কুয়াশায় ঢাকা অরণ্যে…

হোমায়েদ ইসহাক মুন

শীতের সকাল, ঘন কুয়াশায় ঢাকা সব। আমরা বাস থেকে নামলাম যখন, রাস্তায় দু’চারজন উৎসুক মানুষ আমাদের দেখছে। রাস্তাার দু’ প্রান্তে আর কিছু নজরে আসছিল না। ছোট্ট চায়ের দোকানে আমরা উষ্ণতা নিতে চায়ের কাপে চুমুক দিলাম। এতগুলো লোক ভোরবেলা বাক্র-পেটরা সহ এসে নামলো, স্থানীয়দের তাই নানা প্রশ্ন। আমাদেরই একজন একে একে উত্তর দিয়ে চলে।
দলে আছি ২৩জন। আমরা ঘুরে বেড়াই মনের আনন্দে, দেশের মানুষকে দেশের কথা জানাই, আমাদের একটা ঘোরাঘুরির দল আছে, নাম বিাটইএফ(বাংলাদেশ ট্যুরিজম এক্রপানশন ফোরাম)। বছর কয়েক আগের কথা। আমরা চলে এলাম দিনাজপুর এর সিংড়া ফরেস্টে। ছোট এ-বন দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলায়, বাস থেকে নামতে হয় বীরগঞ্জ পার হয়ে ৬/৭ কিলোমিটার পর বটতলি’তে। বছরের শেষ দিনটা আমরা এই অরণ্যে কাটাবো। আর পরদিন ঘুরে বেড়াবো মহিষের গাড়িতে করে। এমটাই আয়োজনের কথা বলেছেন আমাদের রাশেদ ভাই। তার গ্রামের বাড়ি এই দিনাজপুর অঞ্চলেই। রাশেদ ভাইয়ের বন্ধু নয়ন দাদা আমাদের জন্য সব আয়োজন আগে থেকেই করে রেখেছিলেন। সিংড়া ফরেস্টে একটা ছোট্ট থাকার ঘর আছে, আমরা সেখানটাতেই রাত কাটাবো। দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলায় এ সিংড়া ফরেস্ট। এর পাশ দিয়ে বয়ে গেছে আত্রাই আর পুনর্ভবা নদী। বড় বিলের মধ্যে আছে পাই্সা, লাল এবং চন্দ্রগোভার।
পাঁকা রাস্তাা থেকে নেমে গ্রামের মেঠো পথে পা দিলাম। চারপাশে যেদিকে চোখ যায় বিস্তৃর্ণ ফসলের ক্ষেত। আলুর চাষ এখানে বেশি। আর মাঠের মাঝে মাঝে হলদে ফুলের মেলা। দূর থেকে সরিষার ফুল গুলো দেখলে মনে হয় প্রজাপতি উড়তে উড়তে বলছে, “আমি প্রজাপতি মিঠা মাঠে সোঁদালে সর্ষেক্ষেতে”। মনটাই ভরে যায়। আমরা অল্প হাটতেই পৌঁছে গেলাম সিংড়া ফরেস্টে। বীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুরে এরকম বন আরো অনেক আছে। এই বনের কিছু অংশ প্রাকৃতিক আর কিছু অংশ কৃত্রিম।

এখানে মূলত শাল-সেগুনেরই বাড়-বাড়ন্ত। আমরা ব্যাগপ্যাক রেখে সবাই জঙ্গলে হাটতে বের হয়ে পড়লাম। সিংড়ার এ অরণ্য বেশ শান্ত আর পরিপাটি। বিশাল আকারের শাল, গজার, মেহগনি, জারুল গাছের সারিতে পরিপূর্ণ। হাটতে লাগলাম জঙ্গলের মাঝে সরু মাটির রাস্তাা ধরে। বিচিত্র পাখপাখালির কলতান আর সবুজের সমারহ দেখে মনে হলো যেন আমি অরন্যকে দেখছি না, চারদিকের বন বাদাড়ই আমাকে দেখছে। চতুর্দিকে বিশুদ্ধ নিস্তব্দতা। বড় বড় গাছপালা গুলো যেন হাতছানি দিয়ে ঢাকছে। তবে একটু ভেতরের দিকে গেলেই বোঝা যাবে গাছ কাটার আধিক্য।ঘুরতে বের হলে মনে হয় এ জগৎ থেকে বাহিরের জগতে তন্ময় হয়ে যাই। চারপাশের মানুষের হিংসা, লোভ, রক্তপাত, টাকা-পয়সার ঝনঝনানি, এসব কিছুই আর মনে পড়ে না।
হাটতে হাটতে আমরা সাওতালদের পল্লীতে চলে গেলাম। মাটি দিয়ে তৈরি তাদের বাড়িঘরগুলো বেশ পরিষ্কার আর পরিপাটি। আমাদের দেখে তারা এগিয়ে এলো, আমরাও ছবি তুলে নিলাম। আমাদের সঙ্গে এবার ছিল ইউএস থেকে আসা ম্যালিসা আর ক্যালি, আমরা ম্যালিসার নাম দিয়েছিলাম মল্লিকা। সবাই মল্লিকাকে দেখে ঘিরে ধরে আর আমরাও নিস্তার পাই। এত সুন্দর মাটির পথে বার বারই ইচ্ছে করছিল সাইকেল চালাতে। কাছে দাড়ানো এক কিশোরের কাছে সাইকেল দেখে আর লোভ সামলাতে পারলাম না। একটা চক্কর দিয়ে এলাম। জঙ্গল আর পাড়া ঘুরে ফিরে এলাম। দুপুরে খাবারের জন্য এলাহি কান্ড করেছে নয়ন দাদা। তিনি নিজ হাতে আমাদের জন্য রান্না করেছে আর খেতে দিয়েছে কলাপাতায়। কবে খেয়েছিলাম কলাপাতায়, ঠিক মনে পড়ে না।গরম ভাতের সঙ্গে শাক ভাজি, মাছ আর মাশকলাইয়ের ডাল। আহা! কি স্বাদ। বিকেলটা সবার জন্য ছেড়ে দেওয়া হল। যেন ভেসে যেতে পারে সবাই নিরূদ্দেশে। আমরা আবার বের হলাম পাড়া বেড়াতে। কেউ ঘুম দিল, কেউ আলাদা হলো, কেউ কল্পনায় ডুব দিল, আর কেউ ছবি তোলায় মন দিল।
আজ বছরের শেষ রাত, আমরা অনকে দূরে সবুজের মাঝে। সবাই আগুনের কুন্ডলিতে জড়ো হলাম আর গাইলাম, “ভালবাসি..ভালবাসি.. এই সুরে কাছে দূরে জলে স্থলে বাজায়, বাজায় বাঁশি ভালবাসি..ভালবাসি..”। কিছুক্ষন পরে সাওতাল গাঁয়ের বাবুরা আসে আমাদের গান শোনাতে, আমরা সে সূরে বিভোর হই আর নৃত্যে উম্মাতাল হই। নতুন বছরের জন্য কামনা করি, এই অল্প জীবনে যেন ভালবাসতে পারি, ক্ষমা করতে পারি, প্রাণ খুলে হাসতে পারি আর ভাল থাকার জন্য মন যা চায় তা করতে পারি।

নতুন একটি বছরের সূচনা করে আমরা সে রাতে এক আকাশ তারা মাথায় নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন উঠলাম ভোরে। আমাদের জন্য মহিষের গাড়িগুলো রাত থেকে ঠায় দাড়িয়ে আছে। রঙ্গিন কাগজ দিয়ে তা সাজানো হয়েছে। আটটি মহিষের গাড়ি জোগাড় করা হয়েছে এ গ্রাম ও গ্রাম থেকে। এর উপরে ছই বসেছে, তার মধ্যে আমরা। আমাদের দলনেতা গান ধরলো, “ওকি ও গাড়িয়াল ভাই… কত রব আমি পন্থের পানে চায়া রে.. যেদিন গাড়িয়াল উজান যায় নারীর মন উইড়া রয় রে…”। একসময় উওরাঞ্চলে মহিষ আর গরুর গাড়িতে সবাই যাতায়াত করতো আর এখন তা কালের গর্ভে বিলীন হবার পথে। কথা হয় আমাদের গড়ির গাড়িয়াল রবীন্দ্র এর সঙ্গে। তিনি বর্গা চাষী। ক্ষেতে সার নিয়ে যায়, ধান নিয়ে আসে মহিষের গাড়িতে করে। নসিমন এর দৌরাত্বে এখন আর গরু বা মহিষের গাড়ি চলে না। আর কয়েক বছর পর মহিষ টানা গাড়ি দেখা যাবে কিনা কে যানে !

মেঠো পথ ধরে মহিষের গাড়ির চাকায় ক্যাচক্যাচ আওয়াজ শুনতে থাকি, আমরাও হেলে দুলে আনন্দে মেতে উঠি। সকালে কিছুটা কুয়াশা বৃষ্টি হয়েছিল, তাই ঠান্ডাও লাগছে বেশ। উত্তরআঞ্চল মূলত শীত প্রধান, আর এখানকার মানুষরাই শীতে কষ্ট পায় বেশি। তবে এখন এ অঞ্চলের মানুষরাও বেশ উন্নত হয়েছে। জীবন জীবিকায় পরিবর্তন এসেছে।
আমরা গ্রাম আর ফসলের প্রান্তর ছাড়িয়ে রসুলপুর গ্রামের সোনাপুরদিঘীর হাটে একটু বিরতি দিলাম। আমাদের জন্য পিঠার ব্যবস্থা করা হয়েছে। চিতই,ভাপা, তেলের পিঠা। পেট পুরে খেয়ে আমরা আবার মহিষের গাড়িতে উঠি। গ্রামের সীমানা বেশ দীর্ঘ মনে হলো, এদিক ওদিক ঘুরে দিন পার করে দেওয়া যায় আনায়াসেই। কৃষকের ঘরের আঙ্গিনায় স্তুপ করে রাখা খড়ের গাদাগুলো দেখে মনে হয়েছে যেন তা একটি আস্ত ঘর। এর মধ্যে দশ গাঁয়ের মানুষ জড়ো হয়ে গেছে। আমরা নওগাঁ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে এসে থামলাম আর অমনি মল্লিকাকে সব ছেলে-মেয়েরা ঘিরে ধরলো যেন মৌচাকে ঢিল পড়েছে। সেও মহা আনন্দে তাদের সঙ্গে মেতে উঠল্। সেই দূর দ্বীপবাসিনী এই ম্যালিসাই ট্রিপ শেষে বলল এমন আনন্দ তার জীবনে সে খুব কমই করেছে।

লাইন ধরে একসঙ্গে এতগুলো মহিষের গাড়ি চলছে, দুপাশে খোলা প্রান্তর, এই দৃশ্য মিস করা যায় না। ছবি তোলার জন্য ছুট দিলাম জমিনের মাঝখানে। মেঠো পথ মাড়িয়ে অন্য একটা স্কুলের কাছে চলে আসলাম। দল আরো ভারী হলো। খোলা মাঠে একদল তরুনদের সঙ্গে আমরা ক্রিকেট খেলে হারলাম। তাতে কি! আনন্দতো পেয়েছি ঢের। অল্প জীবনে এমন আনন্দের সময়গুলো বার বার আসে না।

লেখা ও ছবি: হোমায়েদ ইসহাক মুন