কী আছে সেই বইটিতে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জুল ভার্ন উপন্যাসটি লিখেছিলেন ১৮৬৩ সালে, প্যারিস ইন দ্য টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি’। তখন কী এক কারণে উপন্যাসটি ছেপে বের হয়নি। সেই উপন্যাস আলোর মুখ দেখে ১৯৯৪ সালে। বই প্রকাশের পর সারা বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয় কারণ ভার্ন কল্পনায় যে আধুনিক প্যরিসকে দেখিয়েছিলেন তার সঙ্গে ‘টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি’র প্যারিসের অজস্র মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

জুল ভার্ন মারা যান ১৯০৫ সালে। তাঁর মৃত্যুর পর বাবার কিছু অপ্রকাশিত লেখা প্রকাশের ব্যবস্থা করেন ছেলে মিশেল ভার্ন। কিন্তু তখনও ‘প্যারিস ইন দ্য টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি’ থেকে গেলো বাক্সবন্দী। এক সময় স্মৃতির অতলে হারিয়ে যার ‘প্যারিস ইন টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি’। বেশ অনেকটা সময় পর জুলভার্নের চতুর্থ প্রজন্মের উত্তরাধিকারী জিন জুলভার্নের হাতে আসে ধুলো জমা তালাবন্ধ ব্রোঞ্জের একটি বাক্স। সেই বাক্স তাদের বংশ পরম্পরায় এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মের হাতে গেলেও কেউই সেটা খুলে দেখার চেষ্টা করেননি। পুরনো মরচে পড়া বাক্সে যে মূল্যবান কিছু থাকতে পারে সেটাও কেউ আন্দাজ করেননি। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই জিনের সেই বাক্সটির প্রতি ভীষণ আগ্রহ ছিলো। ছোট্ট জিন মনে মনে ভাবত- সেই বাক্সে ভরা আছে তার অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় প্রপিতামহ জুলভার্নের সংগ্রহ করা অমূল্য সব অলংকার আর দুষ্প্রাপ্য নানান জিনিস। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই বন্ধ বাক্সের প্রতি জিনের আগ্রহ বাড়তে থাকে। অবশেষে একদিন পারিবারিক মালিকানার সূত্র ধরে ওই বাক্স খোলার অধিকার পেয়ে গেলেন জিন। সেদিন আর দেরি না করে তালা খোলার লোক ডেকে ব্রোঞ্জের সেই ‘রহস্যময় বাক্স’ খুলে ফেললেন। বাক্সের ভেতর পাওয়া গেলো না সোনাদানা আর দুষ্প্রাপ্য কিছু। জিন হতাশ হলেন। তারপর বাক্সটি হাতড়াতে গিয়ে তিনি খুঁজে পেলেন জুলভার্নের লেখা কিছু অসম্পূর্ণ নাটকের অংশ, রাশিয়ান ভাষায় লেখা কিছু কাগজ আর বহু বছরের ধুলো পড়ে যাওয়া ‘প্যারিস ইন দ্য টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি’ উপন্যাসটির মূল পাণ্ডুলিপি! প্রশ্ন জাগে, এতবছর ধরে কেনো বাক্সে আটকে ছিল এই উপন্যাস?

জুল ভার্ন

ভার্ন কল্পনার যাদুকর ছিলেন। যার সূত্রপাত সেই ছোটবেলায়। জাহাজের কেবিন-বয়ের চাকরি নিয়ে ১১ বছরের জুল ভার্ন গোপনে বাড়ি ছেড়ে ইন্ডিজ পালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। বিদেশ ভ্রমণ করা ছাড়াও তাঁর উদ্দেশ্য ছিলো ইন্ডিজ থেকে একটি প্রবালের কন্ঠহার এনে জ্ঞাতি বোন ক্যারোলিনকে উপহার দেবেন কিন্তু পালানোর সময় বন্দরে পৌঁছে যান তাঁর বাবা। ব্যাস! ভার্নের আর পালানো হলো না। বাবার  কাছে ধরা পড়ে তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন ‘শুধুমাত্র কল্পনার রাজ্যে’ তিনি ভ্রমণ করবেন। জীবনে করেওছিলেন তাই। ভার্নের লেখা প্রথম উপন্যাস ‘ফাইভ উইকস ইন এ বেলুন’। এই গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি পড়ে বহু প্রকাশকই অবাস্তব বলে এই লেখা প্রথমে ছাপতে চান নি। শোনা যায় ভার্ন ওই পাণ্ডুলিপি নাকি পুড়িয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন। বাধা দিয়েছিলেন স্ত্রী। শেষে নাকচ হওয়া সেই পাণ্ডুলিপিকে বইয়ের আকার দেন সেযুগের বিখ্যাত প্রকাশক প্যিয়ের-জুল হেটজেল। এই হেটজেলকেই ‘গুরু’ বলে মানতেন ভার্ন। ভার্নের একাধিক বিখ্যাত বই ছেপেছিলেন হেটজেল। ১৮৬৩ সালে ভার্ন লেখেন ‘প্যারিস ইন টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি’। ভার্ন হেটজেলকে ‘প্যারিস ইন টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি’ পড়তে দেন। পাণ্ডুলিপি পড়ার পর হেটজেল ভার্নকে বলেন- ‘আপনার মতো একজন উঠতি জনপ্রিয় লেখকের এ ধরনের অবাস্তব ভবিষ্যৎ নিয়ে লেখা মোটেই উচিত নয়। আপনার কাছ থেকে পাঠক মহাকাব্যিক কিছু আশা না করলেও এর থেকে ভালো লেখা অবশ্যই আশা করেন।’ গুরুর নির্দেশকে মেনে নেন ভার্ন। ‘প্যারিস ইন দ্য টুয়েন্টিন্থ সেঞ্চুরি’ অপ্রকাশিত অবস্থায় বাক্সবন্দী হয়েই থেকে যায়।

কি আছে এই উপন্যাসে? এই কাহিনির মূল চরিত্র মিশেল ডুফ্রেনয় নামে এক কিশোর। তাঁর চোখে প্যারিস নগরীর চিত্র আর তাঁর জীবনে ঘটতে থাকা নানা ঘটনাকে দেখিয়েছেন লেখক। কিন্তু এই কাহিনির মজা হলো টুয়েন্টিন্থ সেঞ্চুরিতে প্যারিসে কি কি হতে পারে তার একটা কল্পনা। লেখক লিখছেন রাস্তায় ভিড় করে চলতে থাকা আধুনিক সব গাড়ি চলছে গ্যাস ইঞ্জিনের সাহায্যে যার নাম ‘গ্যাস ক্যাব’। আছে শপিং মল, সুড়ঙ্গ পথে চলা রেলগাড়ি বা মেট্রোর কথা। ভার্নের সেসব কল্পনা সেযুগে কল্পনা কিম্বা অবিশ্বাস্য হলেও আজ কিন্তু বাস্তব। ভার্ন সেখানে লিখছেন শিল্প-সাহিত্যের মূল্য নেমে এসেছে প্রায় শূন্যের কোঠায়। যেখানে শিক্ষিত হয় সবাই কিন্তু বই পড়তে কারো কোনো আগ্রহ নেই। ল্যাটিন আর গ্রিকের মতো প্রাচীন ভাষা আর শেখানো হয় না সেই আধুনিক প্যারিসে। ভার্ন কীভাবে একশো বছর আগে এতো নিখুঁত ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা লিখলেন তাই নিয়ে শুরু হলো বিবাদ। একদল বললেন, জুলভার্ন তাঁর প্রিয় লেখক অ্যাডগার অ্যালান পো’র জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এই উপন্যাস লিখেছিলেন। কঠোর বাস্তবের মুখোমুখি হওয়া এক পরাজিত মানুষের করুণ পরিণতির গল্প বলে ‘প্যারিস ইন দ্য টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি’ আর কল্পনাপ্রবণ ভার্নের কল্পনাগুলি নিছক কাকতালীয় । আবার একদল বললেন, লেখাটি আসলে জুলভার্নের নয় লেখাটি তাঁর ছেলে মিশেল জুলভার্নের । আর এই সংশয় দূর করতে প্যারিসে গঠিত হল বিশেষজ্ঞ কমিটি। যারা ‘প্যারিস ইন দ্য টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি’র পাণ্ডুলিপির লেখার সঙ্গে জুলভার্নের ও ভার্নের ছেলের হাতের লেখা মিলিয়ে দেখেন। এমনকি পাণ্ডুলিপি লেখার কাগজ আর লেখার কালি অবধি খতিয়ে দেখা হয়। সব শেষে বিশেষজ্ঞ দল সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল এই উপন্যাস জুলভার্নেরই লেখা।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ এই সময়, কলকাতা
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]