কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করবিনে খবরদার

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সংঘমিত্রা রায়চৌধুরী দাসগুপ্ত

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

আমাদের বাড়িতে একটা এইচ এম ভি-র রেকর্ড প্লেয়ার ছিল,ছেলেবেলায়।জেঠু কিনে এনেছিলেন। অনেকগুলো লংপ্লেয়িং রেকর্ড ছিলো, চারটে করে গান থাকতো সম্ভবত, একেকপিঠে দুটো করে। আমাদের বাড়িতে যেহেতু কোন বেলা ক’পদে রান্না হবে থেকে শুরু করে কোন গান কখন কেমন ভল্যুমে শোনা হবে অবধি সব ব্যাপারেই বড়কাকু- দাদু অর্থাৎ বাবাদের অকৃতদার বড়কাকাই শেষ সিদ্ধান্তটি নিতেন, ফলে রবিঠাকুর- রজনীকান্ত- দ্বিজেন্দ্রলাল- অতুলপ্রসাদের বাইরে বিশেষ কিছু শোনা- টোনার চল ছিলো না; এসবের বাইরেও যে বাংলা গানের অস্তিত্ব আছে সে সম্বন্ধে, এখন বুঝি, একটা সচেতন উন্নাসিক ডিনায়াল ছিলো। তবু তার মধ্যেও দু-চার পিস সলিল চৌধুরী, সুবীর সেন, তালাত মেহমুদ, সুপ্রভা সরকার ঢুকে পড়ছিলেন আস্তে আস্তে নিষেধ না মেনে, বেলাইনে।আমি তখন হয়তো সবে চার বা পাঁচ, তবু আমার জন্যও ওই ভুরু-কুঁচকানো লিস্টিতে ছিলো একটা আস্ত গান, আমার শৈশবের অ্যান্থেম, আমার প্রাউড পজেশন। রানু মুখোপাধ্যায়ের গলায় বুশি বলের গান।
” কুচকুচে কালো সে জাতে স্প্যানিয়াল,
তুলতুলে গা যেন রেশমী রুমাল
আমি তাকে বুশি বল নাম ধরে ডাকি,
বুশি বল এ শহরে আছে একটাই।”

আমার রোজকার রুটিন ছিলো রাত্তিরে খেয়েদেয়ে একছুট্টে জেঠুর ঘরে চলে যাওয়া। ঘুমোনোর আগে শুনতেই হবে গানটা, রোজ একবার করে।গানের শেষে বুশি বল মারা যাবে, রানুর অস্ফুট ফোঁপানিতে ” বুশিবল এ শহরে ছিল একটাই” আর আমি কেঁদে কেঁদে চোখ লাল করে শুতে যাব, ঘুমিয়ে স্বপ্নও দেখবো বুশিবলকে। একেকদিন কান্নার ঠ্যালায় প্রায় জ্বর এসে যাওয়ার জোগাড় হতো ,তবু পরদিন আবার ওই এক গান শোনা চাই। প্রত্যক্ষ, ট্যাঞ্জিবল এবং একান্ত ব্যক্তিগত বেদনা-বিষাদ এবং ভালোলাগা দু’য়েরই বাহ্যিক প্রকাশে খুব ছোটো থেকেই চূড়ান্ত কৃপণ ছিলাম আমি। প্রতিটা ছোট্ট ছোট্ট আবেগ প্রায় ফিনফিনে বোনচায়নার কাপ-প্লেটের মত যত্ন করে নাড়াচাড়া করতাম, একটু মুচকি হাসি বা বিদ্রূপের ভ্রূভঙ্গিমায় যেন বা চুরচুর হয়ে ভেঙে যাবে সব যে কোনো সময়ে। অথচ মজার কথা হলো গানেই বলুন বা গপ্পের বইয়ে, সামান্য বিষণ্ণতার টোকাতেই এক্কেবারে গঙ্গা-যমুনা গাল বেয়ে। লজ্জার কথা আর কীই বা বলি,সেই ‘বুশিবল’ হয়ে ‘আজ যানে কী জিদ না করো’ অবধি এখনো একইরকম।সিনেমার কথা তো আর নাই বা বললাম। খাজাস্য খাজা সিনেমা, যেটা নিয়ে পরে প্রচুর খিল্লি হবে,সেটি দেখেও এক্কেবারে শুকনো থাকবে রুমাল, এমনটি প্রায় কক্ষনোই হবেনা বোধহয় এ জন্মে আর।

এত ইলকিবিলকিছিলকি যে বকলাম সক্কাল সক্কাল, হঠাৎ স্নান করতে করতে গুনগুনিয়ে বুশিবল গানটা চলে এলো গলায়, আর সঙ্গে সঙ্গে এক পশলা ছেলেবেলা ঝমঝমিয়ে নেমে এসে সারা শরীর ভিজিয়ে দিল। এই অবসরে একজনের অভিমানও ভাঙাতে ইচ্ছে করলো একটুখানি।জনসমক্ষে আমাদের শুধুই চুলোচুলি আর পা টানাটানি, তবু আড়ালে সে মাঝেমাঝেই নানা সোহাগের কথা বলে আমাকে, পাশাপাশি থাকার জন্য থ্যাঙ্ক ইউ ট্যাঙ্ক ইউ বলে; আমার তো সেসব সহজে আসে না মুখে, তাই হেসে, ইয়ার্কি করে উড়িয়ে দিই, গাল ফুলে ওঠে তার।এইসব নাটকীয় বুলি পেটে বোমা মারলেও মুখ দিয়ে বেরোবে না আমার, তাই লিখেলিখেই একটা সত্যি কথা জানাই তোকে। বাইরের ঘরে আমার সারাদিনই জগঝম্প গানবাজনা আর উত্তাল আড্ডা, মাঝেমাঝে ঘেঁয়ো কুকুর এসে বাসনকোসন ওলটপালট করে দিয়ে যায় বটে, বাঁদরের দাঁতখিঁচুনিও জোটে দু-একবার, তবু সে ওই বাইরের ঘর অবধিই, অন্দরমহলে সব কোলাহল বারণ, সেখানে শুধু প্রাণের কথা কানে কানে। তোকে ঘটা করে ‘থ্যাঙ্ক ইউ ফর বিয়িং আ ট্রু ফ্রেন্ড’ বলি বা না বলি, যে অল্প ক’জন ওই অন্দরমহলে আছে, তুই তাদের একজন। চুপ করে থাকবি, শুধু হাত ধরে। ব্যস্, বলে দিলাম, এই প্রথম আর এই শেষ, আর কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করবিনে খবরদার!!

বুঝলি?

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]