাড়া এই শীতে মাঝে মাঝে তুষার ঝড়ের এলার্ট পড়ে। তখন অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। বাইরের তাপমাত্রাও অনেক নীচে নেমে যায় এই সময়ে। এর মধ্যে যদি ১৫/২০ সেন্টিমিটার স্নো পড়ে তাহলে তো রাস্তা ঘাট সব কিছু অচল হয়ে যায় একেবারে। তবে সবচেয়ে মারাক্তক হলো ফ্রোজেন রেইন। এই ফ্রোজেন রেইন হয় মাইনাস ৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায়। এই রেইনে রাস্তা ঘাট গ্লাসের মত হয়ে স্লিপারি বরফ জমে সম্পূর্ন অনুপযুক্ত হয়ে যায়। তবে এই ফ্রোজেন রেইন খুব বেশী হয় না। এর মধ্যেই জীবন জীবিকা কোনটাই থেমে থাকে না। সবই চলে প্রকৃতির নিয়মে। নিজেকে উপযুক্ত করে তৈরী করে এই প্রকৃতিকেই ভালাবেসে ফেলেছি। তাই এখানকার শীত , এই বৈরী আবহাওয়া কোনটাই আজ বেমানান মনে হয় না। সব কিছুকে সহজ ভাবে নিয়ে বেঁচে আছি এই প্রকৃতিরই অংশ হয়ে।

অপরাহ্ণ সুসমিতো (কবি লেখক): -আমস্টাডার্মের বিমান বন্দর থেকে বেরিয়ে যখন হোটেল নেবো,তখন বাইরে বেরুতেই সাঁ করে শীতের একটা বর্শা আমাকে গেঁথে ফেললো কই মাছের মতো। সম্ভবত তখন মাইনাস ২ বা ৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা। আমার কাছে মনে হলো আমি একটা বিশাল রিফ্রেজারেটরের ভেতর।
দেশের বাইরে সেই প্রথম শীতের সাথে লাবণ্য পরকীয়া। তারপর তো ভাসতে ভাসতে এই শহর। মন্ট্রিয়ল।ফরাসী সুরভিত আমার শহর। এখনো মনে আছে দিনটা। ১৭ই জানুয়ারী । বিমান বন্দর থেকে আমাকে বহনকারী গাড়িখানা শহরের দিকে ছুটছে,আমি বাইরে তাকাই আর শীতের দাবদাহ দেখি। ন্যাড়া গাছের শাখায় সাদা তুষার জমে আছে,রাস্তার পাশে তুষারের অসভ্য স্তুপ,ফোঁড়ার মতো জানান দিচ্ছে। অবাক হয়ে এ পাশে তাকাই ও পাশে তাকাই সাদা আর ময়লা সাদা।
আমার মন খারাপ হলো খুব ।বাসায় এসে লাগেজ রাখতেই আমার বন্ধু বললো: চলো ঘুরে আসি।রাস্তায় নামলাম বীর বাহাদুরের মতো। এ আর এমন কি ! ভাবছিলাম অল্প একটু হয়তো হাঁটবো। একটু পরেই টের পেলাম আমার নাকের ডগা পুড়ে যাচ্ছে,আঙ্গুল বুড়ো মানুষের মতো মিহি কুঁচকে যাচ্ছে। আমি পরাজিত হলাম শীতের কামধ্বনির কাছে। সেই প্রথম সেই প্রথম।
মামুন ভাইয়ের বাসায় ঢুকেই শুনতে পেলাম কে যেন বাঁশি বাজাচ্ছে। গরম চা আর অপার আড্ডা হলো সেই রাতে। শিল্পী সৈয়দ ইকবাল,রবি খান তুহিনও ছিল উষ্ণ চায়ে।
সেই থেকে শীত আর আমি পাশাপাশি থাকি। এখন শীতকে ডরাই না । আমার সঙ্গে খোঁচাখুচি করতে আসে। আমি ভারী জুতা,গ্লাভস,ইনার,পশমি টুপি পরে শীতকে ডাকি : আয় তোকে জাপটে ধরি,আয়।
শীতে ভালো থাকি। অনেক স্যুপ খাই,কফি খাই মাঝে মাঝে দলবল বেঁধে রেড ওয়াইন আর কলকল আড্ডা । বাড়ি ফিরে সামারের স্বপ্ন দেখি । এই তো স্বপ্ন দেখতে দেখতেই আয়ু নিয়ে বাঁচি।
তবু পরাজিত হই কখনো শীতের কনকনে বাতাসের শিসে । সত্যি অপছন্দ করি দুটো অসভ্য জিনিষ ;
ক. শীতের কনকন বাতাস
খ. ফ্রিজিং রেইন ( সুন্দর একটা বাংলা নাম কী হতে পারে বলুন তো?

লুবনা ইয়াসমিন (কবি):… সাত সমুদ্দুর তেরো নদী পেরিয়ে এই আটলান্টিকের পাড়ে এসে ষড়ঋতু নয়, এইখানে ফোর সিজনস। আমার কাছে চার ঋতুর এই স্বাতন্ত্র দারুণ লাগে এক কথায়। তবে এর মধ্যে শীতকাল নিয়ে উচ্ছ্বাস হয়না যদিও। আমি গ্রীষ্মমন্ডলের মানুষ, এমন কঠিন শীত যে পাড়ি দেই সেই তো অনেক। তবে যখন এক একদিন সাদা বরফে ঢেকে যায় চারপাশ, কখনো কখনো তাদের ঝরে পড়ার দৃশ্য থেকে চোখ ফেরানো যায়না, বিশেষ করে যখন বড় বড় স্নো ফ্লেকস ঝরতে থাকে রূপকথার দৃশ্যের মত। কিন্তু রোমান্টিকতা ছাপিয়ে যায় ড্রাইভ ওয়ে থেকে বরফ পরিস্কার করা কিংবা বরফ ভেঙে গাড়ি চালানোর কথা ভাবলে। লোকাল রোডগুলোতে বরফ পরিস্কারে সময় নেয়, এর মধ্যে সকাল বেলায় ছেলেকে স্কুলে নামিয়ে নিজের অফিস কিংবা সারাদিন বরফ ঝরতে থাকলে বাড়ি ফেরার ঝক্কি! আমার জন্যে শীতকাল প্রায়ই কিছুটা বিষন্ন সময়, রোদের আকাল থাকে যখন তখন, রোদ উঠলে অন্ততঃ মন ভালো লাগে, বাইরে শীতের ভারী জ্যাকেট আর ইনডোর এর হিটিং এর কল্যাণে শীতবোধকেও কিঞ্চিৎ দূরের মনে করা যায়। শীত আসবার আগে থেকেই আমার স্প্রিং এর জন্যে অধীর অপেক্ষা শুরু হয়ে যায়, পাতা ঝরা গাছের ডালে কবে প্রথম নতুন পাতার কুঁড়ি আসতে শুরু করবে, আমি গাছেদের কাছে গিয়ে গিয়ে খুঁজি শীত শেষ হয়ে আসতে থাকলে। শীতঘুম কেবল পাতা ঝরা বৃক্ষের, কিছু কিছু প্রাণীদের, বেশ হতো আমিও যদি শীতঘুমে যেতে পারতাম, স্প্রিং এর জন্যে অপেক্ষাই আমার শীতযাপনের ড্রাইভিং ফোর্স, নইলে যে কি হত কে জানে!

তাজুল মোহাম্মদ (মুক্তিযুদ্ধ গবেষক):—-শীতকে শীত হিসেবেই দেখি । বাইশ বছর আগে শীতকাল ছিল আমার প্রিয় ঋতু । ঐ সময়টাতে বেশি কাজ করতে পারতাম । কানাডায় অবশ্যি উল্টোটা। ছুটোছুটি করতে কষ্ট হয়। তবে , উপভোগ করি প্রচুর। এখানে দুটো উপায়ে তুষারপাতকে দারুণভাবে উপভোগ করে থাকি। এর একটি হচ্ছে -জানালায় বসেবসে অঝর ধারায় পড়া বরফকে দৃষ্টিতে ধারন করা । অবশ্যি সিডিতে বাজতে থাকে রবীন্দ্র সঙ্গীত। রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর লহরী ব্যতীত . পুরোপুরি রসাস্বাদন আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই একই সঙ্গে আহরণ করি দু’রকমের সুর সূধা। অন্যটি হচ্ছে গাড়িতে বসেবসে বরফ পতন অবলোকন করা এবং একই সঙ্গে এর অপরূপ সৌন্দর্য ও শ্রুতিমধুর শব্দমালা কর্ণ কুহরে ধারণ। বাংলাদেশে যেমন দিনভর .টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ শোনার জন্য আমি কাটিয়ে দিতাম দিনরাত। খুব বেশি বরফ পড়লে – আমি গাড়ির সিডি প্লেয়ারটি অন করে চলে যাই শহর সীমার বাইরে – একেবারে নির্জন কোনো স্থানে। গাড়িতে বসে যুগপৎ কানে ধারণ করি প্রকৃতি সৃষ্ট সাদার চেয়ে অধিক সাদা বরফ পতনের অপূর্ব সুর । একই সংগে রবী ঠাকুরের কাছে নিজেকে করি সমর্পণ। অতি অনুচ্চ উচ্চারনে চলে উভয় সুরের তাল লয়। এ সময় চোখ জোড়া বন্ধ করে কোথায় যে চলে যাই – তা বলা কঠিন । এই অনুভূতি আমি প্রকাশ করতে পারবো না ভাষায়। বরফ ঠেলার সমস্ত কষ্ট কোথায় যে উবে যায় তখন , কিছুই বলতে পারবো না আমি তৃপ্ত হয়ে যাই পরিপূর্ণ ভাবে। এইতো কানাডায় আমার শীত অনুভূতি। এমন করেই কাটে শীত ঋতু ।

শিউলি জাহান (কবি লেখক):—কানাডায় প্রবাদ আছে – “Winter either bites with its teeth or lashes with its tail.” এই শীতের কামড় কিংবা ঠান্ডা বাতাসের তীক্ষ্ণ চাবুক নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের বাঙালিদের জন্য নিঃসন্দেহে আরও ভয়াবহ। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, বাঙালি অভিবাসীদের কী ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা হয় কানাডার শীতে। তবে প্রথম ধাক্কা অতিক্রম করে ক্রমশই অভ্যস্ত হয়ে উঠে সবাই। কানাডার চারটি ঋতুর মধ্যে শীতের স্থায়িত্ব দীর্ঘতম। কনকনে ঠান্ডা বাতাস এবং ঘন তুষার পাত ছিল একসময় শীতকালের প্রতিদিন। তুষার ঝড়ে কয়েকদিনের জন্য ঢেকে যেত পুরো নগরী। এখন শীতের সেই দাপট অনেকটাই কমে এসেছে।
কানাডায় বাঙালিদের শীতকালীন জীবনে অভ্যস্ত হতে প্রথম যে সমস্যাটিতে পড়তে হয়, সে হচ্ছে লেয়ার ওপর লেয়ার গরম কাপড় পড়া। মাথায় টুপি, হাতে গ্লোভস এবং স্নো বুট। ছোট-বড় সবারই কেন যেন বস্তা বস্তা গরম কাপড় গায়ে চড়ানোর অভ্যাস কিছুতেই হয়ে উঠতে চায় না। শীতের সকাল সন্ধ্যা কেটে যায় এমন ভাবে কিছুটা অভ্যস্ত আর অনভস্ত্যতার মধ্য দিয়েই। তবে বরফ পড়ার সৌন্দর্য সব বাঙালিকেই দেয় মুগ্ধতা।…..

ছবি: লেখক