কিছু মায়া রয়ে গেল…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শেষ দৃশ্যে যেন কিছু মায়া রয়ে যায় এই জ্বর-জ্বালায় পুড়তে থাকা মানব সংসারে। যে মায়ার টানে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় হয়তো লিখে ফেলেন এমন কবিতা-

যেতে পারি

‘যে-কোন দিকেই আমি চলে যেতে পারি

কিন্তু, কেন যাবো?

সন্তানের মুখ ধরে একটি চুমো খাবো।

এই সন্তপ্ত সংসার ভীষণ এক মায়ার বাঁধনে বেঁধে রাখে মানুষকে?  শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘কিছু মায়া রয়ে গেল ‘ কবিতাটা হুট করে মনে করিয়ে দেয়-

সকল প্রতাপ হল প্রায় অবসিত…
জ্বালাহীন হৃদয়ের একান্ত নিভৃতে
কিছু মায়া রয়ে গেলো দিনান্তের,
শুধু এই –
কোনোভাবে বেঁচে থেকে প্রণাম জানানো
পৃথিবীকে।

কিছু মায়া রয়ে যায় দিনান্তের-সত্যিই তো, বিশৃংখল হাতে মানুষ তার এক জীবনে কত আশা, কত নিরাশার আকাশ প্রদীপ  উড়িয়ে চলে এ পৃথিবীতে। জীবৎকালে শেষ দৃশ্যের কথা কে ভাবে! কিন্তু সময়ের শেষ ফোঁড়ে এসে কত দৃশ্য, কত কান্না, বেদনার ভার এসে ভিড় করে সামনে। সে এক মায়ার পৃথিবী।

মনের মধ্যে এক অদ্ভুত কুয়াশাচ্ছন্ন পৃথিবী জমিয়ে রেখে তার পথ চলা। গলির মোড়ে সিগারেটের দোকানের পাশে যে কুকুরটা প্রতিদিন শুয়ে থাকে তার জন্য মায়া থেকে যায়, যে ছেলেটা ভাত খাওয়ার দোকানে টেবিলের উপর থালাবাটি সাজিয়ে রাখে, জলের গ্লাস ভরে দেয়, তার ঘামেভেজা করুণ মুখের জন্য মায়া থেকে যায়।যেরকম নদীর টান তৈরি হয় বাঁধা পড়বে না জেনেও এক বেদে নৌকার জন্য, হেমন্তকালের আকাশের মায়া যেমন তার শেষ ফোঁটা আলোর জন্য। আচ্ছা, এরা কেউ তো স্ত্রী, পুত্রের মতো স্বজন নয়, তবুও কেমন এক মায়া পড়ে থাকে বুকের ঘরে।মানুষের মনের মধ্যে মায়ার গভীর ছায়া যেন পুকুরের শান্ত জল। গড়িয়ে যায় অবেলায়, ছড়িয়ে পড়ে জীবনের শেষ দৃশ্যে।  

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো মানুষের খুব চেনা অথচ ভীষণ অচেনা এক আবেগ নিয়ে সংলাপ ‘কিছু মায়া রয়ে গেলো’। 

১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর। আগের দিনই জীবনানন্দ দাশ রেডিয়োয় ‘মহাজিজ্ঞাসা’ কবিতাটি পাঠ করেছিলেন। তা নিয়ে সে দিন সকালে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনাও করেছিলেন। তার পর প্রতি দিনের মতো ল্যান্সডাউন রোডের বাড়ি থেকে বিকেলে হাঁটতে বের হন। ছোটবেলা থেকেই হাঁটা যে তাঁর অভ্যাস। তৎকালীন পূর্ব বাংলায় বাল্যকালের সেই স্টিমারের জেটি। কিছুটা দূরে ঝাউয়ের সারি। লিচু, অজস্র ফুল-ফল সমারোহে বিশাল কম্পাউন্ড নিয়ে ব্রাউন সাহেবের কুঠি। সবাকছু পার হয়ে ব্রাহ্ম সমাজ সার্কিট হাউসের গির্জা, তা ছাড়িয়ে গেলে শ্মশানভূমি, লাশকাটা ঘর। সে সব পথ হাঁটতে হাঁটতে আকাশে মেঘ দেখে বালক জীবনানন্দ ভাইকে বলতেন, তিনি একটা মনপবনের নৌকা তৈরি করবেন। সে দিনও কি জীবনানন্দ আকাশে মেঘ দেখে মনপবনের নৌকার কথা ভাবছিলেন? না হলে কেন ট্রামের অবিরাম ঘণ্টা বাজানোর আওয়াজ, ট্রাম চালকের চিৎকার শুনতে পাবেন না তিনি! ট্রামের ধাক্কায় গুরুতর জখম জীবনানন্দকে রাস্তা থেকে তুলে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছিলেন অপরিচিতেরা। সেখানেই কলকাতা শহরের অবিশ্বাসী ট্রাম লাইন জীবনানন্দ দাশকে টেনে নেয়ার পরে হাসপাতালের বিছানায় আট দিনের লড়াই।

মৃত্যুর আগে তাঁর শেষ উক্তি ছিল, ‘ধূসর পাণ্ডুলিপির রং সারাটা আকাশ জুড়ে’।

সঙ্গীতজ্ঞ বিটোফেন বলেছিলেন, ‘শেষ হলো প্রহসন’। বিশ্বাসঘাতক বন্ধু ব্রুটাসের ছুরি পাজরে আমূল ঢুকে যাবার সময় রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারের উক্তি ছিল, ‘ব্রুটাস তুমিও!’ আর বিশিষ্ট লেখিকা জেন অস্টেনের কাছে তার বোন জানতে চেয়েছিলো কিছু চাই কী না? অস্টেন উত্তর দিয়েছিলেন, ‘শুধু মৃত্যু’।

মানুষ অন্তিম দৃশ্যে এসে শান্ত মৃত্যুকে চায়। তার বুঁজে আসা চোখের পাতার নিচে যন্ত্রণার পাশাপাশি হয়তো খেলা করে আকুলতাও। হেমন্তের মরে আসা আলোতে ম্লান আকাশের মতো সে-ও কি তখন আরও খানিকটা সময় বাঁচতে চায়? কী পড়ে থাকে তখন পেছনে? জেন অস্টেনের আকাঙ্ক্ষিত ‘শুধু মৃত্যু’ ছাড়া আর কী চাওয়ার বাকি থাকে সেই অবেলায়? ছোট গল্পকার ও’হেনরি শেষ সময়ে ভয় :ধরানো গলায় কেন বন্ধুর দিকে তাকিয়ে চীৎকার করে বলে উঠবেন, ‘‘চার্লি! আলোগুলো সব জ্বেলে দাও! অন্ধকারে ঘরে ফিরতে খুব ভয় করবে আমার!’’ ও’হেনরির বয়স তখন মাত্র ৪৮ বছর।

এই সংসারে কত কী জোটাই আমরা। কত পিছুটান শরীর জড়িয়ে ধরে নির্জন হয়ে। মনের ভেতরে বাজতে থাকে সেই চিরকালের কথা, ‘দেখার আগে যাকে চিনেছিলাম, দেখার পরে যাকে ভুলে ছিলাম।’ ভুলেই তো থাকি আমরা। হয়তো অন্য এক জীবনের কথা ভুলে থাকি, কারো মুখ ভুলে থাকি, বুকের ভেতরে অস্ফুট এক চেতনাকে ভুলে থাকি যা গোপন হীরক খণ্ডের মতো ঝিকিয়ে উঠে হারিয়ে যায়। তখন দু’চোখে অশ্রু পরম মিত্রের মতো।

কিন্তু সিলভিয়া প্লাথ তো শেষ কবিতায় লিখেছিলেন, ‘উই হ্যাভ কাম সো ফার, ইট ইজ ওভার’। ‘আমরা অনেক দূরে চলে এসেছি, সব শেষ হয়ে গেছে’। দুটি শিশুর পাশ থেকে উঠে একদিন পৃথিবীর সব আলো নিভিয়ে দিতে চেয়েছিলেন তিনি। তাই দিয়েও ছিলেন সিলভিয়া প্লাথ। তাঁর সব ফুলের সব পাপড়ি তখন পাথর হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু পলে পলে পাথর হয়ে ওঠা এই জীবনের প্রতি কবিদের সংরাগও কম নয়। মার্কিন কবি চার্লস বুকাওয়াস্কি যখন তীব্র নেশার ঘোরের মধ্যে বসে লেখেন, ‘পৃথিবীর শেষ হয়ে যাওয়া নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। কারণ প্রতিদিন সকালে পৃথিবী আবার বেঁচে ওঠে।’ তাই তো জীবনের কোনো এক প্রান্তে এসে হাত বাড়িয়ে ছুঁতে ইচ্ছে করে সবকিছু। পুরনো লন্ড্রির স্লিপ, অঙ্কের খাতা, জীবন নদীতে হঠাৎ লাফিয়ে উঠে হারিয়ে যাওয়া কোনো প্রেমপত্র, কবে শোনা গান, কার গলায় হাহাকার সব, সব যেন একসঙ্গে মিলে বলে ওঠে-কিছু মায়া রয়ে গেলো।

ইরাজ আহমেদ

ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box