কিছুটা ছাই, কিছুটা গোপন

দান্তে

উন্মন্ত জনতার ভয়ে দান্তে লুকিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছিলেন তাঁর দিভাইন কম্মেদিয়ার প্রথম সাতটি ক্যান্টো, ভার্জিল রহস্যময় কারণে পুড়য়ে ফেলতে চেয়েছিলেন ‘ঈনীড’। কাফকা মৃত্যুর আগে বন্ধুকে অনুরোধ করেছিলেন তাঁর সব লেখা আগুনে ফেলে দিতে। আলেকজান্ডার সোলঝেনিৎসিন সোভিয়েত গুপ্ত পুলিশের ভয়ে ১২ বছর ধরে যা লিখেছিলেন তা লুকিয়ে রাখতেন শ্যাম্পেনের বোতলে ভরে মাটির নিচে।আর বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে রহস্যময় কবি জীবনানন্দ দাশ ট্রাঙ্কবন্দী করে রেখে গিয়েছিলেন সাড়ে তিন’শ পাণ্ডুলিপি যা কখনোই প্রকাশিত হয়নি।

ফ্রানৎস কাফকা

কিন্তু এতসব কাণ্ডের পরেও তাদের লেখার আগুন স্পর্শ করেছে পাঠকদের। যুগের পর যুগ অতিক্রম করে এসে এই সাহিত্যিকদের লেখা পেয়েছে অমরত্ব।

কেউ কেউ মনে করেন এটা আত্নপ্রচারণার যুগ। নিজের ঢাক নিজে না-পেটালে অমরত্ব লাভ করা যায় না। কিন্তু প্রচারমাধ্যম নির্ভর এই যুগে দাঁড়িয়েও কি বলা যায় কথাটা সত্য? উল্টো সাহিত্যের সেইসব অমর স্রষ্টারা যারা শুধু নিজের কাজেই মগ্ন থেকেছেন পৃথিবীজোড়া পাঠক নিজেদের প্রয়োজনেই তাঁদের খুঁজে নিয়েছেন।

তখন ফ্লোরেন্সে বসে দান্তে লিখছেন ‘দিভাইন কম্মেদিয়া’র প্রথম পর্ব ‘ইনফার্নো’। কিন্তু প্রখম সাতটি পর্ব(ক্যান্টো) লেখার পরেই জনতার রোষ আর রোমান শাসকদের হাত থেকে বাঁচতে বাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়েছিলো দান্তেকে। তখন সেই সাতটি পর্ব লেখা কাগজগুলো পড়ে এক অজ্ঞাত ব্যক্তির হাতে। তিনিই সেগুলো লুকিয়ে রাখেন একটি গোপন কুঠুরিতে। পরে সেই সাতটি পর্ব অবিষ্কার করেন দান্তের ছেলেরা।

দান্তে যাকে নিজের গুরু বলে মেনে নিয়েছিলেন, সেই ভার্জিলের জীবনেও এরকম একটি আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছিলো। মৃত্যুর আগে তিনি নির্দেশ দিয়ে যান, তাঁর লেখা ল্যাটিন সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি ‘‌ঈনীড’‌ যেন পুড়িয়ে ফেলা হয়। কিন্তু সম্রাট আউগুস্তুসের হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত তা না  পুড়িয়ে এই সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তিটি রক্ষা করা হয়। অথচ এই মহাকাব্য শেষ করবেন বলেই ভার্জিল ইতালিয়া ছেড়ে গ্রিসে গিয়েছিলেন এবং সেখানে কয়েক বছর কাটাবেন বলে সঙ্কল্প করেছিলেন!‌ নিজের মহাকাব্যের পাণ্ডুলিপি নিয়ে প্রকাশকদের দরজায় দরজায় গিয়ে কড়া নেড়েছিলেন। কিন্তু কেউ তাঁর ‘‌মাস্টারপিস’‌–‌এর উপযুক্ত দাম দিতে চায়নি। হায় সভ্যতা।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

জীবনানন্দ দাশ

আধুনিক আখ্যানের দুই মহৎ স্রষ্টা, নিকোলাই গোগোল এবং ফ্রানৎস কাফকার জীবনেও ঘটেছে এরকম ঘটনা। ১৮৪২ সালে প্রকাশিত হয় গোগোলের জীবনের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস, ‘‌ডেড সোলস’‌।‌ গোগোল নিজেই বলেছিলেন, এটি গদ্যে লেখা মহাকাব্য। দান্তের ‘‌দিভাইনা কম্মেদিয়া’‌র প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব ‘‌ইনফের্নো’‌ এবং ‘‌পার্গেতেরিও’‌র সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে এই বইয়ের প্রথম দুটি পর্বকে। ১৮৪৮ সালের এপ্রিল মাসে গোগোল জেরুজালেমে তীর্থযাত্রা শেষে রাশিয়ায় ফিরে আসেন। কিন্তু তারপর থেকে গভীর নৈরাশ্যে তাকে ঘিরে ধরে। তাঁর স্বাস্থ্যেরও দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। ১৮৫২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে তিনি নিজের হাতে ‘‌ডেড সোলস’‌ উপন্যাসের দ্বিতীয় খণ্ডের পাণ্ডুলিপির অধিকাংশই পুড়িয়ে দেন। তারপরের কাহিনি আরো করুণ। নিজের হাতে নিজের সৃষ্টি পুড়িয়ে ফেলার পর গোগল শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন এবং নয় দিন পর মারা যান।
মৃত্যুর আগে ফ্রানৎস কাফকা তাঁর বিশিষ্ট ও অন্তরঙ্গ বন্ধু ম্যাক্স ব্রডের কাছে অন্তিম প্রার্থনা জানিয়ে বলেছিলেন, ‘‌দেখ ব্রড, আমার শেষ অনুরোধ, আমার যত লেখা আছে, বাড়িতে, বুক কেসে, অফিসের ড্রয়ারে কিংবা অন্য কোনও বন্ধু বা তোমার কাছে, সেগুলি সমস্ত পুড়িয়ে ফেলো। শুধু তাই নয়, আমার চিঠিগুলি পর্যন্ত যেন পুড়িয়ে ফেলা হয়।’‌
কাফকার লেখার টেবিল ভালো করে অনুসন্ধানের পর ব্রড একটি প্রায় বিবর্ণ চিঠি পান। এই চিঠিতে কাফকা লিখেছিলেন, ‘‌বোধহয় এবার আমি বাঁচব না। আমি চাই আমার সমস্ত লেখা নষ্ট হয়ে যাক। তুমি কোনও দ্বিধা কোরো না। আমার সমস্ত লেখা, এমনকী তাদের শেষ চিহ্ন পর্যন্ত যেন পুড়িয়ে ফেলা হয়। কী হবে এই লেখায়?‌’‌ কিন্তু ব্রড কিন্তু বন্ধুর অনুরোধে তিনি কাফকার বইগুলি প্রকাশ করলেন। লিখলেন এই অসাধারণ সাহিত্যিকের জীবনী।

নিকোলাই গোগোল

সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ায় স্তালিনের যুগে তখনকার বহু প্রধান কবি-লেখককে শুধু খুন করাই হয়নি, তাদের রচনাবলীও নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা চলেছে। সে সময়ে রুশ সাহিত্যের চার প্রধান কবি ছিলেন ওসিপ ম্যান্ডেলস্তাম, আন্না আখমাতোভা, বরিস পাস্তারনাক এবং মারিনা সুইয়াতেভা। ১৯২৫ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে আন্না আখমাতোভার কোনো লেখা কোথাও প্রকাশিত হতে পারেনি। তখন অপমান আর বেদনাই ছিলো তাঁর নিত্যসঙ্গী। নিজের লেখা বহু কবিতাই তিনি তখন পুড়িয়ে ফেলেন, যার স্মৃতি শুধু রয়ে গেছে কেবল পাঠকদের স্মৃতিতে। বরিস পাস্তারনাক তখন মৌলিক লেখা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। অনুবাদ করে তার দিন চলতো। তখন পাস্তারনাককে লেখক ইউনিয়ন থেকে বের করে দেয়া হয়েছিলো। কেড়ে নেয়া হয়েছিলো তার রেশনকার্ডটিও। রাজনৈতিক সন্ত্রাসের শিকার এই সাহিত্যিক মারিনা সুইয়াতেভার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছেন, ‘ সাহিত্যের আমলারা যদি এমন বীভৎস আচরণ না করতো তাহলে আন্না আত্মহত্যার পথ বেছে নিতো না। তাকে সে আমলে বাসন মাজার কাজও করতে দেয়া হয়নি। অভাবের যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে আন্না শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করেন।’

আরেক রুশ সাহিত্যিক আলেকজান্দার সোলঝেনিৎসিনও ১২ বছর ধরে গোপনে সাহিত্য চর্চা করতে বাধ্য হয়েছিলেন। সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার নীতির সঙ্গে একমত হতে না-পারায় তাঁর উপর নেমে এসেছিলো নির্যাতন। সোভিয়েত গুপ্ত পুলিশের ভয়ে তিনি নিজের লেখা খুব ছোট ছোট অক্ষরে লিখে ভরে ফেলতেন সিলিন্ডার অথবা শ্যাম্পেনের বোতলে। তারপর সেগুলো চাপা দিয়ে রাখতেন মাটির তলায়।

আন্না আখমাতোভা

বাংলা সাহিত্যেও এমন প্রচুর দৃষ্টান্ত রয়েছে। জীবনানন্দ দাশ অন্যমনষ্ক হয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে গিয়েছিলেন ট্রামের তলায়। ঘটনাটা অবশ্য আত্মহত্যা বলেই কথিত আছে। বাংলা সাহিত্যের অসাধারণ কবি এভাবেই বিদায় নিয়েছিলেন। কিন্তু রয়ে গেছে তাঁর লেখার পাণ্ডুলিপি ভর্তি কয়েকটি ট্রাঙ্ক। সেগুলোর ডালা খুলে মিলেছে কবির অপ্রকাশিত প্রায় সাড়ে তিন’শ পাণ্ডুলিপি। খাতায় লেখা কবিতা ছাড়াও ট্রাঙ্কের ভেতর থেকে পাওয়া গিয়েছিলো গল্প, উপন্যাস এবং লিটেরেরি নোটস। এগুলো কবি কোনোদিন প্রকাশই করেননি! পর্তুগালের ফার্নান্দো পেসুয়া ছাড়া বিশ শতকের কোনো মহৎ কবির জীবনে এমন ঘটনা ঘটেনি।

বাংলা সাহিত্যের আরেক দিকপাল মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘কলেজ স্ট্রিটের মোড়ে দাঁড়িয়ে ভাবছি কোথায় যাই, কী করি?’ একই লেখায় এক প্রকাশক সম্পর্কে লিখছেন, ‘কী স্পর্ধা! বলে কিনা অন্যভাবে লেখা ভালো বই চাই।’

প্রকাশকদের দরজায় দরজায় উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি নিয়ে ঘুরেছেন তিনি। অর্থাভাব তখন চরমে। ১৯৫৪ সালে শরীর ভেঙে পড়েছে গ্যাসট্রাইটিস, মৃগী আর অতিরিক্ত মদ্যপানে। লেখা ছাপা হয়নি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তেমন বহু লেখা হারিয়েও গেছে।

পশ্চিমা দুনিয়ায় যে পাঁচজন মনীষীর হাত ধরে চিন্তার ইতিহাসে বিপ্লব ঘটে যায়, তাঁদের অন্যতম ছিলেন ‘‌ভাষাবিজ্ঞান’‌–‌এর জনক ফার্দিনান্দ দ্য সস্যুর। বাকি চারজন হলেন, কার্ল মার্কস, সিগমুন্ড ফ্রয়েড, এমিল ডুর্কহাইম এবং চার্লস ডারউইন। ১৯০৬ থেকে ১৯‌‌১১ সালের মধ্যে তিন দফায় সস্যুর ভাষাতত্ত্বের পাঠ দেন জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯১৩ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। সস্যুরের ছাত্র শার্ল বাল্লি এবং ছাত্রী আলবার্ত সেখেহায়ে ঠিক করেন সস্যুরের শেষ জীবনের লেকচারের একটি সঙ্কলন তাঁরা সম্পাদনা করবেন। লেকচারের আগে নোট তৈরি করতেন সস্যুর। কিন্তু বক্তৃতা দেওয়া হয়ে গেলে সেইসব খসড়া নিজের হাতেই আবার ধ্বংস করে দিতেন তিনি। অসহায় সম্পাদকদ্বয় বাধ্য হয়ে সস্যুরের ছাত্রছাত্রীদের ক্লাস নোটের ওপরেই নির্ভর করতে বাধ্য হন। বক্তৃতা চলাকালে তারা যেটুকু টুকে রেখেছিলেন, তা থেকেই তৈরি হয় সস্যুরের লেকচারপত্রের সার–‌সঙ্কলন। ১৯১৬ সালে মূল ফরাসিতে প্রকাশিত হয় পাতলা একটি বই, ‘‌কোর্স ইন জেনারেল লিঙ্গুইস্টিক্স’‌।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট

ছবিঃ গুগল