কী ছিল লেনিনের মগজে

সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েট রাশিয়ার নায়ক ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের লেখা আর মতাদর্শ নিয়ে দুনিয়া জুড়ে বিস্তর বিচার বিশ্লেষণ হয়েছে। কিন্তু তার মস্তিষ্ক বিশেষ করে ব্রেন নিয়ে গবেষণা! এতো রীতিমতো চমকে ওঠার মতো ব্যাপার। কিন্তু ইতিহাস ঘেটে এর সত্যতা মিলেছে। স্তালিনের আমলে রুশ বিজ্ঞানীরা নেড়ে ঘেটে দেখার চেষ্টা করেছিলেন এই রাজনীতিবিদের ব্রেন। গবেষণার ফলাফলে লেনিনের মস্তিষ্কের তুলনা করা হয়েছিল কিছু অপরাধী ও আরও নানা রকম লোকের মস্তিষ্কের সঙ্গে। গবেষকদের বক্তব্য ছিল, জিনিয়াস লোকেরা বিশ্লেষণের জন্য অতিকায় কৌণিক এক রকম কোষ ব্যবহার করে থাকেন।lenin1905
এই গবেষণার সূচনা হয়েছিল ‘লেনিন ইনস্টিটিউটে’। যেখানে রাখা হয়েছিল লেনিনের সব লেখার পাণ্ডুলিপি, আর ফর্মাল ডিহাইড-এ  সংরক্ষিত করা হয়েছিল তাঁর ব্রেন। সংস্থার ডিরেক্টর ছিলেন ইভান তোভস্টুকা, স্তালিনের প্রাইভেট সেক্রেটারি। তিনি, আর ওই সংস্থার ডেপুটি ডিরেক্টর সিমাসকো মিলে, লেনিনের ব্রেন নিয়ে গবেষণার ভার দিতে চাইলেন বার্লিনের প্রফেসর অস্কার ভহট-কে। তিনি কাইজার উইলহেল্‌ম ইনস্টিটিউটে কাজ করতেন। সে সময় ব্রেন নিয়ে গবেষণায় তাঁর ছিল খ্যাতি বিশ্ব জোড়া।
গবেষক ভহট বললেন, এই গবেষণা করতে হবে তাঁর ইনস্টিটিউটেই, আর তা করতে হবে তাড়াতাড়ি। কিন্তু লেনিনের ব্রেন দেশের বাইরে চলে যাবে? পলিটব্যুরো রাজি হলো না। তাঁরা বললেন, ভহট গবেষণা করুন, আপত্তি নেই, কিন্তু তা করতে হবে মস্কোতে বসেই। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯২৫, এক মধ্যপন্থা আবিষ্কার করলেন সিমাসকো। তিনি জানালেন, ‘…গোটা মস্তিষ্ক নয়, এক খণ্ডাংশ পাঠানো হোক প্রফেসর ভহটের কাছে, তিনি যদি রিসার্চে কিছু দূর এগোতে পারেন, আরও অংশ পাঠানো হবে।’ এ প্রস্তাব পলিটব্যুরোতে সে দিনই পাশ হয়ে গেল। অবশ্য ভহট ওই একটি অংশই পেয়েছিলেন, আর কোনও দিন কোনও অংশ তাঁর কাছে পাঠানো হয়নি।
সেই গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়েছিল, লেনিনের ব্রেনে পাওয়া গিয়েছে অসাধারণ শৃঙ্খলা, যার ফলে তাঁর মধ্যে এসেছিল অতি উঁচু মানের যুক্তিবোধ ও দূরদর্শিতা। সেরিব্রাল করটেক্সে অতি মাত্রায় উপস্থিত অতিকায় কৌণিক কোষের কথাও বলা হল। আর বলা হল, গোটা ব্রেনের অনুপাতে টেম্পোরাল লোব অনেক বড়। এমনকী মায়াকভস্কি বা বগদানভকেও টেক্কা দিয়েছেন লেনিন।
আবার পেছনের কাহিনিতে ফেরা যাক। ২২ মে ১৯২৫, ভহটের জন্য চুক্তিপত্র তৈরি হয়। ঠিক হয়,ভহট যখন কাজ করবেন, তাঁর সহকারী থাকবেন দুজন রুশ চিকিৎসক। বার্লিনে শুরু হল তাঁর গবেষণা। এ দিকে ভহটের নির্দেশে মস্কোতে বসে আর এক খণ্ডাংশ নিয়ে গবেষণা করছেন এক জার্মান বিজ্ঞানী। কাজেই একই মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণা চললো বার্লিনে ও মস্কোয়!got-rope
১৯২৪ সালের ২১ জানুয়ারি, মাত্র ৫৪ বছর বয়সে এক মারাত্মক স্ট্রোকে মৃত্যুবরণ করেন লেনিন। এটি ছিল চতুর্থ স্ট্রোক। বিপ্লবের পরে পরেই, ১৯১৮ সালের ৩০ অগস্ট, এক ফ্যাক্টরি থেকে বেরোবার সময় খুব অল্প দূরত্বে পর পর তিন বার তাঁকে গুলি করেন আটাশ বছর বয়সি ফ্যানি কাপলান। দুটি গুলিতে গুরুতর জখম হন লেনিন। কাপলানের বক্তব্য ছিল, ‘লেনিন হলেন প্রকৃত বিপ্লবের শত্রু।’ পুলিশ কাপলানের কাছ থেকে কোনও তথ্যই বার করতে পারে নি। ক’দিন পরেই, ৩ সেপ্টেম্বর, তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। ডাক্তাররা কিন্তু লেনিনের শরীর থেকে বুলেট দুটি বের করতে পারে নি। ১৯২১-এর শেষ দিকে, খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন লেনিন। শোনা যায়, এই সময় তিনি স্ত্রী ক্রুপস্কায়া এবং স্তালিনের কাছে পটাশিয়াম সায়ানাইড চেয়েছিলেন। কিছু ডাক্তারের মত ছিল, তাঁর শরীরে গেঁথে থাকা বুলেটগুলোই তাঁর অসুস্থতার কারণ। ১৯২২-এ আবার অপারেশন হল, গুলি বের করার জন্য। সে বছরই হল প্রথম স্ট্রোক, যার ফলে সাময়িক ভাবে কথা বলার শক্তি হারালেন তিনি। আর শরীরের ডান দিক হল পক্ষাঘাতগ্রস্ত। এর পরেই ক্ষমতার দখল নিলেন স্তালিন।
লেনিনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে বলা হয়, শিরা-উপশিরার কঠিন দুরারোগ্য অসুখ। শরীরের ময়না তদন্ত করা হল। যে ডাক্তাররা তা করছিলেন, তাঁদেরই কারও মাথায় ব্রেন নিয়ে গবেষণার বিষয়টা আসে।
একটা বিষয় নিয়ে স্তালিনের দুশ্চিন্তা ছিল। সেই সময় অনেকগুলো আন্তর্জাতিক মানের বৈজ্ঞানিক পত্রিকায় নিয়মিত প্রবন্ধ লিখতেন ভহট। এগুলো তো স্তালিনের সেন্সরশিপ আইনের আওতার বাইরে। কোনও জার্নালে যদি ভহট অস্বস্তিকর কিছু লিখে বসেন, তা হলে মুশকিল। এ দিকে আবার এই গবেষণায় রাজি করানোর জন্য ভহটকে দিতে হয়েছে মস্কো ইনস্টিটিউটের অধিকর্তার পদ। ইতিমধ্যে প্রায় তিন বছর কেটে গিয়েছে। রাশিয়ার বিজ্ঞানী মহলে খুব ক্ষোভও জমেছে, নিজের দেশের বিজ্ঞানীদের উপেক্ষা করে এক বিদেশিকে এই কাজ দেওয়া হল! তার ওপর আবার ভহট এত দিনেও কোনও রিপোর্টই পেশ করেননি। এ দিকে লামকিন নামে এক মিলিটারি কমিসার একটি রিপোর্ট দিয়েছেন, যাতে স্পষ্টতই ভহটের কাজ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে।96106-004-41cce366
স্তালিন কিন্তু ধৈর্য হারালেন না। লামকিনের রিপোর্ট ফাইলবন্দি করে রাখেন তিনি। তবে খুব আস্তে আস্তে শুরু করেন একটা প্রক্রিয়া। লেনিনের মস্তিষ্কের গবেষণার এই প্রকল্পে নিজের খুব কাছের মানুষদেরই নিয়ে আসেন। ১৯৩২ সালে মলোটভকে করলেন পলিটব্যুরোর তরফ থেকে এই প্রকল্পের পর্যবেক্ষক। ক্রেমলিনের সুরক্ষার ভার যাঁর ওপর, সেই ইনুকিদজেকে দেওয়া হল লেনিনের ব্রেনের রক্ষণাবেক্ষণের ভার। আর এই বার তথ্য ও সম্প্রচার দফতরের প্রধান স্টেটস্কি নতুন করে আক্রমণ শানালেন প্রফেসর ভহটের ওপর। তার নিজের ভাষায় ‘… ভহট লেনিনের মস্তিষ্কের তুলনা করছেন কিছু অপরাধী ও আরও নানা রকম লোকের মস্তিষ্কের সঙ্গে। ওঁর একটা থিয়োরি হল, জিনিয়াস লোকেরা বিশ্লেষণের জন্য অতিকায় কৌণিক এক রকম কোষ ব্যবহার করে থাকেন।’
লেনিনের মস্তিষ্কে এই ধরনের কোষ খুব বেশি পাওয়া গিয়েছিল। এ দিকে, জার্মানির বিখ্যাত অধ্যাপক-গবেষক স্পিলমার তাঁর ‘মনোরোগ অভিধান’-এ লিখেছেন, এ রকম কোষ যেমন জিনিয়াসদের মাথায় অতি মাত্রায় থাকে, তেমনই থাকতে পারে মনোরোগীদের মাথাতেও।
রাশিয়ার পলিটব্যুরো সিদ্ধান্ত নিল লেনিনের ব্রেন নিয়ে সব গবেষণা হবে মস্কোতেই, তার জন্য তৈরি হবে এক ‘ব্রেন ইন্সটিটিউট’, আর ভহট-কে আমন্ত্রণ জানানো হবে সে ইন্সটিটিউটের ডিরেক্টর হিসেবে কাজ চালানোর জন্য।
কিন্তু তার আগেই ‘ভাল খবর’ এল স্তালিনের কাছে। নিজের দেশে ঝামেলায় পড়েছেন ভহট। উইলহেল্ ইন্সটিটিউটের চাকরি গিয়েছে। এবং তাঁকে অল্প সময়ের জন্য হলেও বাধ্যতামূলক ভাবে সেনাবাহিনীতে ভর্তি করা হয়েছে। তখন ভহটকে এই প্রকল্প থেকে বাদ দিতে কোনও অসুবিধে থাকল না। আইন মোতাবেক ভহট মস্কোতে যেতেও পারবেন না। আর ভহট নিজেই এক রকম নিষ্কৃতি চাইলেন।
তিনি বললেন, মস্কো ব্রেন ইন্সটিটিউট নিজেরাই স্বচ্ছন্দে কাজ চালিয়ে যেতে পারবে। ইতিমধ্যেই তাদের সংগ্রহে এসে গিয়েছে লুনাচারস্কি, বগদানভ, মায়াকভস্কির মতো বড় বড় মানুষের ব্রেন। এঁদের মতো মানুষের মস্তিষ্কের সঙ্গেই লেনিনের মস্তিষ্কের তুলনা করা দরকার।
এর চার বছর পর, ২৭ মে ১৯৩৬, পলিটব্যুরোতে পেশ করা হল লেনিনের ব্রেন নিয়ে দশ পাতার রিপোর্ট। মূল গবেষণা শুরু হওয়ার ১১ বছর পর। মূল রিপোর্ট ১৫৩ পাতার, তার সঙ্গে ১৫টা অ্যালবাম। তাতে তিরিশ হাজারের বেশি স্লাইডের ছবি। লেনিনের ব্রেনকে তুলনা করা হয়েছে পাভলভ, মায়াকভস্কি, লুনাচারস্কি-র পাশাপাশি সাধারণ কিছু মানুষের ব্রেনের সঙ্গেও। নোবেল প্রাইজ প্রাপক পাভলভ মারা যান ১৯৩৬-এই, আর তাঁর ব্রেনের সঙ্গে তুলনাটাই শেষ পরীক্ষা।
কিন্তু এত কাণ্ড করে যে ফল পাওয়া গেল, তা কিন্তু রয়ে গেল সরকারি আর্কাইভেই। সাধারণ মানুষের সামনে আনা হল না। তাঁরা এ সব জানতে পারেন ইয়েলৎসিনের জমানায়।

নয়ন চৌধুরী
তথ্যসূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা
ছবিঃ গুগল