কিছু মানুষ আতংকের বিপরীত ইতিহাস লেখার জন্য জন্মে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সালাহ্ উদ্দিন শৈবাল

( কানাডা থেকে): ১৯১৮ সাল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ প্রায়। চার বছরের এই ভয়াবহ যুদ্ধে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ প্রান হারিয়েছে। যুদ্ধের ক্ষত দেশে দেশে। কিন্তু এই সময়টা মানব সভ্যতার জন্য র্গবেরও নানা কারনে। মানুষের হাতে নতুন নতুন টেকনোলজী চলে এসেছে। শিল্প বিপ্লব হয়ে গেছে। কল-কারখানা গড়ে উঠেছে। মানুষ প্রাইভেট কার তৈরী করে ফেলেছে। সেই গাড়ীতে করে দূর দূর চলে যাচ্ছে। মানুষ নিজেকে বেশ শক্তিশালী ভাবতে শুরু করেছে।

ঠিক সেই সময়….১৯১৮ সালের জানুয়ারী মাস থেকেই শুরু হয়ে গেলো মানব সভ্যতার সবচেয়ে ভয়াবহ মহামারী। ভাইরাস থেকে ইনফ্লুয়েঞ্জা। পৃথিবীর এ মাথা থেকে সে মাথায় ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগলো না। যুদ্ধ চলছিলো। তাই আমেরিকা থেকে ইউরোপের ছড়িয়ে পড়লেও সে সব দেশের পত্রিকা এইসব খবরগুলো গোপন করে যাচ্ছিলো। ব্যতিক্রম স্পেন। স্পেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিরপেক্ষ ছিলো। তাই সে দেশের পত্রিকার প্রথম পাতায় আসতে থাকলো আক্রান্ত আর মৃত্যুর খবর। এই রোগের প্রচলিত নাম তাই হয়ে গেলো স্প্যানিশ ফ্লু।

স্কুল, কলেজ, কল-কারখানা বন্ধ হয়ে গেলো। হাসপাতাল আর কবরস্থান দেখলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিভীষিকা। কতো মানুষ আক্রান্ত হলো আর মারা গেলো তার সঠিক হিসাব নেই। আন্দাজ করা হয়েছে পরে। মৃতের সংখ্যা ৫ কোটির নিচে হবে না।

ব্র্যান্টফোর্ড কানাডার ছোট একটা শহর। টরন্টো থেকে ঘন্টা দেড়েকের ড্রাইভ। সেই ছোট বেলা থেকে আমরা জানি গ্রাহাম বেল টেলিফোন আবিস্কার করেছেন ১৮৭৫ সালে। সেই আলেক্সান্ডার গ্রাহাম বেল এই শহরের অধিবাসী ছিলেন। এই শহরের আরেক নাম তাই ‘টেলিফোনের শহর’।

অক্টোবর ১১, ১৯১৮। ব্র্যান্টফোর্ড হাসপাতালের ১৬ জন নার্স অসুস্থ। বাকীরা এতো ক্লান্ত যে তাদের কাজ করার সামর্থ্য নেই। খোলা হলো এমারজেন্সী টেম্পোরারী হাসপাতাল শুধু ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগীদের জন্য। কিন্তু কাজ করবে কারা? মানুষ মানুষের সংগে দেখা করে না। বাইরে বের হয় না। শহরগুলোতে ড্রাইভ করে কোন আগুন্তুক আসলে তাদের ঢুকতে দেয়া হয় না। পোস্টম্যান চিঠি এনে শহরের বাইরে রেখে যায়। পরে আরেকজন শহরবাসী তা নিয়ে আসে। সর্বত্র আক্রান্ত হওয়ার আতংক।

কিন্তু কিছু মানুষ সব সময় আতংকের বিপরীত ইতিহাস লেখার জন্যই জন্ম নেয়। কালে কালে। দেশে দেশে।

বারবারা……তের মাসের সর্ট নার্সিং ট্রেনিং শেষ করেছে মাত্র।

পার্ল….নার্সিং পড়াশোনা শেষ করে ট্রেনিংয়ে ছিলো।

হেলেন….যে আগে এই শহরে নার্স ছিলো। বেড়াতে এসেছিলো।

এডা…..নার্সিং স্কুলের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। বাড়ী এসেছিলো টাউফয়েডে আক্রান্ত হয়ে। সুস্থ হওয়ার জন্য।

……………..এরা সবাই……..সংগে রাসেল! রাসেল সুইট!!

মাত্র সতের বছরের হাই স্কুলের ছাত্র। ভালো স্পোর্টসম্যান ছিলো। সেও যোগ দিয়েছিলো এই টেম্পোরারী হাসপাতালে সহযোগী হিসাবে। এরা সবাই ভলান্টিয়ার হিসাবে অসীম সাহসে নিজেদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলো অদৃশ্য সেই ভয়ংকর শক্রর সংগে এক অসম যুদ্ধে।

এদের কারোরই বয়স চল্লিশের উপরে ছিলো না।

ইনফ্লুয়েঞ্জা এক সময় পরাজিত হয়েছিলো ঠিকই। কিন্তু কোন যুদ্ধইবা বীরদের আত্মত্যাগ ছাড়া জয় করা সম্ভব হয়েছে?

অক্টোবরের ২৩ থেকে নভেম্বর ৮ তারিখের মধ্যে ব্র্যান্টফোর্ড শহরে অন্য অনেকের মতো দুইজন ডাক্তার আর সাতজন নার্স প্রাণ হারায়। তাদের মধ্যে এরা সবাই ছিলো। রাসেলের সমাধি আছে তার প্রিয় ব্র্যান্টফোর্ড শহরের ফেরিংডন সিমেটারীতে। ইন্টারনেটে আমি তার সমাধি ফলকের একটা ছবি খুঁজে পেয়েছি।

মানুষের একটা বড় গুন আছে। যেটা অনেক সময় তার বড় দূর্বলতাও হয়ে যায়। মানুষ বেঁচে থাকার জন্য সময়ের সংগে সংগে তীব্র কষ্টও ভুলে যেতে পারে। যদি না পারতো তবে মানুষ বেঁচে থাকতে পারতো না। ১৯১৮-১৯ সালের চুড়ান্ত আতংক আর সীমাহীন অসহায়ত্ব মানুষকে বোধহীন করে দিয়েছিলো দীর্ঘ দিন। তাই এই বিরাট মহামারী নিয়ে ভালো কোন তথ্যবহুল বই ১৯৭৬ সালের আগে লেখাই হয়নি। মানুষ আসলে চায়নি ঐ কালো সময়ের কথা মনে থাকুক। এখনো কি চায়? চায় না। তাই এখনকার বেশির ভাগ মানুষই ১৯১৮ সালের মহামারীর কথা জানে না। আলোচনা হয় না। কষ্ট ভুলে বেঁচে থাকার ক্ষমতা এ্ই ক্ষেত্রে মানুষের জন্য সাময়িক উপশম হলেও আখেরে ভালো হয় নি। ভাইরাস নিয়ে যতো গবেষনা, যতো অর্থ-সামর্থ্য বরাদ্দ করার দরকার ছিলো..গত ১০০ বছরে তা হয়নি। তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে একটা সিনেমা তৈরী হয়েছে। শুধুমাত্র মেয়েদের সুন্দর দেখানোর জন্য বিউটি ইন্ড্রাষ্ট্রি গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার কোটি টাকায়।

নাহ্‌…থাক। এইসব কথা বলতে ভালো লাগে না। তার চেয়ে মানুষের লড়াই নিয়েই কথা বলি। এই সেদিন দেখলাম চীনের এক ডাক্তার সারাদিন পরিশ্রম শেষে অবরুদ্ধ ইউহান শহরের ফাঁকা রাস্তায় সন্ধ্যাবেলা একা একা বাসায় ফিরছে। তার কন্ঠে গান! সে একটা দেশাত্ববোধক গান গাইছে। আমি মুগ্ধ হয়ে সে ভিডিও দেখছিলাম। এই মানুষটি পরের দিন আবার কাজে যাবে মৃত্যু ভয়কে তুড়ি মেরে।

আমি যতোবার মানুষের এইসব দু:সময়ের ইতিহাস পড়তে বসেছি ততবার বিস্ময় নিয়ে আবিস্কার করেছি অসামান্য সব বীরদের মাথা উঁচু করা সংগ্রামের কথা। যতবার মানুষ তার সবচেয়ে ক্রান্তিকাল অতিত্রুম করেছে ঠিক ততবার সে সামর্থে তার নিজেকে মাইল মাইল ছাড়িয়ে গেছে।

আমি এর ব্যতিক্রম ইতিহাসে কখনো খুঁজে পাইনি।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]