কুইন অফ আমেরিকান লেকে একদিন…

স্মৃতি সাহা

দিনটি সাধারণই ছিল। খুব সাধারণ একটি হলি ডে। বসন্তের আমেজ ফুরিয়ে গ্রীষ্ম কেবল আসি আসি করছিলো। ঠিক তখনি নিউইয়র্কের ঝকঝকে আকাশে মেঘের আনাগোনা। আর তা জল হয়ে অবিরাম ঝরছিলো দু’দিন ধরে। তাই “মেমোরিয়াল ডে” ছুটি মিলিয়ে লং উইকেণ্ড টা খুব আটপৌরে হয়ে যাচ্ছিলো। শীতপ্রধান এই নগরীতে বসন্তের মাঝামাঝি আসতেই শুরু হয়ে যায় আউটডোরিং। যে কোন উইকেণ্ড বা হলি ডে তে পার্কগুলো বাচ্চাদের হুটোপুটিতে মূখর হয়ে ওঠে। আর একটু লম্বা ছুটি পেলেই সবাই এই শহরকে পিছনে ফেলে ছোটে আশেপাশের নিরিবিলি সব ভেকেশন স্পটে। সেদিন সকাল থেকেই থেমে থেমে বৃষ্টির তোড় খুব যত্ন করে আলস্য ছড়িয়ে দিয়েছিলো নগরময়। জানালার শার্সিতে জলের গ্রাফিতি দেখছিলাম আমি। সঙ্গে চলছিলো কফি বিনের কড়া সুগন্ধ ছড়ানো কাপে একটি দু’টি ছোট চুমুক। ব্যস্ত এই নগরী লম্বা ছুটির ফাঁদে পড়ে বেশ শান্ত। রাস্তাগুলোয় পথিকের সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির সংখ্যাও বেশ কম। এরকম ট্রাফিক বিহীন রাস্তা হঠাৎ যেন হাতছানি দিয়ে ডাকলো আমায়; পথে নেমে পথিক হবার। আর এ ডাক উপেক্ষা করার বোকামি আমি করলাম না। ঝটপট গুগল করে নির্ধারণ করে নিলাম গন্তব্য। এরপর কিছু স্ন্যাক্স নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম হলি ডে-র সর্বোত্তম ব্যবহার করতে। গন্তব্য এবার লেক জর্জ। যাকে আদর করে বলা হয় ” কুইন অফ আমেরিকান লেক।” দৈর্ঘ্য আর প্রস্থে সুবিশাল এই লেকটির মূল আকর্ষণ এর নীল জলরাশি। শহরের দক্ষিণে অবস্থিত এই লেক হাডসন রিভার আর লরেন্স রিভারের মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চলেছে। প্রায় ঘন্টাখানেক ট্রাফিক বিহীন এক্সপ্রেস ওয়েতে বিরতিযুক্ত ড্রাইভ করে আমরা পৌছে গেলাম নিউইয়র্ক শহর ছাড়িয়ে এজেক্স কাউন্টিতে অবস্থিত এই লেকে। প্রায় ৩২ মাইল লম্বা এই সুবিশাল লেকের সামনে যখন আমি দাঁড়িয়ে তখন ভাটা চলছে। ৩ মাইল প্রশস্ত লেকের জলরাশি আর ওপ্রান্তে সবুজ পাহার তখন কিছুটা ঘোলাটে কারণ বৃষ্টি থেমে গেলেও মেঘের আনাগোনা তখনো চলছিল আকাশ জুড়ে। নীল আকাশ পেলে তবেই না জলে নীল আলো ছড়াবে। আমরা অপেক্ষায় মেঘমুক্ত আকাশ আর জোয়ায়ের। ওয়েদার চ্যানেলগুলোর রিপোর্টে বলা ছিল বারবেলায় সব মেঘ কেটে গিয়ে আকাশ হেসে উঠবে আর এরপরেই আসবে জোয়ার। জোয়ারের সময় নাকি এই লেকের কুলকুল বয়ে যাওয়া জলরাশি সুরে সুরে নেচে ওঠে। ছোট ছোট ঢেউ পা ভিজিয়ে দিয়েই পালিয়ে যায়। আমরা যাবার কিছু পরেই আশেপাশের ফাঁকা জায়গা গুলো ভরে উঠলো মানুষ আর মাংস পোড়াবার যন্ত্রে। রোদে নিজেদের চামরা ট্যান করে আগুনে ঝলসানো মাংস আর সবজি দিয়ে মধাহ্নভোজ আমেরিকানদের খুব পছন্দ। লেকের পাশ ধরে পাথর আর সিমেন্টের বাঁধানো লম্বা দেঁয়াল।

তারপাশে সবুজ ঘাসের গালিচা। সেই গালিচার মাঝে মাঝে ওক, পাইন, চেরির অজস্র গাছ। অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই বাতাসে নিচুস্বরের মিউজিক আর পোড়া মাংসের সুগন্ধ ছড়িয়ে জানান দিলো আজ হলি ডে। আমেরিকার হলিডে গুলোর খুব সুপরিচিত ছবি এটি। আস্তে আস্তে মেঘ কেটে রোদে ঝলমল করে উঠলো আকাশ। আরোও কিছু সময় প্রতিক্ষার পর এলো সেই বহু প্রতিক্ষিত জোয়ার। জোয়ারের জলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তীর ঘেঁষে বেঁধে রাখা স্পিড বোটগুলো ঢেউয়ের তালে নাচতে শুরু করলো। আমি তখনো প্রতিক্ষায় কখন সেই নীল জলের এক একটি ছোট ঢেউ আমার কাছে আসবে। এরপরেই বেড়ে গেলো জলের তোড়। যে লেক আমার থেকে বেশ দূরে ছিল তা খুব সন্নিকটে চলে এলো। আর তার হাত ধরে এলো ফেনিল ঢেউ। আমি সেই জলে পা ভিজিয়ে মুগ্ধ চোখে দেখছিলাম ওপাশের পান্না সবুজ পাহাড় টাকে। নীল জলের বুকচিরে দাঁড়িয়ে থাকা সবুজ পাহাড় টাকে মনে হচ্ছিল এই বিশাল লেকের প্রণয়িনী। জলের ছোঁয়ায় তার লাস্যতা থেকে চোখ ফেরানো দায়। তবুও ফেরাতে হয়। ততক্ষণে বেলা প্রায় গড়িয়ে গেছে। আশেপাশের ছোট ছোট দলগুলো তল্পিতল্পা গুছিয়ে নিয়েছে। বাতাসে তখন সুরের আনাগোনা কমে এসেছে। এবার ঘরে ফেরার পালা। লম্বা উইকেন্ড শেষে কাল থেকে আবার অফিস, স্কুল শুরু হবে। সকলেই ফিরছে প্রায় বেলা থাকতেই কারণ ঘরে ফিরে কালকের দিনের প্রস্তুতি নেবার সময় খুব কম তখন হাতে। আমরাও ফেরার পথ ধরলাম। দু’পাশে ছোট ছোট পাহাড় আর অল্প জনবসতির এজেক্স কাউন্টি ছেড়ে যখন আমরা ঘরমুখো তখন আমার কানে বাজছে জলের গান । জলমগ্ন আমি ফিসিফিসিয়ে বলি, ‘আবার আসবো আমি এই নীল জলের গানে মগ্ন হতে।’

ছবি: লেখক