কান্না- হাসির দোল-দোলানো

ড: সেলিম জাহান

ড.সেলিম জাহান। আমেরিকার মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অভ্যাগত অধ্যাপক হিসেবে পড়িয়েছেন, পড়িয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কাজ করেছেন জাতিসংঘেও। লেখাপড়ার বিষয় অর্থনীতি হলেও লেখালেখি, আর তাঁর চিন্তার দিগন্ত একেবারেই ভিন্ন এক পৃথিবীর গল্প। প্রাণের বাংলার জন্য এবার সেই ভিন্ন পৃথিবীর গল্প ধারাবাহিক ভাবে লিখবেন তিনি। শোনাবেন পাঠকদের নিউইয়র্কের একটি দ্বীপে তার বসবাসের স্মৃতি।

রুজভেল্ট দ্বীপের বারান্দায় দুলুনী চেয়ারে বসে চিঠিটা হাতে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকলাম আমি – অনেকটা আনমনা ভাবে। প্রায় দশ বছর আগে সহকর্মী ছিলো জার্মান তরুনীটি। তারপর চলে গেছে অন্য কর্মক্ষেত্রে। সম্প্রতি দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে বার্লিনের দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থদের এক হাসপাতালে আছে। সেও আজ কয়েকবছর হয়ে গেলো। পত্রটিতে মাত্র তিনটে লাইন – ‘তোমার আগে ও পরে অনেকের অধীনে কাজ করেছি। কিন্তু তোমার হাসির মতো সংক্রামক হাসি আর কোন উপরওয়ালার কাছ থেকে পাই নি। বড় শুনতে ইচ্ছে করে।’ আর কিছু নেই চিঠিটিতে।

আমার উচ্চ হাসির সংক্রমন এখনও অব্যাহত আছে আমার বর্তমান সহকর্মীদের মাঝে। বিভিন্ন সভায়, সাক্ষাতে, অনুষ্ঠানে আমার হাসি ছড়িয়ে পড়ে তাদের মুখেও। অনেক উত্তপ্ত মূহুর্তকে শান্ত করতে, অনেক জটিল সময়কে উতরে যেতে, অনেক সংকট নিরসনে সে হাসি সাহায্য করেছে। চেনা-জানা বহু মানুষের ব্যক্তিগত হতাশার সময়ে, নানান বিষয়ে আশ্বস্ত হওয়ার ব্যাপারে এবং বহু দু:খের সময়ে এ হাসি তাদের এক ধরনের অনুপানের কাজ করেছে।প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে একটি মেয়ে এ হাসি শুনে অবাক হয়েছিলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের অর্থনীতি বিভাগের সামনের বারান্দায় জটলা করে আড্ডা হচ্ছিলো। একদিকে মেয়েদের, অন্যদিকে ছেলেদের। কোন এক বন্ধুর এক রসিকতায় চিরাচরিত নিয়মেই আমি জোরে হেসে উঠেছিলাম। পরে জনান্তিকে শুনতে পেয়েছিলাম যে অন্য জটলার মাঝ থেকে বেনু সচকিত হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলো, ‘এত জোরে কে হাসে’? আমাদের বন্ধু রাকা বলেছিল, ‘কে আবার? সেলিম’। বেনু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলো, ‘ও এত জোরে হাসতে পারে’?

পরে বহুবার এ গল্পটি করেছে বেনু নানান জনের কাছে, কন্যাদের জানিয়েছে, বলেছে আমাকেও। এ গল্প করার সময়ে ওর চোখে একটা নরম ছায়া নামতো, লাজুক হাসি থাকতো ঠোঁটে, এবং একটা অদ্ভুত মায়া ছড়িয়ে পড়তো ওর সারা মুখে। আমার উচ্চহাসি ভারী পছন্দের ছিলো ওর।পরে অবশ্য নানান সময়ে আমি জোরে হেসে উঠতেই ওকে বলতে হয়েছে আমাকে, ‘এই, আস্তে, আস্তে’। এ কথাটা ওকে বলতে হতো কখনও কখনও ভব্যতার কারনে, কখনো বা পাশের ঘরে নিদ্রারত মা-বাবার ঘুম না ভাঙ্গিয়ে দেয়ার জন্য, কিন্তু বেশীর ভাগ সময়ে অন্য ঘরে আমাদের দু’শিশুকন্যার জন্য।

এই দ্বীপে আমাদের রাতে গল্প করতে করতে আমি জোরে হেসে উঠলেই আমাদের কন্যাদ্বয় তাদের ছোট্ট বালিশ দুটো নিয়ে গুটি গুটি পায়ে আমাদের খাটের পাশে এসে দাঁড়াতো। তারপর রিনরিনে গলায় জিজ্ঞেস করতো, ‘তোমরা হাসছো কেন?’ কোন উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করেই তারা উঠে পড়ে আমাদের দু’জনের মাঝখানে তাদের ছোট্ট বালিশ নিয়ে ঢুকে পড়তো। এই কয়েক বছর আগেও যখন তারা অনেক বড়, তখনও এটা তারা করেছে। তখন প্রশ্নটা একটু বদলেছে, ‘তোমরা কি নিয়ে এতো হাসাহাসি করো’? এবং তারপরই অভ্রান্ত বিছানা-আরোহন’।

আমার এই হাসির জন্য কনিষ্ঠা কন্যার সদা প্রশ্ন, ‘হাসো কেনো?’ কিংবা আমার এক বন্ধুর প্রায়শই প্রশ্ন, ‘এ লোকটা হাসে কেনো? যা বলি তাতেই হাসে।’ এক সহকর্মীর মুগ্ধ এবং সপ্রশ্ন দৃষ্টিও তো চোখে পড়েছে বিভিন্ন সময়ে যখন আমার হাসি উচ্চকিত হয়ে ওঠে।

কান্না- হাসি পৃথিবীর মানুষের আবেগ প্রকাশের সনাতন মাধ্যম। কান্না হচ্ছে দু:খ, বেদনা আর আর্তির ভাষা সব জায়গায়। হাসি আনন্দের, খুশী আর পরিতৃপ্তির ভাষা সব জনগোষ্ঠীর মধ্যে। এই কান্না আর হাসি অর্থ এত সার্বজনীন যে পৃথিবীর সব ভাষাভাষী মানুষেরা এর মাধ্যমে অন্তত একে অন্যের আবেগ বুঝতে পারে – তার জন্য কোন ভাষার প্রয়োজন নেই।

ভয় আর শঙ্কার কান্না দেখেছি সংঘর্ষে আর সন্ত্রাসে। অসহায়ত্বের অশ্রু প্রত্যক্ষ করেছি যখন সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে মানুষ নানান জায়গায়। নানান অবস্হায় ভবিষ্যতহীনতার আতংকে আতংকিত হতে দেখেছি কতো নির্যাতিত মেয়েদের – গৃহের অভ্যন্তরে, বাধ্য শ্রমের জায়গায়, মানব-পাচারের চক্রে। ‘বিচারের বানী নিভৃতে কেঁদে ফিরেছে সর্বত্র।’তবে মানুষের সংনম্যতার তো সীমারেখা নেই। ওটা আছে বলেই মানুষ বেঁচে থাকে, স্বপ্ন দেখে, এবং হাসতে পারে। তাই মসুলের রাস্তায় এক জোড়া ছেঁড়া জুতো পেয়ে একটি শিশু তা বুকে জড়িয়ে ধরে হেসে ওঠে। কিংবা শরনার্থী শিবিরে একটি তরুনী আড়চোখে পথচলতি ভাললাগার তরুনটিকে দেখে ফিক করে হেসে উঠে মাথার ওপরের ওড়নার কোনাটি দাঁতে চেপে ধরে লাজুক চোখজোড়া নামায়। অথবা ভূমিকম্পে পুরো ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ীর স্তুপের পাশের দাঁড়িয়ে বুড়ো যখন বুড়ীর হাতটি ধরে হাসে – তখন তাতে থাকে বেঁচে থাকার আনন্দ, দু’জন দু’জনকে দেয়া আশ্বাস আর আবার গড়ে তোলার স্বপ্ন।তবে এটাও তো ঠিক যে কখনো কখনো খুশীতেও মানুষের চোখে জল আসে, আবার কোন কোন হাসিও কান্নার চেয়েও করুন হতে পারে। কিন্তু সব কিছু ছাড়িয়ে, চূড়ান্ত বিচারে, মানুষের জীবনটাতো ‘কান্না-হাসির দোল-দোলানো’ এক জীবনেরই পালা।

লেখক:ভূতপূর্ব পরিচালক

মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং 

দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগ

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী

নিউইয়র্কযুক্তরাষ্ট্র

ছবি: লেখক


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box