কিডনিতে পাথর হয় কেন?

kollol-jpg

ডা. মিজানুর রহমান কল্লোল

কিডনিতে পাথর হওয়ার অনেক কারণ রয়েছে। নিচের যেকোনো একটি কারণে পাথর হতে পারে অথবা সব কারণ একসাথে মিলে পাথর সৃষ্টি করতে পারে। যেমন:
*শরীরে ভিটামিন-এ এর ঘাটতি।
* প্রস্রাবে বিভিন্ন মাত্রায় লবণের আধিক্য।
*গরম আবহাওয়া।
*হরমোনের অসমতার কারণে প্রস্রাবে সাইট্রেটের পরিমাণ কমে যাওয়া।kidney-2
* মূত্রথলিতে দীর্ঘ সময় প্রস্রাব জমে থাকা এবং পর্যাপ্ত প্রস্রাব না হওয়া।
* প্রস্রাবের রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা।
* প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থির অধিক কার্যকারিতার ফলে প্রস্রাবে অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম নিঃসরণ হওয়া।
* দীর্ঘ দিন নড়াচড়া না করা অর্থাৎ শরীর অবশ থাকা।
* কিডনিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ ও সংক্রমণ।
বিভিন্ন ধরনের কিডনি পাথর
পাথর গঠনকারী উপাদানের ওপর নির্ভর করে কিডনি পাথরের ধরন। পাথর বিভিন্ন ধরনের হতে পারে, যেমন:
* ক্যালসিয়াম অক্সালেট পাথর
* ক্যালসিয়াম ফসফেট পাথর
* ইউরিক অ্যাসিড বা ইউরেট পাথর
* সিস্টিন পাথর।
উল্লেখ্য, প্রস্রাবে দ্রবীভূত ক্যালসিয়াম, অক্সালেট, ফসফেট, ইউরিক অ্যাসিড প্রভৃতি পদার্থ প্রস্রাবের সঙ্গে কিডনিতে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে। এভাবে দীর্ঘ সময় অবস্থানের পর পাথরের আকার ধারণ করে এবং দিন দিন বড় হতে থাকে।
উপসর্গ
শতকরা ৫০ ভাগ রোগীর কিডনিতে পাথর হয় ৩০-৫০ বছর বয়সে। মহিলাদের চেয়ে পুরুষদের পাথর হওয়ার ঘটনা কিছুটা বেশি। এই অনুপাত ৪:৩। সব পাথর উপসর্গ তৈরি করে না। ফসফেট পাথর সাধারণত নীরব থাকে। এ পাথর আকারে খুব বড় হলে কিডনির টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কেবল তখনই উপসর্গ দেখা দেয়। কিডনিতে পাথর হলে শতকরা ৭৫ ভাগ ক্ষেত্রে রোগী ব্যথা এবং প্রস্রাবে রক্ত যাওয়ার কথা বলেন। সংক্রমণ থাকলে প্রস্রাবের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে।
কিডনির পাথরের ব্যথা নির্ভর করে পাথরের অবস্থানের ওপর। পাথর যদি কিডনিতে থাকে তা হলে ব্যথা অনুভূত হয় পিঠে, পাঁজরের ঠিক নিচে। এ ব্যথা পেছন থেকে সামনে ছড়িয়ে পড়তে পারে। হাঁটাচলায় ব্যথা বেড়ে যায়। বিশেষ করে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় ব্যথা তীব্র হয়।
পাথর বৃক্ক নালিতে থাকলে কোমরের পশ্চাৎভাগে ব্যথা হয় এবং এ ব্যথা সেখান থেকে কুঁচকিতে ছড়ায়। বৃক্ক নালিতে পাথর নিচের দিকে নেমে যাওয়ার সময় নালিতে সঙ্কোচন হয় ও ব্যথা করে। হাঁটু গেড়ে বসলে ব্যথা বেড়ে যায়।
ব্যথার সময় রোগীর প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যেতে পারে এবং প্রস্রাব ধোঁয়াটে হতে পারে। পাথর বৃক্ক নালিতে আটকে যেতে পারে, তখন মহিলাদের যৌনাঙ্গে ও পুরুষদের লিঙ্গ মুখে অথবা অণ্ডকোষে তীব্র ব্যথা করে। রোগীর প্রস্রাব করতে অসুবিধা হতে পারে, প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যেতে পারে অথবা সামান্য পরিমাণ বা ফোঁটায় ফোঁটায় প্রস্রাব হতে পারে। প্রস্রাব খুব যন্ত্রণাদায়ক হয়।
kidneyরোগ নির্ণয়
* প্রস্রাব পরীক্ষা
*এক্স-রে কে ইউ বি
* আল্ট্রাসনোগ্রাম।
চিকিৎসা
* ব্যথা কমানোর জন্য অ্যান্টিস্পাসমোডিক ওষুধ দেয়া যেতে পারে। হায়োসিন বিউটাইল ব্রোমাইড ১০-২০ মি.গ্রা. দৈনিক তিনবার।
*সাধারণত অপারেশনের মাধ্যমে কিডনি পাথর অপসারণ করা হয়।
* যন্ত্রের সাহায্যেও পাথর অপসারণ করা যায়।
এ পদ্ধতির নাম পারকিউটেনিয়াস লিথোট্রিপসি। অন্য আরেকটি পদ্ধতির নাম এক্সট্রা করপোরিয়েল শক ওয়েভ লিথোট্রিপসি।
আবার পাথর সৃষ্টি প্রতিরোধ
কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিলে আবার কিডনিতে পাথর সৃষ্টি প্রতিরোধ করা সম্ভব।
* প্রচুর পরিমাণে তরল খেতে হবে।
* যেসব অসুখে কিডনিতে পাথর হতে পারে তার চিকিৎসা করতে হবে, যেমন হাইপার প্যারাথাইরয় ডিজম, গাউট, হাইপার ক্যালসেমিয়া সংক্রমণ, সারকয়ডোসিস, অ্যাড্রেনাল ডিসঅর্ডার ইত্যাদি।
* দুধ, পনির ও উচ্চ ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার পরিহার করতে হবে।
* রেডমিট, মাছ প্রভৃতি উচ্চ পিউরিনসমৃদ্ধ খাবার পরিহার করতে হবে।
* সোডিয়াম বাই কার্বোনেট অথবা সাইট্রেট গ্রহণ করতে হবে।
* রুবার্ব বা পীতমূলী, স্ট্রবেরি, পেঁয়াজ, রসুন, টমেটো, স্পিনিজ, আলুবোখারা, অ্যাসপ্যারাগাস প্রভৃতি অক্সালেট সমৃদ্ধ খাবার পরিহার করতে হবে।
(যদি এগুলো খেতেই হয় তা হলে দুধের সঙ্গে খেতে হবে। দুধের সঙ্গে খেলে অক্সালেট ক্যালসিয়ামের সাথে মিলে অদ্রবণীয় লবণ তৈরি করে, যা অন্ত্রে জমা হয় এবং পরিশোষিত হয় না।)
* সালফারসমৃদ্ধ খাবার যেমন ডিম, গোশত বা মাছ সীমিত করতে হবে।
* কার্বোহাইড্রেট ও চর্বি সীমিত করার প্রয়োজন নেই, কারণ এগুলো পাথর তৈরি করে না।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, অর্থোপেডিকস ও ট্রমাটোলজি বিভাগ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল
চেম্বার : পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিঃ, ২ ইংলিশ রোড, ঢাকা।