কাসভা’য় কিছুক্ষণ…মারাকেশ-৩

নিজামুল হক বিপুল

নিজামুল হক বিপুল

এটলাস পর্বত চূড়া থেকে ফটোসেশনের কাজ শেষে আবারও গাড়িতে চেপে বসলাম। এবার আস্তে আস্তে গাড়ি নিচের দিকে নামতে শুরু করেছে। উদ্দেশ্য জাগুরা। ঘণ্টা খানেকের মধ্যে আমরা একেবারেই সমতলে। পিচ ঢালা সড়ক সাঁ সাঁ শব্দে ছুটে চলছে গাড়ি। দুই পাশে মরুভূমি। দূরে দেখা যাচ্ছে ছোট-বড় মরুপাহাড়। এরই মধ্যে চালক গাড়ি থামালেন এক শহরের একটি ক্যাফের পাশে। ছোট্ট এই শহরের নাম ‘ওয়েইজড’। গাড়ির দরজা খুলতেই নিজের নাম মোহাম্মদ বলেই স্বাগত জানালেন আমাদেরকে। নিজেকে সরকার অনুমোদিত পর্যটক গাইড হিসেবে পরিচয় দিয়ে আমাদেরকে নিয়ে গেলেন শহর লাগোয়া একটি গ্রামে। নাম ‘কাসভা’।
মরক্কোয় গ্রামকে বলা হয় ‘কাসভা’। মজার বিষয় হচ্ছে এটি আমাদের দেশের মত কোন গ্রাম নয়। একেবারেই ভিন্ন ধাচের গ্রাম। চারপাশ ঘেরা বিশাল উঁচু প্রাচীরের মত। দূর থেকে মনে হবে কোন দর্শনীয় স্থান বা পুরাকীর্তি। কিন্তু কাছে যাবার পর সেই ধারণায় ছন্দপতন ঘটবে ভিন দেশী পর্যটকদের।
আমাদের গাইড মোহাম্মদ ধীরে ধীরে আমাদেরকে কাসভা’র ভিতর দিকে নিয়ে যেতে লাগলেন। কাছে যেতেই দেখলাম ছোট ছোট দরজা-জানালা। ছোট ছোট ঘর। সরু এক লাইনে ঢুকলে ডানে-বায়ে দুই পাশে এসব ঘরের অবস্থান। তাতেই বসবাস নারী-পুরুষ-শিশুর। আরও মজার তথ্য হচ্ছে, এসব ঘরের ভিতর যেন একেবারেই অন্ধকার। হিসাব মেলাতে পারি না কিভাবে মানুষ এসব ঘরে বসবাস করে। এসব ঘরের সামনের দিকে রয়েছে পর্যটকদের জন্য খাবারের দোকান। আছে স্যুভেনির এর দোকানও।
আরও আশ্চর্য হই যখন গাইড মোহম্মদ বলেন, এই কাসভা’র বৈশিষ্ঠ্য হচ্ছে এখানে এক সঙ্গে মুসলিম, ইহুদী আর খৃস্টানদের বসবাস। শত শত বছর ধরে তারা এক সঙ্গে বসবাস করছেন সব ভেদাভেদ ভুলে। কখনও কোন বিভেদের ঘটনা ঘটেনি তাদের মধ্যে। মোহাম্মদ এসব বাসার প্রবেশদ্বারে কিছু আল্পনা জাতীয় চিহ্ন দেখিয়ে বললে, এই চিহ্ন দেখে আপনি বুঝতে পারবেন এই বাসা ইহুদী সম্প্রদায়ের। এখানে মুসলিমদের মসজিদ, খৃস্টানদের গির্জা আর ইহুদীদের উপাসনালয় সিনেগগ এর অবস্থান পাশাপাশি।

এই কাসভা’র বাসিন্ধাদের বলা হয় বারবার (বর্বর) জাতিগোষ্ঠি। এদের জীবনযাপন অন্যদের চেয়ে আলাদা। এদের পোষাক-আশাক একটু বিচিত্রই। এই জাতিগোষ্ঠির নারী-পুরুষ-শিশু সবাই শুধুমাত্র চোখ খোলা রেখে মুখে ওড়না আকারের রুমাল বেঁধে চলাফেরা করে। এটা তাদের ঐতিহ্য।
কাসভা ঘুরে দেখার সময় গাইড মোহাম্মদ জানালেন, এগুলো শুধু ইতিহাস-ঐতিহ্যই নয়, এসব স্থানে হলিউড এর বিখ্যাত সব ছবির শুটিং হয়। জানালেন, মিশন ইমপসিবল ছবির অনেক শুটিং মরক্কোর এসব স্থানে হয়েছে। যাতে অভিনয় করেছেন মার্কিন অভিনেতা টম ক্রুজ। তার মিশন ইমপসিবল সিক্স ছবিটি শুটিং হয়েছে এটলাস পর্বতে। যেখানে টম ক্রুজ নিজে মোটরবাইক চালিয়ে একেবারে এটলাসের চূড়ায় উঠেছেন। এসব গল্প শুনতে শুনতে আমরা এক সময় ঢুকলাম ওয়েইজড শহরে পর্যটকদের জন্য গড়ে উঠা রেস্টুরেন্ট ইথইল এ। চিকেন কাবাবের সঙ্গে রুটি ভক্ষণ করে দুপুরের আহার সেরে আবারো ছুটে চললাম জাগুরার পথে।


তবে এই কাসভা’র মতই আরেকটি কাসভা দেখার সুযোগ হয়েছিল জাগুরা থেকে মারাকেশ ফেরার পথে। সেই শহরের নাম এইথ বিন হেতুন। মাত্র কয়েকটি দোকানপাট গড়ে উঠা এই শহরের প্রধান আকর্ষণই হচ্ছে ঐতিহাসিক কাসভা। সু-উচ্চ ওই কাসভায় হলিউডের অসংখ্য ছবির শুটিং হয়েছে। এখানে নিয়মিতই শুটিং হয়। পৃথিবীর বিখ্যাত অভিনেতারা এখানে এসে শুটিং করেন। এখানকার স্থানীয় গাইড আমাদেরকে ঘুরে ঘুরে দেখালেন পুরো কাসভা। মাত্র ২৭টি পরিবারের বাস এখানে। এদের সবাই মুসলিম সম্প্রদায়ের। কাসভা ঘুরে দেখানোর পর স্থানীয় গাইড আমাদের কাছ থেকে নিয়ে গেলেন জনপ্রতি ২৫ দেরহাম করে।
জাগুরা থেকে সাহারা অতপর উটে’র পিঠে ওয়েইজড শহরের কাসভা ঘুরে দেখার পর আবারো আমাদের যাত্রা শুরু হল জাগুরার পথে। তখনও জাগুরা অনেক দূরের পথ। সমতল ছাড়িয়ে আবারো পাথুরে পাহারের আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে গাড়ি চলছে তো চলছেই…জাগুরার দেখা মিলছে না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। সাত সকালে মারাকেশ থেকে যাত্রা করা আমরা সাহারা দেখার অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় আছি। স্বপ্ন ছিল সাহারায় সূর্যাস্ত দেখবো। কিন্তু সেই স্বপ্নে ইতি টানতে হল। আমরা যখন ভয়ংকর সুন্দর সব উঁচু-নিচু, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে জাগুরা শহর অতিক্রম করছি সূর্য তখন আমাদেরকে বাই বাই টা টা জানিয়ে পশ্চিম দিগন্তে হারিয়ে গেছে।


জাগুরা শহর পেরিয়ে একটু এগুতেই গাড়ি রাস্তা থেকে নেমে গেলো পাশের একটি সমতলে। চালক কাম গাইড বললেন, সবাই নামুন। গাড়ি থেকে নামতেই সারি সারি উট। ১৮-২০ বছর বয়সী চার-পাঁচ জন কিশোর-তরুণ উট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের অপেক্ষায়। পাঁচটি ভাগে ভাগ করা তাদের উটের পিঠেই সওয়ার হলাম সাহারা’র পথে। আমাদেরকে উটের পিঠে তুলে দিয়ে তারা একেক জন প্রতিটি সারির সামনের উটের গলায় বাঁধা দড়ি ধরে হাঁটতে শুরু করলেন। উট চলা শুরু করতেই প্রথমে কিছুটা ভয় পেলাম। তখন অনুমান করলাম মরুভূমিতে যে উটের জকি হয় তাতে কেন শিশুদের ব্যবহার করা হয়। উট যখন হাঁটতে থাকে তখনই শিশুরা ভয়ে চিৎকার শুরু করে। উট তখন জোড়ে দৌড়াতে থাকে। যাকগে আবছা আবছা অন্ধকারের মধ্যে উঁচু-নিচু বালুকাময় পথ ধরে উট চলছে আপন গতিতে। সুশৃংখলভাবে। আকাশে লাখো তারার মেলা। প্রায় ঘণ্টা দেড়েক পথ পাড়ি দিলাম উটের পিঠে। অতপর দেখা মিললো আমাদের তাঁবু’র। একজন দূর থেকে হাক দিলেন…তাতেই সারা দিলেন আমাদের উট এর বাহকরা।


সাহারা মরুভূমির বুকে রাত যাপনের সে কি আনন্দ। তাঁবুতে ঢোকার কিছু সময়ের মধ্যেই আমাদের জন্য চলে আসলো গরম চা। পুদিনা পাতার সেই চায়ের স্বাদ ভিন্ন। হই-হুল্লোররে মধ্য দিয়ে চায়ের সঙ্গে চললো পরিচয় পর্ব। আমাদেরকে যারা উটের পিঠে চড়িয়ে সাহারায় নিয়ে গেলেন তারা নিজেদের নাম জানালেন। মজার তথ্য হচ্ছে মরক্কো’র অধিকাংশ মানুষের নাম হাসান, মোহাম্মদ, আবদুল এই জাতীয়। আমাদের গাইড হচ্ছেন হাসান।
গল্প-স্বল্প’র মধ্যেই রাতের খাবারের প্রস্তুতি। খাবার সেই মারাকেশের মতই। প্রথমে স্যুপ। যেটাকে আমি বলি ভাতের ফেন। তার সঙ্গে রুটি। এরপর সব্জিতে ঢাকা চিকেন তাজিন।
খাওয়া শেষে রাতের আকাশ দেখা। বিশালাকায় চাঁদ উঁকি দিয়েছে মরু পাহারের বুকে। মরুর বুকে কনকেনে ঠান্ডা। এরই মধ্যে ধুম পড়ে গেলো ছবি তোলার। ভোরেই আবার মারাকেশের পথে যাত্রা করতে হবে। এ কারণে সারদিনের ক্লান্তি দূর করতে এবং পরের দিনের জন্য এনার্জি নিতে চলে গেলাম ঘুমের রাজ্যে।


খুব ভোরে, সূর্য্য মামা তখনও উঁকি দেননি পূর্ব দিগন্ত,ে আমরা ঘুম থেকে উঠে সকালের চা-নাস্তা সেরে ফেরার প্রস্তুতি শুরু করলাম। এরই মধ্যে ধীরে ধীরে আলো ডানা মেলতে শুরু করলো সাহারার বুকে। কাছেই একটি পাহাড়। সেই পাহাড় অতিক্রম করে সূর্যের ঝিলিক মরুভূমিতে। চমৎকার এক দৃশ্য। নিজ চোখে না দেখলে বোঝানো যাবে না। সেই দৃশ্য পিছনে ফেলে আমরা আবারো সওয়ার হলাম উটের পিঠে। ৩০ মিনিটের ‘কেমেল’(উট) যাত্রা শেষে আবারো গাড়িতে চড়লাম মারাকেশের পথে। সাহারা মরুভূমিতে রাত যাপনে ধন্য আমি, সার্থক জীবন।

ছবি: লেখক