কাস্ত্রোর প্রেম আর মৃত্যুর পরোয়ানা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

‘তুমি কি আমাকে খুন করতে এখানে এসেছো?’ পুরুষ কন্ঠে প্রশ্নটা শুনে থমকে গেলেন সামনে দাঁড়ানো নারীটি। ঘড়ির কাটায় সময় বিষ্ফোরক তখন। কাটেনা তার দ্বিধা। তারপর নীরবতা ভেঙে সোজা উত্তর, ‘হ্যাঁ’।

এবার পুরুষটি চোখ খুলে তাকালেন। কোমর থেকে .৪৫ রিভলবার বের করে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তাহলে অপেক্ষা করছো কেন! যা করতে এসেছো করো। তবে আমি জানি তুমি পারবে না আমাকে মারতে।’ সেই পুরুষটির মুখে দাড়ি, পরনে জলপাই সবুজ সামরিক পোশাক। তিনি ছিলেন কিউবার লৌহমানব ফিদেল কাস্ত্রো।তাঁর সামনে দাঁড়ানো ভদ্রমহিলা‘র নাম মারিতা লোরেঞ্জ। ফিদেলকে খুন করার জন্য সিআইএ‘র পাঠানো সেই এজেন্ট মারিতা ভালোবাসতেন ফিদেলকে।

১৯৬০ সালের কিউবার রাজধানী হাভানার হিলটন হোটেলের ২৪০৮ রুম। সেখানেই দুপুরবেলা এই যুগল মুখোমুখি হয়েছিলেন। মারিতার কাছে ছিলো ইতিহাসের চাকা ঘুরিয়ে দেয়ার মতো মারাত্নক অস্ত্র, খাবার বা পানীয়তে মেশানোর মারাত্নক বিষ। সিআইএ‘র কর্তারা মারিতার হাতে বিষের দু‘টো ক্যাপসুল দিয়ে বলেছিলো, এগুলো ফিদেলের পানীয়তে মিশিয়ে দিলে সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু নিশ্চিত। কিন্তু সেই ভয়ংকর পরিকল্পনা ব্যর্থ হলো স্বয়ং মারিতার জন্যই। ভালোবাসা দেয়াল হয়ে দাঁড়ালো কাস্ত্রো আর মৃত্যু পরোয়ানার মাঝখানে। মারিতা সত্যি সত্যি ভালোবেসে ফেলেছিলেন কিউবা‘র সেই নায়ককে।

১৯৯৩ সালে মারিতা লোরেঞ্জ‘র একটি দীর্ঘ চিঠি বই আকারে প্রকাশিত হয়, ‘ডিয়ার ফিদেলঃ মাই লাইফ, মাই লাভ, মাই বিট্রেয়াল’। এই গল্পগুলো মারিতার বইয়ে জায়গা করে নিয়েছে রোমাঞ্চকর এক গল্প হিসেবে।   

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো ফিদেল কাস্ত্রোর সেই প্রেম কাহিনি নিয়ে ‘কাস্ত্রোর প্রেম আর মৃত্যুর পরোয়ানা’।

কিউবা বিপ্লব সফল হয়েছে। গোটা পৃথিবীর মানুষ তখন জানে ফিদেল কাস্ত্রোর নাম। পৃথিবী জুড়ে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে কিউবা বিপ্লবের সাফল্য তরুণদের ডেকে আনছে বিপ্লবের লাল পতাকার নিচে। ফিদেল কাস্ত্রো আর চে গুয়েভারার নাম ষাটের দশকে বিপ্লবের আকাশছোঁয়া প্রতীকে পরিণত হয়েছে। সেই উত্তাল সময়ে এই দুজনের দেখা হয়েছিলো বেশ একটু নাটকীয় ভাবেই। ১৯৫৯ সালে হাভানার বন্দরে এসে ভেড়ে ‘বার্লিন-৪’ নামে একটি বিলাসবহুল জাহাজ। সেই জাহাজের ক্যাপ্টেন ছিলেন ১৯ বছর বয়সী মারিতার বাবা হাইনরিখ লোরেঞ্জ। মারিতা লোরেঞ্জ ফেব্রুয়ারী মাসের এক উজ্জল দুপুরে দাঁড়িয়েছিলেন সেই জাহাজের ডেকে। হঠাৎ তার চোখে পড়ে একটি ছোট লঞ্চ তাদের জাহাজের দিকে এগিয়ে আসছে। সেই লঞ্চে যাত্রী ছিলো ২৭ জন এবং তাদের সবার মুখে দাড়ি আর হাতে ছিলো রাইফেল। মারিতার বাবা তথন ঘুমে। ভয় পেয়ে নারিতা জার্মান ভাষায় লঞ্চের সশস্ত্র যাত্রীদের পরিচয় জানতে চান। তার গলায় জড়িয়ে আসছিলো জড়িয়েছিলো ভয় আর উদ্বেগে। লঞ্চের একেবারে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দীর্ঘদেহী এক তরুণ তখন বলে ওঠেন, তারা জাহাজে উঠতে চাচ্ছেন, ভয়ের কিছু নেই।তরুণের পরিচয় জানতে চাইলে তরুণটি ঝকঝকে হাসিতে ভেসে গিয়ে উত্তর দেন, তিনি কমাডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রো।

অতজন বন্দুকধারীর সামনে অসহায় মারিতা তার শেষ অস্ত্র প্রয়োগ করেন। তিনি জানিয়ে দেন, জাহাজটি জার্মান। সেখানে সবাই আসতে পারেন না। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মারিতা বলেন, সেদিন কাস্ত্রো ঠোঁটে স্বভাবসুলভ হাসি ঝুলিয়ে রেখে বলেছিলেন, জাহাজটা তাদের বন্দরে নোঙ্গর করে আছে। কাস্ত্রোর সঙ্গে সেদিন আরেকজন সুদর্শন মানুষ জাহাজে উঠেছিলেন। তিনি চে গুয়েভারা। মারিতা অবশ্য অনেক পরে চে‘র পরিচয় জেনেছিলেন। চে সেদিন জাহাজে উঠেই জার্মান বিয়ার খেতে চান।

কাস্ত্রোর সঙ্গে মারিতার পরিচয় এবং ঘনিষ্টতা দুটোই ছিলো আকস্মিক। সেদিন বাবার অনুপস্থিতিতে মারিতা কাস্ত্রোকে জাহাজটা ঘুরিয়ে দেখান। প্রথম দেখায় ভালোবাসা জন্ম নিয়েছিলো সেদিন দু’জনের হৃদয়ে। তারপর কাস্ত্রো সিগারের ছাই ফেলতে অ্যাসট্রে খুঁজতে গিয়েছিলেন মারিতার কেবিনে। সেখানেই প্রথম চুম্বন। তারপর সম্পর্কের আরও গভীরতায় ঠাঁই নেয়া।

মারিতা তখন সপরিবারে বসবাস করতেন নিউইয়র্কে। সেদিনের দেখা ডালপালা গজিয়ে আরও বড় হলো। ফিরে আসার পরেও হাভানা থেকে ফোন আসতো মারিতার বাড়িতে। এরপর মারিতা বিমানে উড়ে যেতেন হাভানায়। সেখানে এক হোটেলের স্যুটে তারা মিলিত হতেন। তখন গোটা পৃথিবীজুড়ে কাস্ত্রোর জন্য সুন্দরী নারীরা উন্মুখ ছিলো। হাভানায় প্রেমপত্রে ভরে উঠতো তার ডাকবাক্স।

কাস্ত্রো ১৯৫৯ সালে আমেরিকায় যান কিউবা ও আমেরিকার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করতে। সেখানেই মারিতা তাকে জানান তিনি গর্ভবতী। খবরটা শুনে খুশি হয়েছিলেন কাস্ত্রো। বলেছিলেন, তাদের সন্তান হবে জার্মান এবং কিউবান বংশোদ্ভূত। কিন্তু ১৯৫৯ সালের অক্টোবর মাসে ভিন্ন ঘটনা ঘটে যায়। কিউবায় মারিতার গর্ভপাত করানো হয়। মারিতা ধারণা করেন পুরো বিষয়টার পেছনে কাস্ত্রোর হাত ছিলো। আর তাতেই কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে চলে যান মারিতা। ঠিক ওই সময়েই মারিতার মা অ্যালিস লোরেঞ্জ ফিদেল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে একটি খোলা চিঠি লিখে তা বিক্রি করেন চড়া দামে ‘কনফিডেনশিয়াল’ নামে একটি ম্যাগাজিনে। হৈ চৈ পড়ে যায়। এই চিঠির কপি তিনি  আমেরিকার তখনকার প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ারের কাছেও পাঠান।

এসব ঘটনার পর মারিতা আমেরিকায় কাস্ত্রো বিরোধী বিভিন্ন গ্রুপের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেন নিজেকে। আর ঠিক সেখানেই সি.আই.এ তাকে কাজে লাগায়। মায়ামিতে তাকে প্রশিক্ষণ দেয় তারা এসব তথ্য জানা গেছে সি.আই.এ-এর প্রকাশিত বিভিন্ন নথিপত্রে। সি.আই.এ তাকে টাকা এবং বিষ মেশানো ক্যাপসুল দিয়ে ফিদেল কাস্ত্রোকে খুন করতে পাঠায়।

কিউবা গিয়েছিলেন মারিতা। কিন্তু কিউবার মাটি স্পর্শ করেই মারিতা টের পান কাজটা তিনি করতে পারবেন না। ফিদেল তার ভালোবাসা। তাকে খুন করতে পারবেন না তিনি। কাস্ত্রো জানতেন মারিতার আসার খবর। নির্দেশ অনুযায়ী জীপটি মারিতাকে নিয়ে যায় হিলটন হোটেলে। ২৪০৮ নম্বর রুমে তখনও মারিতার অপেক্ষার কুয়াশা জমা হচ্ছিলো। কাস্ত্রো এলেন আরও কিছুটা সময় পরে। ঠোঁটে সিগার। ভালোবাসার নারী মারিতাকে দেখে নানা ধরণের প্রশ্ন করছিলেন তিনি। তারপর এক সময় করলেন সেই অমোঘ প্রশ্ন, ‘তুমি কি আমাকে খুন করতে চাও?’

ফিরে গিয়েছিলেন মারিতা। সি.আই.এ-এর চক্রান্ত সেদিন ব্যর্থ হয়েছিলো। সেদিন ফিদেল মারিতাকে শেষ সংলাপে বলেছিলেন, ‘আমাকে কেউ খুন করতে পারবে না।’

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ আল দিয়া ম্যাগাজিন (স্পেন)
ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments