কুড়িয়ে পাওয়া ও গুছিয়ে রাখা মণিমুক্তা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকনকচাঁপা কচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

 জন্ম থেকেই আমি অনেক কিছু,অনেক কিছু মানে বলা যায় স্মৃতিতে যা ধরে সবই আরও সুক্ষ্ণভাবে স্মরণে রেখেছি।ওস্তাদজী এবং আব্বা শুধু আমাকে গান শেখান নাই।তারা শিখিয়েছিলেন কিভাবে গান গাইতে হয়! কিভাবে শব্দের শেষের “য়” “ই” উচ্চারণ করতে হয়।”ড়” গানে কতটুকু গভীরতা নিয়ে গাইবো। বলাই বাহুল্য শব্দ প্রক্ষেপণ প্রক্ষালন ফেড ইন ফেড আউট কারুকার্যের মাত্রা, আরও না বলা অনেক কিছুই আমি দু’জনের কাছে শিখেছিলাম। এফ ইউ এল এল ফুল আর  পি এইচ ইউ এল ফুলের উচ্চারণে কি তফাৎ এগুলো কাঁটাকম্পাস নিয়ে আব্বা ও ওস্তাদজী আমাকে শিখিয়েছিলেন।হিন্দি উচ্চারণে, উর্দু উচ্চারণে কত কিছু যে শেখার আছে তা আমি নিজের ভাষা শিখতে শিখতেই পাশাপাশি শিখেছি। সেগুলো আমাকে ছবির গান গাইতে সাহায্য করেছে। আমার হাতের মুঠোয় যে মুক্তো ওস্তাদজী এবং আব্বা উপহার হিসেবে পুরে দিয়েছিলেন তা আমি স্মৃতির মনিকোঠায় সযত্নে রেখেছি এবং আমার পেশাদার জীবনে খুব স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবহার করেছি।
যখনকার কথা বলছি তখন আমার পঁচিশ ছাব্বিশ বছর।  অনেক ধৈর্য ধরার পর খুলে যাওয়া কপালে যেন পুবালী বাতাসের ছোঁয়া লেগেছে। একের পর এক বড় বড় ডিরেক্টর প্রডিউসার এর ছবির গান গাচ্ছি।বলা যায় দিনরাত গাইছি আর গাইছি।একমাত্র শ্রদ্ধেয় সুরকার সংগীত পরিচালক আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ভাই আমাকে বলে কয়ে পরীক্ষা নেন নাই।বাকি সবাই তখনও নির্ভরশীল নির্ভর যোগ্য বলে মানতে রাজি নন।নিজেরাই ডাকছেন কিন্তু ভাবখানা এমন যে গানের একবিন্দু এদিক ওদিক হলেই আমাকে বাদ দেবেন। গান যে সবার অনেক অনেক সুন্দর তা নয় কিন্তু! কত শোনার অযোগ্য গান আমি গেয়েছি। কিন্তু আমি আসলেই পরীক্ষা দিয়েছি।খারাপ গান গাইতেও শক্তি লাগে।হয়তো এমন হাস্যকর লজ্জাজনক কথা, হয়তো নকল সুর, ফালতু মিউজিক, তবুও আমি বিসিএস পরীক্ষার মত করে নিষ্ঠার সঙ্গে গেয়েছি।আমাকে সাহস সান্ত্বনা জুগিয়েছেন আমার স্বামী। কিন্তু আমি মাঝেমধ্যে শারীরিক ভাবে দূর্বল হয়ে যাচ্ছিলাম। প্লেব্যাক এর মাইক্রোফোন ভয়ংকর শার্প একটা ব্যাপার। হয়তো আমার সর্দি লাগা লাগা ভাব, মাইক্রোফোনে ঠিকই ধরা পড়লো। হয়তো তিনদিন পর জ্বর আসবে, অথচ মাইক্রোফোন জেনে গেলো।এভাবে প্রায় দিনই আমার দূর্বলতা ছাপ রেখে যাচ্ছিলো। অথচ আমি গলা সাধি নিয়মিত!

একদিন আমার কো-আর্টিস্ট ( পড়ুন উনারই কোআর্টিস্ট আমি) কন্ঠরাজ এন্ড্র‍্যুকিশোর আমার রোজনামচা শুনতে চাইলেন। বললাম সব খুলে। কতক্ষণ রেয়াজ করি কখন ঘুমাই কখন জাগি সংসারে কতগুলো কাপড় কাচি মশলা বাটি মেহমানদারি করি।কিশোর’দা খুবই কনসিডারেবল একজন মানুষ। বলা যায় অদ্ভুত রকম কনসিডারেবল।কোন পরিস্থিতিকেই উনি প্রতিকূল বলতে রাজি নন।আমার কোনো কাজ করার হিসাব উনি বাড়তি বলে ধরলেন না।শুধু বললেন কনক, সংসার করছো, স্বামী, দুই সন্তান, পড়া স্কুল, মেহমান সব করতে হবে।কিন্তু মনে রেখো তুমি একজন শিল্পী। যার উপর অনেক মানুষ নির্ভর করছে।তোমাকে অনেক শক্তিশালী হতে হবে।সিংহের মতো শক্তিশালী। কিন্তু কিভাবে? আমার সবসময় ব্লাড প্রেশার লো থাকে, অ্যানিমিয়ার মতো আছে হিমোগ্লোবিন কম,তাইলে? উনি বললেন এইটাই ঠিক করতে হবে।কিভাবে কিশোর’দা? উনি বললেন শোন, তুমি তোমার ভাতের পাতে দু’মুঠো ভাত বাড়াও আর যে কোন রকম কচু রাখো লেবু সহ।যে কোনরকম কচু যখন যা পাও।আর রেকর্ডিং এ আসার ঠিক আগে একমুঠ ভাত মুখে দিয়ে আসবে। আমি, আমরা চমৎকৃত হয়ে গেলাম এবং দেখলাম ওনার এই ছোট টিপসটি আসলে অমূল্য। সত্যিই এই পদ্ধতি কাজ করা শুরু করলো। আমার আর গাইতে গিয়ে শক্তির অভাব হচ্ছিলো না!
আমি এটাই বলতে চাইছি যে গান গাইতে গিয়ে বিশুদ্ধ উচ্চাঙ্গসংগীত এর সঙ্গে কিভাবে গান গাইতে হয় সেটা শেখা যেমন জরুরি ঠিক শরীর সুঠাম রাখাও একইরকম জরুরী।

আমি আমার জীবনে এইসব শিক্ষা ওস্তাদজী এবং আব্বার কাছ থেকে পেয়ে যেমন উপহার পাওয়া মুক্তোর মতো গলায় পরেছি তেমন কিশোরদার উপদেশ কুড়িয়ে নিয়ে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছি।
এই যাত্রা বড়ই দীর্ঘ এবং কঠিন হলেও নিজের গভীর সুক্ষ নজরদারিতে তা মসৃণ ও হয়ে ওঠে। যে পথে চলতে হবে তা একটু ঠিকঠাক চিনে নিয়ে হাঁটাই তো বুদ্ধিমানের কাজ।আমার সমস্ত পথচলা সবার উপদেশ আদেশ পরামর্শ মাথায় নিয়ে চলা সহজ করে দিলেন যিনি তিনি আমার জীবনসঙ্গী সুরকার সংগীত পরিচালক জনাব মইনুল ইসলাম খান সাহেব।তাকে না পেলে আমার পথচলাই হতো না।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]