কালান্তরের ধ্বনি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সাগুফতা শারমীন তানিয়া, লেখক

এক.

এ আমার ব্যক্তিগত রোগভোগের গল্প, রোগশয্যার চিন্তাপ্রবাহ থেকে নেয়া, তাই আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। কালের যাত্রার আল্ট্রাসনিক ধ্বনির কথা পড়েছিলাম ‘শেষের কবিতা’তে, আমাদের চেনা কাল একটিমাত্র বছরে যেভাবে অন্তর্হিত হলো আর নতুন কাল এলো, যাকে আমরা ‘নিউ নর্মাল’ ডাকছি, সেই বদল নিয়ে খানিকটা কথা বলবো বলে এই লেখা।

জানুয়ারি ২০২১এর ২০ তারিখে লিখে রেখেছি—‘‘ইউকেতে সরকারী হিসেবে প্যান্ডেমিকের শুরু থেকে এপর্যন্ত মারা গেছেন ৯৩, ২৯০ জন, গত সাত দিনেই মারা গেছেন ৮,৫২৩ জন। এই হিসেব কেবল তাদেরকে গোনায় ধরেছে, যারা কোভিড পজিটিভ হবার ২৮ দিনের ভেতর মৃত্যুবরণ করেছেন। অন্য এক হিসেব মোতাবেক ডেথ সার্টিফিকেটে কোভিডকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা হয়েছে এমন মানুষের সংখ্যা ১০১,৮৮০।  গত ২৪ ঘন্টায় কোভিডে মারা গেছেন ১,৮২০ জন মানুষ। পাড়ায় পাড়ায় অনলাইন গ্রুপগুলোতে পুলিশ অনুনয় করছেন মানুষকে নিয়ম মেনে চলতে, কেননা হাসপাতালে অক্সিজেন এবং অন্যান্য সমস্ত চিকিৎসা-সুবিধা থাকবার পরও চোখের সামনে মানুষ মরছে।”

সংখ্যাগুলো কেন লিখে রাখলাম? আমি তো সেই জলচরের মতো জীবন কাটাতে চেয়েছি যে সাঁতরাবে কাদাজলে, তবু নাক তুলে রাখবে নির্মল উজ্জ্বল আকাশের দিকে। নিরাবেগ কিংবা নিরুদ্বেগ হয়ে বাঁচবার জন্য নয়, অজস্র মৃত্যু পেরিয়ে যেতে যেতে টানেলের শেষে আলোর নিশানাটুকুতে চোখ না রাখলে কাজ করবার মন জীবিত থাকে না বলে। মৃত্যুর খবর এসেছে প্রতিদিন, গত এক বছরে। কাছের, দূরের, এ-গলির, পরের গলির, পুরনো নিকটজনের, সদ্যপরিচিতের। প্রতিদিন অবিশ্বাস্য সংখ্যার মৃত্যুকে বিশ্বাস করাই এই প্যান্ডেমিকের ‘নিউ নরমাল’। বিশ্বাস করে চলেছি—এটাই এই নশ্বর জীবনের মানে, সাংখ্যমান খুব বেড়ে গেলে কেমন করে যেন মানুষের মৃত্যু শুধুই সংখ্যায় পরিণত হয়ে যায়।

দুই.

২০২০-এর কথা বলি।প্রথমদিকে অবিশ্বাস্য লেগেছিলো পৃথিবীময় মানুষের হাটবাজার-কলকারখানা-লেনাদেনার ঝাপ বন্ধ করে দেবার এই ঘটনাটিকে, ভয়ের চেয়ে বড় হয়ে গেছিল বিস্ময়। স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটি ‘এরশাদ-ভ্যাকেশন’-এর আগে আমি এতদিন কখনো বন্ধ হতে দেখিনি, আর সেটা তো ছিলো আমাদের একটিমাত্র দেশে…এ যে সারা পৃথিবীতে, একনায়ক একটি জীবাণু।

বিবর্তনের ভিতর দিয়ে যারা বেঁচে আছে, তারা দ্রুত বিবর্তিত হয়ে বেঁচে থাকবার তরিকা খুঁজবেই। অতএব আমিও এই পরিবর্তনের সঙ্গে বিবর্তিত হলাম, ঘরে থেকে অখন্ড অবসরে পড়ালেখা করবো, কাজগুলো শেষ করবো, খুবসে ট্রান্সলেশন করবো ইত্যাদি সংকল্প করলাম। আমার বন্ধ দরজার বাইরে পৃথিবী কাঁপতে থাকুক, আমি তো বেঁচে আছি। টিভি বন্ধ করে, কাগজ মুড়ে রেখে, কেট উইনস্লেটের ঐ আতংকসংক্রামী মুভিটা না দেখে… আমি খুব বেঁচে আছি। ঐ তো আমার গলির বুড়ো টমাস আর তার আদরণীয়া স্ত্রী বেঁচে আছে- মুদি দোকানে যাচ্ছে- স্টেশন রোড থেকে খবরের কাগজ হাতে করে ফিরছে। অনলাইনে সদাই কিনলে দোরগোড়ায় এসে পৌঁছে যাচ্ছে। কত ব্যাকটিরিয়া স্পোর হয়ে বছরের পর বছর ঘাপটি মেরে বেঁচে থাকি, আমিও থাকবো তেমন।

ভয় আর অবিশ্বাসের ভেতর জেগে উঠছিলো অন্যরকম সব নীল নীল ব্যাপার। নীল আকাশ ফুঁড়ে দেখা দিচ্ছিলো এভারেস্ট আর কাঞ্চনজঙ্ঘার উত্তুঙ্গ শিখর—বহুকাল তারা চাপা পড়ে ছিলো কারখানার কুয়াশায়। লোকে হাঁটতে বের হয়ে দূর থেকে হেঁকে একে অন্যের খোঁজ নিতে শুরু করছিলো। বুড়ো টমাসের দরজায় সহৃদয় যুবক এসে কড়া নাড়ছিলো, অনাহুতরা বহুকাল এমন করে কড়া নাড়ে না, জিজ্ঞেস করে না—আমি বাজারে যাচ্ছি, তোমায় কিছু এনে দেব?” পাখির আওয়াজে কান পাতা দায় হলো সেই বসন্তে, পথের বাতাসে জীবাশ্ম-জ্বালানি পুড়বার গন্ধের বদলে পথের ধারের প্রতিটা ঝোপ পার হবার সময় আলা

দা আলাদা করে ঐসব ঝোপের সুগন্ধ পাওয়া গেলো। গরমকালে ন্যাশনাল ট্রাস্টের বাগানে বাগানে অজস্র ফুল-ফলের গাছের ল্যান্ডস্কেপ দেখতে যাওয়াটা সেবার আর হলো না, মালিরাই নেই। গাছগুলো অঙ্কুরেই মরলো। বাগান বড় আকুলতায় দর্শনার্থী চায়। ‘বদল যায়ে আগার মালি, চমন হোতা নহি খালি’ কথাটা ঐসব চমন-এর জন্য সত্য নয়।

তিন.

এই অবকাশে কত রকম মানুষ দেখলাম। যখন মানা, তখনো এবাড়ি-ওবাড়ি যাতায়াত করা মানুষ। বাড়িতে বসে বসে বিরক্ত লাগছে বলে পথের নেড়ি বেড়ালকে এয়ারগান দিয়ে কানা করে দেয়া মানুষ। শেয়ালছানাকে কিচেন-নাইফে পুঁচিয়ে কাটা মানুষ। অথর্ব বুড়োবুড়ির ঘরে কড়া নেড়ে ‘কিছু খাবার দিয়ে গেলাম’ বলে অপেক্ষমান ডাকাত মানুষ। অনলাইনে চুরি করা মানুষ। সন্ধ্যার পথে রাহাজানি করা মানুষ। অর্ধাহারে-অনাহারে অতিষ্ট শিশুর অভিভাবক মানুষ। দরিদ্রকে হতদরিদ্র আর ধনীকে আরো ধনী হতে দেখা নিরুপায় মানুষ। কোভিডের করালগ্রাসকে তুচ্ছ করে কৃষিবিলের বিপক্ষে পথে নামা মানুষ। কোভিডের ভয়কে তুড়ি মেরে নারীহন্তার বিপক্ষে পুলিশের অপারঙ্গমতার বিপক্ষে বিক্ষোভ করা মানুষ।

কোভিডের সময়টায় আমি শুধু নীল আকাশ আর স্বচ্ছ বাতাস দেখিনি, বারবার দেখেছি মানুষের সামান্যতম বিচার-বিবেচনার অভাব, সহৃদয় সহানুভূতির অভাব। অবসর নেই বলে অবি

রাম ঘ্যানঘ্যান করা মানুষ যে অবসর পেলে এমন দানব হয়ে ওঠে, তাই বা কে জানতো। দূরে কতদূরে আমার দেশে পোষাকশ্রমিকদের নিয়ে চলেছে খেলা, তারা একবার পথে নেমে মাইলকে মাইল পথ পায়ে হেঁটে পাড়ি দিয়েছে, আরেকবার বন্ধ কারখানা ছেড়ে বাড়ি চলে গেছে, দানব ছাড়া ওরকম মানবঘুঁটি আর কে চালতে পারে!

চার.

লকডাউন শিথিল করে দেবার এক পর্যায়ে গ্রীষ্মের একটি দিনে আমরা পার্কে গেলাম। সবুজের সমারোহ আর মেঘমুক্ত আকাশ। রডোডেনড্রনের বড় বড় কালচে ঝোপঝাড়ে একেবারে রঙের অর্কেস্ট্রা শুরু হয়ে গেছে তখন। লাল-গোলাপি-শাদা-সোনালি-ফিকে হলদে-জারুল বেগুনি। সারাবেলা সেদিন বসে রইলাম গাছের তলায়। আমার কয়েকহাত দূরে বসে রইলো এনএইচএসের কর্মী আরেক বন্ধু। ফিরে আসবার পরে টের পেলাম, নাকে গন্ধ নেই, জিভের স্বাদকোরকেরা কেউ যেন বেঁচেই নেই। শরীর এমন কাঁপছে, যে শুয়ে শুয়ে মনে হচ্ছে আমি যেন মোজেজের আমলের প্রাচীন মিশরের সেই দরজাগুলো— যাতে ভেড়ার রক্তে ক্রস কাটা আছে বলে মারী-বায়ূ দুদ্দাড়বেগে কাঁপিয়ে দিতে দিতে ফিরে যাচ্ছে। ফিরে যাচ্ছে নাকি হাট করে খুলে দিয়ে ঢুকে পড়ছে বাতাস, আমার এই অন্ত্রময় দেহগহ্বরকে এন্ডোস্কপিক চোখে দেখতে দেখতে কোথায় চলেছে সেই বাতাস। আর শ্বাসকষ্ট। এবারও আমার মাথায় ঘুরছে আরেকটা দৃশ্য, সেটা আর্থার কোনান ডয়েলের ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার অভ দ্য এঞ্জিনিয়ারস থাম্ব’এর দৃশ্য, দেয়াল এগিয়ে আসছে, দেয়াল যখন আমায় স্পর্শ করবে তখন নিশ্চিত মৃত্যু। মরে যাব এই কথাটা এতবার ইসলামিয়াত ক্লাসে শুনবার পরেও কেন আজো আত্মস্থ করতে পারলাম না, কেন বিস্ময় জাগে?

শুয়ে পড়লে শ্বাসকষ্ট বাড়ে, বসে থাকবার জো নেই, হাসপাতাল খালি নেই, অ্যাম্বুলেন্স ডাকলেও পাওয়া যায় না। আমার হাতে আমার শেষপারানির কড়ি অ্যাস্থমা পাম্প, বাজারে পাম্প ফুরিয়েছে বলে আমাদেরই এক সহৃদয় বন্ধু তার ছেলের একস্ট্রা পাম্প আমাকে দিয়ে গেছে। মনে আছে হৃদরোগী বন্ধুর শ্যামল সজল মুখ, খাবার রান্না করে লন্ডনের আরেক প্রান্ত থেকে গাড়ি চালিয়ে এসে দিয়ে গেছে। ঘোরের ভেতরেও ঈশ্বরের সঙ্গে রফা করে চলেছি—আমাকে দিচ্ছো দাও, তার বদলে আমার প্রিয়জনদের নিষ্কৃতি দাও! তাদের স্বাস্থ্য টুকটুকে রেখ। তাদের পৃথিবীর শোভা দেখতে বাঁচিয়ে রেখ।” রফা করতে পারছি মানেই হচ্ছে, আমি এখনো ‘ইয়া নফসি’ দশায় আসিনি, তাই না? যে নিরুপায় দশা এলে নিজেকে ছাড়া আর কিছুকে রক্ষা করার চিন্তা মাথায় খেলে না, সে অবস্থায় তাহলে আসিনি?

কোভিডের সীমানাগুলো বড় ঝাপসা ছিলো, কখন থেকে ইনকিউবেশন পিরিয়ড আর কখন এসে পূর্ণাঙ্গ নিষ্কৃতি তা তো বলতে পারি না। জ্বর সারে কাঁপুনি যায় না, কাঁপুনি কমে কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকলেই কে যেন দুপুরবেলার ঢেলা-মারা ভূতের মতন হাতে ধাক্কা দেয় গায়ে—পড়ে যাবার উপক্রম হয়, ধাক্কা কমে তবু গায়ের ব্যথা মরে না, সুয়োরাণীর মতো সারা গায়ে সেই হাড়মরমরি ব্যারাম। দম নিতে গেলে বুকে-পিঠে সেই ব্যথা, পাশ ফিরে শুতে গেলে ব্যথা দেখে একটা সন্দেহ হলো। অনিদ্রা আর শ্বাসকষ্ট বেড়েই চলেছে। পরে ধরা পড়লো নিমোনিয়া।কোভিডের পরে যা যা হয়, তার ভেতর একটি এই ফুসফুসের ব্যামো। হাসপাতালে আমার পাশেই এক চীনা রোগিনী, সে বিরক্ত হয়ে বলে—এই তুমি আরেকটু সরে বসতে পারছ না? সবাইকে ভোগাতে চাও নাকি?”

পাঁচ.

ডিসেম্বরের শেষদিনটিতে দেখলাম সবাই নতুন বছরকে স্বাগত জানাচ্ছে, আর কোভিডকে বিদায়। কিন্তু জানুয়ারির শুরুতেই ২০২১ দেখিয়ে দিলো, অতিমারী ঘটায় যে জীবাণু— তার হাতঘড়ি নেই কম্পাস নেই ক্যালেন্ডার নেই। জানুয়ারির স্বনামসখা দেবতা জানুস, তার দু’খানা মুখ, একটি মুখ চেয়ে আছে অতীতের দিকে, আরেকটি মুখ ভবিষ্যতের দিকে। দেখা গেলো, অতীতচারী যা দেখছে, ভবিষ্যতদ্রষ্টাও সেই অতীতের ব্যত্যয় দেখছে না। ইউকে ঝমঝম করে আরেকটি লকডাউনে ঢুকে পড়লো, ক্রিসমাসের সামান্য ক’টা দিন উৎসব করবার তাৎক্ষণিক খেসারত দিলো আরো পঁয়ত্রিশ হাজার মানুষ।

আমার প্রাথমিক বিস্ময় কেটে গেছে, এখন রয়ে গেছে পলিসিমেকার কি রাষ্ট্রপ্রধানদের প্রতি বিরক্তি। খবরে বিমর্ষ চোখ বুলিয়ে দেখি অ্যান্টার্কটিকার ওয়েডেল সীলমাছের গল্প, জলপৃষ্ঠের চারশো মিটার তলায় গিয়ে ঘন্টাব্যাপি ডাইভ মেরে বেড়াচ্ছে—অতল জলের অক্সিজেনবিহীন পরিবেশে যেখানে হাইপক্সিয়া হয়ে ডাইভাররা মরবে, সেখানে সে মহানন্দে চরে বেড়ায়, তার পেশীর মায়োগ্লোবিন অক্সিজেন জমিয়ে রাখে, অক্সিজেন ছাড়াও সে বিপাকক্রিয়া চালাতে পারে, তার যকৃত-হৃদপিন্ড-মস্তিষ্ক সবই বিবর্তনের বরপুত্র…যা আমরা নই। কোভিডরোগী অক্সিজেনের অভাবে খাবি খেতে খেতে মরতে পারে, সামুদ্রিক স্তন্যপায়ীর মতো অক্সিজেনের অভাবে বাঁচবার কোনো প্রক্রিয়াই মানবদেহে কাজ করে না বলে। আমাদের শরীর তো জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বাবুরাম সাপুড়ের সাপ, শিং নেই বিষদাঁত নেই আঁশ নেই বর্ম নেই প্রবল পরাক্রম পেশী নেই…শুধু আছে প্রকান্ড এক মস্তিষ্ক যে জলে ভাসতে পারে না, এত অল্প নিয়ে এত আস্ফালন আমাদের?

জীবনে আমার নতুন সমস্যা যোগ হয়েছে, কিছু মনে থাকে না। ক’দিন আগে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রিয়জনের নাম মনে করতে পারিনি, এমনকি আদ্যক্ষর মনে রেখে শব্দ মনে করার উপায়টাও কাজ করছে না। একদিন এক আপার নাম মনে করতে পারছিলাম না, কিন্তু মনে আছে আপার বরের মোচ আছে, অনেকক্ষণ মোচ ভেবে মনে পড়লো…মোচাধিকারীর নাম ইরাজ, ইরাজ ভাইয়ের বউয়ের নাম যেন কী…ফেসবুক ঘাঁটতে হবে! অন্তরালের আমি বিস্মিত, বেদনাস্তব্ধ। স্মরণশক্তির সাঙ্ঘাতিক বড়াই ছিলো আমার, এক বেলায় ৬৪ জেলার নাম মুখস্ত করে ফেলতাম। রাস্তার দু’ধারের দোকানের নাম যথাক্রমে বলতে পারতাম। ২৯ পর্যন্ত নামতা জানতাম। এ কী হলো, এখন চোখের সামনে দেখেও জিনিসের নাম মনে করতে পারি না, মানুষের নাম তো দূরে থাক। কিন্তু ব্যথার কথা, নির্যাতনের কথা প্রায় সবই মনে আছে। অক্ষরে অক্ষরে। চেঁচাই কালারকোডে—ওরে আমার সবুজটা দিয়ে যা!” ছেলে এসে জিজ্ঞেস করে—চশমা নাকি টুপি? স্কোয়াশ নাকি ব্রকলি?”

ছয়.

সব যে অত কালো কালো তা তো নয়। এখন কত কথা চলছে, বাড়ি থেকে যেসব কাজ হতে পারে সেসব কাজে দফতরে হাজিরা দিয়ে লাভ কী? ইস্কুলে পাঁচদিনই বা কেন যেতে হবে, দু’দিন বাড়িতে থেকে পড়লে ক্ষতি কী? বরং বাচ্চারা অনলাইনে অন্য বাচ্চাকে বিরক্ত কম করে, একজোট হয়ে শিক্ষককে নাস্তানাবুদ কম করে। যত যাতায়াত কমবে, তত ফসিল ফুয়েল কম জ্বলবে। বন বাঁচবে, পাহাড় বাঁচবে। মনে মনে জিজ্ঞেস করি, জানুস তোমার দ্বিতীয় মুখ কোন ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে আছে? ভবিষ্যতের হাত কি হন্তার, নাকি অভয়মুদ্রার? রাতের ল্যাম্পের আলোয় আমার চোখে-মুখে পাখির পায়ের চিহ্নের মতো ক্লান্তির দাগ। অনিদ্রা সারতে আর কতদিন লাগবে? আবার সবকিছু ঠিকঠাক মনে পড়বে তো? বন্ধুরা ঠাট্টা করে বলবে তো— “দেখি, লগটেবিল মুখস্ত বল!”

ঘুম থেকে উঠে দেখি ঝুরঝুর করে ফেব্রুয়ারির বরফ পড়ছে, কিচেনের জানালায় উঁকি দিতে এসেছিলাম, দেখি তুষারপাতের অনন্ত নিরালায় এক ডালে দুইপা রেখে ট্রাপিজের খেলার মতন নিজেকে শূন্যে ভাসিয়ে দিয়ে একটা ধূসর কাঠবেড়ালি আজকের-পরে-আর-দিন-নেই ভঙ্গিতে সামনের দুই থাবা দিয়ে ধরে বাদাম আর সুয়েট-পেলেট খাচ্ছে বার্ডফিডার থেকে। তার বুকটা তুলতুলে শাদা, ইয়া মোটা ফোলানো লেজ। সে বাদাম খেতে নেমেছে, আশপাশের নিচু ডালগুলোতে ব্লু-টিট চারকোল-টিটদের নিয়মিত ঝাঁকটা অভিবাদনের ভঙ্গিতে বসে আছে, অপেক্ষমান। বার্ডফিডারের রেগুলার খদ্দের রেডব্রেস্ট রবিনও এসেছে, সে অবশ্য ঝাঁকের পাখি না, সে আসে আধো-প্রেমের বচনের মতন, একা, আরক্ত, নিঃশব্দ,বরফের ওপর পাখির পায়ের খোঁচা খোঁচা ছাপ দেখলে চট করে কী আর বোঝা যায়, কার বুক অত রক্তিম? এই যে কাঠবেড়ালি খাচ্ছে আর বাকি পাখিরা তাদের পালা আসবার অপেক্ষায় আছে, প্রকৃতিতে এই একটা অপূর্ব ভদ্রতা আছে, এরা একে অন্যকে সু্যোগ দেয়, একে অন্যের সাথে বিজড়িত এরা, একে অন্যের জন্য মরে গিয়েও কিছু না কিছু দিয়ে যায়। যেসব উজানিয়া ঝর্ণায় এসে স্যামন মাছ মিলিত হয় এবং মৃত্যুবরণ করে, সেইসব ঝর্ণার দু’ধারের বনভূমি মৃত স্যামনের মেদ-মাংস-মজ্জা-অস্থি শুষে নিয়ে অত্যন্ত পুষ্ট হয়ে ওঠে। আর, প্রকৃতি সুন্দর, প্রকৃতি সর্বজিত। কোভিড-পরবর্তী পৃথিবীতে আমরাও কি বাকি জীবজগতের সঙ্গে আমাদের পুরানো অন্বয় খুঁজে পাব? সুন্দরের যোগ্য হয়ে উঠবো?

ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box