কাবেরী নদী তীরে-এক

 

 

শ্রীরাঙ্গানাথস্বামী মন্দিরের সামেনর দিক !

রুকনুজ্জামান খান অঞ্জন

বাস থেকে নেমে শহরটিতে পা রাখার পর শরীরে শিহরণ খেলে গেল। ছিমছাম নিরিবিলি পরিবেশ। কালো পিচ ঢালা পথের দু’ পাশে পুরোনো আমলের বড় বড় শিল-কড়ইয়ের গাছ।সেই পথ ধরে কেউ কেউ চলে যাচ্ছে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে। এক টুপি পড়া ভদ্রলোককে দেখলাম মাঝারি গতিতে বাইক চালিয়ে যাচ্ছেন। কারো ভেতর কোন তাড়াহুড়া নেই। শহরটি যেন একটা কঠিন আভিযাত্যের খোলস থেকে নিজের সৌন্দর্য্য একটু একটু করে উন্মোচন করছে আমার মত এক খেয়ালি ভ্রমণ পিপাসুর সামনে..। এই তাহলে টিপু সুলতানের মাহিসুর !

আমরা বাসস্ট্যান্ডের এক পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। একপলকে দেখে নিলাম শহরের অবয়বটাও। বেশ ঝকঝকে তকতকে। বাসস্ট্যান্ডে তন্ন তন্ন করেও আমি কলার খোসা কিংবা সিগারেটের বোস্টার দেখতে পেলাম না। আমাদের ইতিউতি তাকাতে দেখে তিন ভদ্রলোক সামনে এসে দাঁড়ালো। তারা জানতে চাইলো আমরা কোথায় কোথায় ঘুরতে চাই। বললো, তাদের প্রাইভেটকার আছে, অল্প সময়ে আমাদের ঘুরিয়ে আনতে পারবে।

তখন দুপুর ১২টার কিছু বেশি। আমরা যদি আবার ব্যাঙ্গালোর ফিরে যেতে চাই তাহলে বিকেল ৫টার মধ্যে ঘুরাঘুরি শেষ করতে হবে। হাত সময় আছে মাত্র ৫ ঘন্টা। তারা জানালেন, টিপু সুলতান ফোর্ট, চামুন্ডেশ্বরী মন্দির, মাইসোর প্যালেস, মিনি তাজমহল এবং বৃন্দাবন গার্ডেন এই ৫টি জায়গা ঘুরিয়ে দেখাবেন।এজন্য ১১শ’ রূপী চাইলেন। টাকার অঙ্কটা বেশি না কম বুঝতে পারলাম না। আমরা জানালাম ৫শ’ রূপী দিতে পারি। যদিও জানি এটা নেহায়েৎ কম বলা হলো। তবুও একটু বাজিয়ে দেখতে চাইলাম। তারা চলে গেলেন। আমি হুমায়ূন ভাইকে বললাম, চলেন কিছু খেয়ে নিই। তারপর না হয় গাড়ি ভাড়া করে ঘুরাঘুরি করা যাবে। পাশেই একটা হোটেল দেখে আমরা এগিয়ে গেলাম। এ সময় কালোমতন মাঝারি উচ্চতার শীর্ণকায় আরেক লোক এসে দাঁড়ালেন সামনে। জানালেন, তিনি অটোরিক্সা চালান। আমরা চাইলে তার গাড়িতে ঘুরতে পারি। তবে আমাদের হাতে যে সময় আছে তাতে ৫টি স্পটে যাওয়া সম্ভব হবে না। কারণ টিপু সুলতান ফোর্ট-এর ওখানেই ৬টি স্পট। এরপর মাইসোর প্যালেস দেখে বৃন্দাবন গার্ডেনে ঘুরতে গেলে রাত হয়ে যাবে। বৃন্দাবন গার্ডেন বাদ দিয়ে বাকি স্পটগুলো ঘুরে এখানে বিকেল ৫টায় নামিয়ে দেবেন এজন্য সাড়ে ৫শ’ রূপী চাইলেন তিনি। প্রস্তাবটা লোভনীয় ! ঢাকায় তো মিরপুর থেকে মতিঝিল যেতেই আজকাল ৫শ’ টাকা চেয়ে বসে সিএনজি চালকরা। তবুও মুখের কাঠিন্যটা ধরে রেখে বললাম, ‘নেহি নেহি ভাই, হামলোগ ৫শ’ রূপী দে চাতাহো।’ ..

মন্দিরের ভেতরের অংশ

মাহিসুরে নেমেই ভেবেছিলাম টিপু সুলতান রোড, টিপু সুলতান বিশ্ববিদ্যালয়, টিপু সুলতান গ্র্যান্ড মসজিদ এই টাইপ নানা নিদর্শন দেখতে পাবো। খুব বিস্মিত হলাম যে সে ধরণের কিছুই চোখে পড়লো না ! এদিক-সেদিক তাকাচ্ছি.. চোখে পড়ছে সেন্ট জোসেফ কলেজ এন্ড নার্সিং ইনস্টিটিউট, সেন্ট ফিলোমেনাস কলেজ.. এ ধরণের বৃটিশ কলোনিয়ালের নানা কীর্তি..। মাহিসুরে তাহলে টিপু সুলতান কোথায় ..? আনন্দ বাবু বললেন, মাইসুরু সিটিতে মিনা বাজার, রাজিবনগরের ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে টিপু সুলতানের নামে কিছু ট্রাস্ট-ফ্রাস্ট, মসজিদ, পার্ক আছে।বাট টিপু সুলতানকে পেতে হলে যেতে হবে শ্রীরাঙ্গাপাটনায়..। সেখানেই তার দূর্গ! আমরা সেদিকেই যাচ্ছি..।

আনন্দ বাবু আমাদের গাইড প্লাস অটো চালক।

ঢাকায় যে ধরণের অটো রিক্সা চলে (সিএনজি) এটা তারচেয়েও আরেকটু বড়। দু’ পাশে কোন ছাউনি নেই। আমরা শরীরে খোলা বাতাস লাগিয়ে শ্রীরাঙ্গাপাটনার দিকে যাচ্ছি। মাহিসোর সিটি থেকে প্রায় ১৫ কিমি. দূরে শ্রীরাঙ্গাপাটনা-ই হচ্ছে টিপু সুলতানের রাজ্য। মান্ডা জেলার এই শহরটিতেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে টিপু সুলতানের ঐতিহাসিক সব নিদর্শন।যেতে যেতে এসব বলছেন আনন্দ বাবু আর আমি যেন চোখ বন্ধ করে যেন সব দেখতে পাচ্ছি…!

ব্যাঙ্গালোরের চেয়ে এদিকে গরমটা একটু বেশি অনুভূত হচ্ছে ! শুষ্ক বাতাসে জীব শুকিয়ে যাচ্ছে ! আমাদের দেশে শীতকালে যেমন ঠোঁট শুকিয়ে যায় এমন .. বাট আকাশে মেঘ আছে..। সকালের দিকে বৃষ্টিও হয়েছে.. তারপরও ঠোঁট টানছে কেন ! হুমায়ূন ভাই বললেন, মাহিসুর থেকে আরব সাগর অনেকটা কাছে। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব যতোটা !

মন্দিরের ভেতরে একপাশে শ্রীরাঙ্গাস্বামী

তারপরও বাতাসে জলীয় বাষ্পের অভাবটা টের পাচ্ছি ! অদ্ভুত !

আধা ঘন্টার মধ্যেই আমরা শ্রীরাঙ্গাপাটনায় চলে এলাম! অটো এসে প্রথমেই দাঁড়ালো একটা বিশাল মন্দিরের সামনে ! আনন্দ দা বললেন, নিন, নামুন ! সামনে ওটা জগন্নাথ মন্দির ! ওটা দিয়েই শুরু হোক ..। তখন প্রায় দেড়টা বাজে। আমরা অটোতে জুতা খুলে রেখে মন্দিরে প্রবেশ করলাম!

ইন্টারনেট ঘেটে জানতে পারলাম এই মন্দিরটির নাম শ্রীরাঙ্গানাথস্বামী টেম্পল। এ মন্দির নির্মাণ করেন গঙ্গারাজাদের গভর্নর থিরুমালায়। দক্ষিণী শৈলীতে নির্মিত এই মন্দিরের ভাস্কর্যে ধরা পড়েছে বিষ্ণুর নানা অবতার। মূল বিগ্রহটি শ্রীরঙ্গনাথের। শ্রীরঙ্গনাথ আসলে দেবতা বিষ্ণু। বিষ্ণু এখানে কুনুইএর উপর ভর দিয়ে নিদ্রাভিভূত। শিরদেশে পঞ্চমুখী নাগের ছত্রছায়া। কালো পাথরে তৈরি মূর্তির সামনে দাঁড়ালে ভরসা ও ভয় দুই কেমন যেন আচ্ছন্ন করে ফেলে। মন্দিরের প্রবেশপথের উপরে টাওয়ারটি বিজয়নগর স্থাপত্যের সাথ্যে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

মন্দিরে প্রবেশ পথের উপরে বিশাল স্থাপত্য ভারতের অন্যান্য মন্দিরের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ! ঢুকতেই সামনে চারকোণা অনেকটা বর্গাকৃতি খোলা জায়গা.. উপরে আকাশ.. তারপরই মন্দিরের শুরু। ছাদের বিন্যাসে ছোট ছোট দেব-দেবীর মূর্তি। জ্যামিতিকি বিন্যাসে সারিবদ্ধ খাম একটার পর একটা চলে গেছে মন্দিরের ভেতরের দিকে। খামগুলোতেও ভারতীয় পুরাণের স্থাপত্য নিদর্শন। ইটের মত করে পাথরের খাঁজ কেটে সম্ভবত মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়েছে। একেকটি পাথরের খাঁজ দশ থেকে পনেরটি ইটের সমান হবে। খামগুলোকেও পাথরের মনে হলো। আমরা যতই ভেতরে যাচ্ছি ততই আলো কমে আসছে.. জানালাবিহীন ভেতরটা গুমোট ও অন্ধকারাচ্ছন্ন।সেখানে কয়েক জায়গায় পুজো অর্চনা চলছে। বেশ কয়েকটি হিন্দু পরিবারকে দেখলাম পুজো দিতে।.. ভেতরে ছবি তোলা নিষেধ..। চোখের ভেতর একটি প্রাচীন মন্দিরের অবয়ব ধারণ করে আমরা বেড়িয়ে আসলাম ..।(চলবে)

ছবি: লেখক