কাবেরী নদী তীরে-০২

রুকনুজ্জামান খান অঞ্জন

শ্রীরাঙ্গাপাটনা ! আমার চোখের সামনে টিপু সুলতানের দূর্গ ! কয়েক পা বাড়ালেই সেই দূর্গে প্রবেশ করবো আমি ..। কিন্তু আমি থেমে গেলাম । চোখ ফেরালাম আবার মাহিসুরে ! কয়েকটা প্রশ্ন জাগলো মনে ! টিপু সুলতান কেন মাহিসুর থেকে ১৫ কি.মি. দূরে এই শ্রীরাঙ্গাপাটনাকে বেছে নিয়েছিলেন তার দূর্গ গড়ে তুলতে ? বিষয়টা কি এমন যে শত্রু কৃষ্ণরাজের প্রাসাদের মুখোমুখি তিনি আরেকটি প্রাসাদ তুলতে চাননি। নাকি অন্য কোন কারণ ?প্রশ্ন হচ্ছে-কেন মাহিসুর নয়, কেন শ্রীরাঙ্গাপাটনায় টিপু ?

দশেরা উৎসবে চামুন্ডির মন্দির

তার আগে জেনে নেয়া যাক মাহিসুর সম্পর্কে । ইন্টারনেট ঘেটে যতোটা জানা যায়, ‘ভারতের কর্ণাটকের রাজধানী বেঙ্গালুরু থেকে প্রায় দেড়শো কিলোমিটার দূরে এক অপূর্ব শহর মাইসুর৷ এটিকে কর্ণাটকের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবেও অভিহিত করা হয়। পুরাণ মতে, একসময় এই শহর ছিল মহিষাসুরের রাজধানী ৷ তাকে দেবী দুর্গা চামুণ্ডা রূপধারণ করে বধ করেন ৷ এই ঘটনাকে স্মরণ করে প্রতি বছর এখানে মহাসমারোহে পালন করা হয় ‘দশেরা উৎসব।’ দশেরা মানে ‘বিজয়া দশমী’ ।

শারদীয় দূর্গা পূজা বাংগালী হিন্দু সম্প্রদায়ের বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব । তাই বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গসহ আশপাশের এলাকাতে দূর্গা পূজো হয়। তবে দক্ষিণ ভারতে সেটি পালিত হয় দশেরা উৎসব হিসেবে। বাঙালিরা যখন দুর্গাপূজা পালন করেন, তখন ভারতের কোথাও পালিত হয় দশেরা কোথাও বা নবরাত্রি। আসলে দশেরা হল দেবীপক্ষের দশম দিন বা নবরাত্রির দশম দিন। আবার এই দিনে রাবণের বিনাশ করেন রাম। সে কারণেও ভারতের কোথাও কোথাও দশেরা পালন হয় ‘রাবণ বিনাশ’ হিসেবে। তবে মাহিসুর যেহেতু মাহিশাষুরের রাজধানী ছিলো, সে কারণে সেখানে দশেরা উদযাপন হয় মহিষাসুরমর্দিনীর (দেবী দূর্গার) বিজয়কে স্মরণ করে।

দশেরা উৎসবের মিছিল মাহিসুর রাজপথে

দশেরা উৎসব পালনের বিশেষ রীতি আছে। ইন্টারনেটের তথ্য অবলম্বনে, ‘প্রথমে মাহিসুর রাজবংশের বর্তমান রাজদম্পতি চামুন্ডি মন্দিরে পুজো অর্পণ করেন। উল্লেখ্য, এই মন্দির চামুন্ডি পর্বতে অবস্থিত। এরপরই শহরজুড়ে নানা বর্ণাঢ্য উৎসব উদযাপিত হয়। উৎসবে যোগ দিতে আসা মানুষজন সোনার বিভিন্ন রকমের গয়না পরে আসেন। এছাড়াও প্রচুর রকমের খাবারের বন্দোবস্ত থাকে রাস্তার ধারে। শোভাযাত্রায় হাতির পিঠে চামুণ্ডেশ্বরীর মূর্তি নিয়ে চলা হয়। সোনার মন্তাপাতে নিয়ে যাওয়া হয় দেবীকে। এই মাইসুর দশেরার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল হাতি নিয়ে শোভাযাত্রা। এছাড়াও উট, ঘোড়া নিয়েও রঙবেরঙের শোভাযাত্রা বের হয় এখানে। সঙ্গে থাকে ব্যান্ড। রঙ-বেরঙের আলোয় সাজানো হয় মাইসুর প্যালসকে। শোভাযাত্রার গন্তব্য দেবী চামুন্ডেশ্বরীর মূর্তি নিয়ে এই বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা শেষ হয় বন্নিমন্তাপাতে। এখানে ‘বান’ গাছ বা বটগাছের কাছে এসে থেমে যায় এই শোভাযাত্রা। কথিত আছে এই বটগাছেই অজ্ঞাতবাসের সময়ে অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছিলেন পাণ্ডবরা। মাহিসুরের দশেরার ইতিহাস মাইসুরের ৪০০ বছরের পুরনো এই উৎসবের সূচনার নেপথ্যে রয়েছে এক ঐতিহাসিক কাহিনি। ১৫ শতাব্দীতে বিজয়নগরের রাজারা এই উদযাপন শুরু করেন। মহিষাসুর রাজা থাকাকালীন মাহিসুরে যাঁরাই ঈশ্বরকে পুজো করতেন তাঁদেরই শাস্তি দিতেন মহিষাসুর। তখনই মহিষাসূরের হাত থেকে বাঁচতে সেখানের মানুষ সাহায্য চান দেবী দুর্গার। এরপর দীর্ঘ লড়াইয়ে চামুন্ডি পর্বতে মহিষাসুরের বিনাশ করেন দুর্গা। এরপর থেকেই চামুন্ডি পর্বতে প্রতিষ্ঠিত হয় দুর্গার মন্দির। দশেরার দিন পালিত হয় চামুন্ডেশ্বরি পুজো।
মাহিসুর যেমন কৃষ্ণরাজ-টিপু সুলতানের রাজ্য, তেমনি চামুন্ডিরূপী বাঙালির দেবী দূর্গারও। মাহিসুর শহরেই চামুন্ডি পাহাড়, রাজপ্রসাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বুক ফুলিয়ে। সেই পাহাড়ে চামিুন্ডির মন্দির। বাংলাদেশ থেকে হাজার মাইল দূরে আরব সাগরের তীরে এই মাহিসুরেও কি দূর্দান্ত প্রতাপে জাজ্বল্যমান বাঙালির দেবী দূর্গা ..!

টিপু সুলতানের দূর্গে প্রবেশের আগে আমাদের মাহিসুর প্যালেস বা রাজপ্রসাদের দিকে একটু চোখ রাখা উচিত। কারণ টিপুর ইতিহাসের সঙ্গে এই প্যালেসের যোগসূত্র অত্যন্ত ঘনিষ্ট। এই প্রাসাদের প্রতিটি পাথর জানে, কীভাবে ইংরেজরা টিপুকে দমানোর জন্য কৃষ্ণরাজের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলো।

মাহিসুর প্যালেসের সামনে দশরা উৎসবের মিছমাহিসুর প্যালেসের সামনে দশরা উৎসবের মিছিল

মাহিসুর শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করতে আমাদের ৫০ রূপী দিয়ে টিকেট কাটতে হয়েছে। ঢোকার পর চোখের সামনে রং চকচকে বিশাল প্রাসাদ দেখে মনে হলো এ কোন ইন্দ্রপূরীতে প্রবেশ করলাম.! কী নেই এখানে.. হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া..মণিমুক্তো খচিত মুকট, সোনার সিংহাসন.. সব আছে কেবল রাজা নেই, পেয়াদা নেই.. ।

মাহিসুরে ওদেয়ার রাজবংশের চতুর্থ কৃষ্ণরাজ ওদেয়ার নির্মাণ করেন এই ঐতিহাসিক প্রাসাদটি। টিপু সুলতানের মৃত্যুর পরে, ১৭৯৯ সালে মহীশূরকে রাজধানীতে উন্নিত করেন চতুর্থ কৃষ্ণরাজ। হিন্দু রাজাদের প্রাসাদ হলেও এর উপরে গম্ভুজগুলো মুসলমান স্থাপত্যের কথা মনে করিয়ে দেয়।ইতিহাস বলছে, পঞ্চদশ শতকের গোড়া থেকে এখানে রাজত্ব করত ওদিয়ার রাজবংশ৷ হায়দর আলি এই রাজ্য দখল করেন ১৭৬১ সালে৷ হায়দর আলির ছেলে টিপু সুলতানের রাজত্বকালে ওদিয়ার রাজবংশ ইংরেজদের সাহায্য নিয়ে পুনরায় দখল করে মাহিসুর৷

বিশাল এক উদ্যানের মাঝে নির্মিত এই অট্টালিকাটি পুরটাই পাথর দিয়ে বানানো। ২৪৫ ফুট লম্বা ও ১৫৬ ফুট চওড়া এই প্রাসাদ তিন তলা উঁচু, এতে ১৪৫ ফুট উঁচু একটি পাঁচ তলা মিনার রয়েছে। ধুসর গ্রানাইট ও গাড় গোলাপি মার্বলের গম্বুজ দিয়ে বানানো এই প্রাসাদের বর্হিভাগে বেশ কিছু প্রশারিত খিলানের উপস্থিতি অট্টালিকাটিকে আরো দৃষ্টিনন্দন করে তোলে। বাহারি এই খিলানগুলোর ওপরে একদম মধ্যমা বরাবর রয়েছে দেবি গজলক্ষীর মূর্তী।

প্রাসাদ প্রাঙ্গনে প্রবেশ করার জন্যে তিনটি প্রবেশদ্বার রয়েছে। তাছাড়া, প্রাসাদের ভুগর্ভস্হ ভান্ডার থেকে বেশ কিছু গুপ্ত সুরঙ্গ রয়েছে, একটি দিয়ে শ্রীরাঙ্গাপাটনা (টিপু সুলতানের দূর্গ)যাওয়া যেত, ও আরো অন্যান্য জায়গায় (কোথায় তা জানা যায়নি) যাওয়া যায়। সেগুলি এখন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

প্রাসাদের চত্বর জুড়ে রয়েছে বিশাল বাগান৷ ঢোকার মুখেই ডলস মিউজিয়াম৷ এছাড়াও আছে কল্যাণ বা বিয়ের মণ্ডপ৷ এর নকশা দেখে তাক লেগে যায়৷ এখানে আছে ভারতীয় শিল্পীদের আঁকা নানা ছবি, যার বিষয়বস্ত্ত হল মূলত রাজপরিবারের জীবনযাত্রা৷ আছে লর্ড মাউণ্ট ব্যাটেনের রূপার চেয়ার৷ প্রাসাদের ভিতরে আছে ভুবনেশ্বরী, গায়ত্রী, নবগ্রহ, ত্রিনয়নেশ্বর, বরাহস্বামীর মন্দির৷ দোতলার দরবার হলে বাইজেণ্টাইন মোজেইক মেঝে, বড় বড় ঝাড়লণ্ঠন, মেহগনি কাঠের ছাদ৷ তাতে নানান মূর্তি খোদাই করা৷

মাহিসোর প্যালেসের সোনার সিংহাসন

এখানকার প্রধান আকর্ষণ হলো মণিমাণিক্যখচিত ২৮০ কেজি সোনার রত্ন সিংহাসন৷ বিজয়নগর জয়ের স্মারকরূপে ওদিয়ার রাজা এই সিংহাসন নিয়ে এসেছিলেন৷ যদিও কারও কারও মতে আওরঙ্গজেব এটি উপহার দিয়েছিলেন ওদিয়ার রাজাকে৷

এর পাশের অম্বা ভিলা বা প্রাইভেট দরবার হলটিও দেখার মতো। অম্বা ভিলায় মূলত রাজা তাঁর মন্ত্রী ও পাইক-পেয়াদাদের সঙ্গে বৈঠক করতেন।এতে রয়েছে রুপার ঝকঝকে দরজা, তাতে বিষ্ণুর দশাবতারের চিত্র৷ দুই ঘরের মাঝখানে মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত নানারকম কাজ রয়েছে৷ পেন্টিং এবং কার্ভিং-এ সারা পৃথিবীর সুন্দর জিনিসের সমাহার ঘটেছে এখানে৷ ইংল্যান্ড থেকে আনা মেঝের টাইল্স, ইতালির মার্বেল, ফ্রান্সের ম্যুরাল নজর কাড়তে বাধ্য৷

এছাড়াও এখানে আছে সোনার মুকুট, টিপু সুলতান ও হায়দর আলির তরবারি, শিবাজির বাঘনখ, হাতির দাঁতের কারুকার্যময় জিনিস৷ প্রাসাদের মধ্যে জগনমোহন প্রাসাদ বা আর্ট গ্যালারিটিও দেখার মতো৷ সেরামিক, চন্দন কাঠ, আইভরি ও পাথরের অ্যাণ্টিক আসবাব ও বাদ্যযন্ত্র আছে এখানে৷ তবে এই সবকিছুই আপনাকে চোখের ফ্রেমে ধরে রাখতে হবে, কারণ প্রসাদের ভেতরে ছবি তোলা বারণ।

মাহিসুর প্যালেস বা রাজপ্রাসাদের আভিজাত্য এবং বিশালত্বের সঙ্গে তুলনা চলে এমন প্রাসাদ কর্ণাটক কেন, ভারতেও নেই বললেই চলে৷ জানা গেছে, বছরে প্রায় ৬০ লাখ পর্যটকের পা পড়ে এই স্থানে। মাহিসুর প্যালেসের দর্শক সংখ্যা তাজমহলের পরেই। পুরো রাজপ্রাসাদটি এত বিশাল জায়গা নিয়ে বিস্তৃত যে শুধুমাত্র এর বাইরের অংশটুকু ঘুরে ঘুরে দেখতে আমাদের দুই ঘন্টা সময় লেগে গেলো।

রাজপ্রাসাদটি যখন প্রথম তৈরি হয়, তখন ছিল কাঠের৷ এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ফলে এটি পুড়ে ছাই হয়ে যায়৷ ১৯১২ সালে আবার নতুন করে তৈরি হয় প্রাসাদটি৷ পুরো ছাই হওয়া রাজপ্রাসাদ মাথা উঁচু করে এই একবিংশ শতাব্দীতে এখনো তার আভিজাত্য প্রকাশ করছে স্বমহিমায় .. আর শ্রীরাঙ্গাপাটনায় টিপু সুলতানের দূর্গ মাটি হয়ে মিশে যাচ্ছে মাটির সঙ্গে ..! ………..?

ছবি: লেখক ও গুগল