কিপ অ্যালার্ট, চারু মজুমদার ইজ ডেড

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

‘‘কাল রেডিওতে খবরটা শুনে সারারাত চোখের পাতা এক করতে পারিনি। ছটফট করেছি বিছানায়। মামনকে আজ স্কুলেও নিয়ে যাইনি। দেরিতে উঠলাম তাই। ‘কিপ অ্যালার্ট। চারু মজুমদার ইজ ডেড। উই মাস্ট বি অন দ্য অফেনসিভ’। ওয়্যারলেসের মাধ্যমে গোটা পশ্চিমবাংলার থানায় থানায় মেসেজটা ছড়িয়ে যাচ্ছিল। পত্রিকার পাতায় শিরোনাম।’’

১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই কলকাতার এন্টালী রোডের একটা বাড়ি থেকে গ্রেফতার হন চারু মজুমদার; ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের অবিস্মরণীয় নায়ক। ধরা পড়ার মাত্র ১১ দিনের মাথায় ২৮ জুলাই কলকাতা পুলিশের হেডকোয়ার্টারেই মারা যান চারু মজুমদার।

এই বিপ্লবী মানুষটির স্মৃতি ছড়িয়ে আছে বহু সাধারণ মানুষের মনে। তেমনি একজন মঞ্জুষা, যার স্বামীও সিপিআই (এম-এল) পার্টির একজন কর্মী ছিলেন। ১৯৬৯ সালে চারু মজুমদার কলকাতায় পার্টির একটি গোপন বৈঠকে যোগ দিতে এসে ওঠেন মঞ্জুষাদের বাড়িতে। সেখানেই কিছুদিন আত্মগোপন করে ছিলেন তিনি। মঞ্জুষার অন্তরঙ্গ স্মৃতির আলোয় চারু মজুমদারের সঙ্গে কাটানো কয়েকটি দিন উঠে এসেছে অন্তরঙ্গ চারু মজুমদার বইতে।এখানে তা-ই তুলে ধরা হলো-

‘গত দশ এগারো দিন ধরে প্রতিটি ওঠা-বসা, চলাফের, কাজেকর্মে রায় মশাই অর্থাৎ চারু মজুমদার আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলেন। প্রথম দিন দেখা হওয়ার কথা মনে পড়ে, আমার এক দাদার বাড়ি বসন্ত রায় রোডে। প্রথমে ভয় ভয করছিলো। ছোটখাট, পাতলা রোগা, মাঝারি হাইট। বড় বড় সুন্দর চোখ। একদম পদ্মপলাশলোচন। সে চোখের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলাই ছিলো কঠিন।

কালকেই সব শেষ হয়ে গেছে! বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। যে মানুষটা দীর্ঘদিন এত অসুস্থ শরীর নিয়ে, আণ্ডারগ্রাউণ্ড জীবনের ধকল সয়ে, সারা ভারতের উত্তর থেকে দক্ষিণ চষে বেড়িয়েছেন, আজ তিনি সব সরকারী চিকিৎসার সুযোগ পেয়েও গ্রেফতার হবার মাত্র বারো দিনের মাথায় মারা গেলেন! লীলাদি ওর স্ত্রী দেখে এসেছিলেন, তাঁর হাত-পা ছিলো ভীষণভাবে ফোলা। কেন এত ভয়? কড়া পুলিশ প্রহরায় মৃতদেহের সৎকার হলো, সাংবাদিকের ক্যামেরাও পৌঁছাতে পারেনি সেখানে।’

একদিন বর্ষার সময়। আমার কলেজ তখন বন্ধ। বলতে ভুলে গেছি, আমি তখন পার্ট ওয়ানে পড়ি। কাকাবাবু (চারু মজুমদার) বললেন, ‘আজ সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করার আদর্শ আবহাওয়া।’ এরপর কালিদাসের মেঘদূত থেকে সংস্কৃতে একের পর এক শ্লোক অবিশ্বাস্য দক্ষতায় আবৃত্তি করতে লাগলেন। সেদিনটা আমরাও তাঁর সঙ্গে ঘোরে মেতেছিলাম। সঙ্গীত তিনি ভীষণ ভালোবাসতেন। ক্ল্যাসিকাল সম্বন্ধে বলতেন, ‘জানি যদিও এগুলি সামন্ততান্ত্রিক সংস্কৃতি, তবুও আমি তা ভালোবাসি। সামন্ততন্ত্রের সবই খারাপ নয় কি বলো?’

তাঁর সঙ্গে সম্বল বলতে ছিলো একটা কাপড়ের ঝোলা। তাতে দুটো লুঙ্গি। এক জোড়া শার্ট-প্যান্ট। চা খুব সুন্দর বানাতেন এবং চা খেতেও খুব ভালোবাসতেন। চায়ের পাতা দেখে বলে দিতে পারতেন কিরকম চা।আমায় বলতেন, ‘প্রথমে ফোটা জলে চা করবেন। তার টেস্ট সবচেয়ে ভালো।’ ওনার সৌখিনতার মধ্যে ছিলো টোবাকো মিক্সচার কাগজে পাকিয়ে খাওয়া। পরে পাইপ ধছিলেন। ক্যাপস্টেন মিক্সচারটাই ছিলো তাঁর প্রিয়।

খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতেন চারু মজুমদার। স্নান সেরে আস্তে রেডিও চালিয়ে গান শুনতেন। সাহিত্যের বই পড়তে খুব ভালোবাসতেন। যা পেতেন তাই পড়তেন, অর্থনীতির বই, এমনকি হোমিওপ্যাথির বই পর্যন্ত। সাতদিনের মাথায় কাকাবাবু বললেন এবার যেতে হবে। শুনে আমার খুব কষ্ট হলো। তাতে উনি বললেন, ‘বুঝতেই তো পাচ্ছেন ফেরারী জীবন। কাজে তো যেতেই হবে।’ বিকেলে সরোজবাবু (সরোজ দত্ত) আর সুনীতিবাবু (সুনীতি কুমার ঘোষ) এলেন। যেখানে তাঁর যাবার কথা সেখানে সমস্যা হচ্ছে। তিনদিন বাইরে থেকে আবার ফিরে এলেন।আমি তো বেজায় খুশি। তাঁর সঙ্গে ছিলো হাতে তৈরি একটা রেডিও। যেদিন পিকিং রেডিও থেকে প্রথম সিপিআই (এম-এল) কে স্বীকৃতি দিলো সেদিন কাকাবাবুর শরীর ভীষণ খারাপ। টলতে টলতে বেসিনে মুখ রাখলেন। রক্তবমি করলেন। কী ওষুধ দেবো? ওনার কার্ডিয়াক অ্যাজমা ছিলো তা থেকে রক্তবমি হতো।

ওনার ঘরে একটা সিঙ্গল খাট ছিলো। ওখানে বসেই আমার ছেলে মামনকে রূপকথার গল্প শোনাতেন। দু’জনে মিলে কাগজের খেলনা বানাতেন। জাহাজ তৈরি করে দিতেন কাগজের। মামনের সঙ্গে উনি রান্নাবাটি খেলাও খেলতেন। এত স্নেহপ্রবণ মানুষ আমি জীবনে আর একজনও দেখেনি।

দু’টো ঘটনার কথা বলি। একদিন বাড়িতে একটা হুলো বেড়াল ঢুকেছে। বাড়িটা পাইপের তৈরি রেলিং দিয়ে ঘেরা।সঙ্গে জাল দিয়ে ঘেরা। বেড়ালটা বের হতে পারছে না।আমরা হুটহাট বলে বেড়াল তাড়াবার চেষ্টা করছি। বেড়ালটা বেরুলো না তাতেও। ঘরের একটা কোনে যখন গেছে কাকাবাবু খপ করে ধরে বেড়ালটাকে বাইরে বার করে দিলেন। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে সেদিন তাঁর হাত কেটে গিয়েছিলো।

আরেকদিন ঘরে একটা কাচের গ্লাস ভেঙ্গে গেছে। কাচের টুকরো ঘরময় ছড়িয়ে পড়েছে। কাকাবাবু খুঁখুঁত করছেন, ‘এখানে টুকরো আছে, ওখানে আছে। আপনারা চটি পড়ে হাঁটুন। মামনকে চটি পরিয়ে দিন।’ এরপর উনি নিজে পায়ের চটিটা খুলে বললেন, ‘পাওনিয়ার হাঁটাটা আমি-ই হেঁটে দিই। সাবধান হওয়া ভালো, বেশি সাবধানী হওয়া ভালো না।’

একজন বিখ্যাত হার্ট সার্জনের কথা বলছি। যার নাম উল্লেখ করছি না। তিনি রাজনীতির ধারে পাশেও ছিলেন না। ১৯৭২ সালে পিজি হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কাকাবাবুর জন্য আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে দুটো ঘর দেয়াল তুলে আলাদা করা হয়। বারান্দা ঘিরে দেয়া হয় ঘন জাল দিয়ে। যাতে বাইরে থেকে কেউ দেখতে না পায়। কিন্তু সেই সেলে তিনি আর যান নি। তাঁর আগে তিনি মর্গে চালান হয়ে গেছেন। কাছাকাছি কেউ কোথাও নেই দেখে সেই ডাক্তারবাবু সেদিন মর্গে ঢুকে পড়লেন। মর্গে ঢুকে দেখেন সম্পূর্ণ বডিটা ছিন্নভিন্ন। মুখ চোখ ফোলা। অত্যাচারের চিহ্ন সারা দেহে।

কাকাবাবু রবীন্দ্রনাথের কবিতার ভক্ত ছিলেন। আবৃত্তি করতেন। একদিন ‘মৃত্যুঞ্জয়’ কবিতাকে থেকে আবৃত্তি করলেন।-

যত বড় হও

তুমি তো মৃত্যুর চেয়ে বড় নও

‘আমি মৃত্যুর চেয়ে বড়’ এই শেষ কথা বলে

যাব আমি চলে।

অণুলিখনঃ ইরাজ আহমেদ

তথ্যসূত্রঃ অন্তরঙ্গ চারু মজুমদার গ্রন্থ

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]