কৃতজ্ঞতার শেষ নেই আমার

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

সঙ্গীত পরিচালক আবু তাহের

এগিয়ে চলার পথে অনেক সময় অনেক জায়গায় কিছু গিঁট লাগে। জীবনের প্রথম পেশাদার ভাবে গাইবার সঙ্গে সঙ্গেই ছবিতে গেয়েছিলাম এ কথা অনেক বার বলেছি।কিন্তু কিছু অনুচ্চারিত কথা

থেকেই যায় সেখানে ।তা হয়তো অনেক সময় না বলাই ভালো। একটা গান গেয়েই সেই সপ্তাহে আটটা গান গাইলাম। কি ভয়াবহ আনন্দের অনুভূতি ছিলো তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু কি একটা অজানা কারণে এরপর আর  আমাকে ডাকা হলো না অনেক বছর ।শ্রদ্ধেয় সুরকার খোন্দকার নুরুল আলম ভাই আমাকে বিশেষ স্নেহ করতেন। বিটিভিতে এবং রেডিও বাংলাদেশে উনার অনেক গান আমি গেয়েছি। উনার ধানমন্ডির বাসায় গান তুলতে যেতাম। উনি একদিন বললেন তোকে তো খুব ভদ্র নরম এবং সভ্যই মনে হয় সেখানে এমন একটা বদনাম রটলো কিভাবে বুঝলাম না! আমি জানতে চাইলাম কি বদনাম? উনি বললেন আমার বদনাম হলো আমি বড়দের কাউকে সালাম দেইনা!আমি বিস্মিত। আসল ঘটনা অন্যত্র।রাত-বিরেতে রেকর্ডিং এ আমার গার্জিয়ান সঙ্গে যান,এটাই হলো আমার আসল দোষ।

যাই হোক, আমি চলি আমার নীতি নিয়ে। খোন্দকার ভাই আমাকে আশ্বাস দিলেন উনি আমাকে দিয়ে ছবির গান গাওয়াবেন।এটা আমি বলছি ছবির গান শুরু করে আবার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পাঁচ বছর পরের কথা। এমন সুন্দর একটা শুরুর পর এমন স্তব্ধতা সত্যিই আমার জীবনের কঠিন একটা অধ্যায় ছিলো। খোন্দকার ভাই বললেন আমি তোকে দিয়ে কয়েক লাইন গান গাওয়াবো।আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। একটা আস্ত গান নয়? কয়েকটি লাইন? অশ্রুসজল চোখ কোনমতে সামলে হেসে বললাম জী ভাই,অবশ্যই গাইবো। তখন মনে মনে আমার খুব কষ্টে দিন কাটে।আমি কাউকে কিছু বলিনি কখনো ।ঠিক এমন সময় আমাকে শ্রদ্ধেয় আবু তাহের ভাই ডেকে পাঠালেন। আমাদের দেশের প্রখ্যাত বংশীবাদক ও সঙ্গীতজ্ঞ শ্রদ্ধেয় ধীর আলী মিয়ার সন্তান আবু তাহের। বেদের মেয়ে জোৎস্না ছবির সঙ্গীত পরিচালক তিনি।অনেক হিট গানের ব্যাস্ত সুরকার।তিনি ডেকে পাঠালেন ‘তুমি আমার’ ছবির জন্য। সুঅভিনেত্রী শাবনুর তখন বলা যায় নতুন কিন্তু খুব সাড়া ফেলেছেন।তার লিপে যাবে আমার গান। আমি যদিও এতো কিছু বুঝিনা তারপর ও বিস্মিত হচ্ছিলাম যে এই বেয়াদব মেয়ে আবারও ছবিতে গাইবে? তাহের ভাইয়ের আদাবরের বাসায় গেলাম গান তুলতে। প্রথম গান ছিলো প্রয়াত জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী জনাব ইশতিয়াক আহমেদ এর সঙ্গে।

জনপ্রিয় গীতিকবি মনিরুজ্জামান মনির সাহেবের লেখা ‘তুমি আমার ভালোবাসার প্রান’।খুব সুন্দর একটি গান।খুব যত্ন করে গাইলাম। তারপর গাইলাম ‘দেখা না হলে একদিন কথা না হলে একদিন বুকের ভেতর করে চিন চিন চিন’।এই গানের সহশিল্পী আগুন।আগুনের সঙ্গে এটাই আমার প্রথম গান।আগুন তখন হার্টথ্রব।গানের সময় তার গাওয়ার ভঙ্গি খেয়াল করছিলাম।আগুন বললো চাচী,আপনি চেয়ারে বসে গান।অনেক শক্তি পাবে। এরপর থেকেই আমি চেয়ারে বসে গান ডেলিভারি দিতাম।সত্যিই দেখলাম কন্ঠের থ্রোইং গ্রিপ পাওয়া যায় সহজে। আমি আগুনের দেয়া এই সাজেশন এর জন্য আজো কৃতজ্ঞ। দ্বিতীয় গানটি কণ্ঠে তোলার সময় একটু দ্বিধা কাজ করছিলো। সেই দ্বিধা হয়তো আমার ও সুরকারের মধ্যে ছিলো। কারণ আমি এর আগে সফট মেলোডিয়াস এবং স্যাড রোমান্টিক গানেই অভ্যস্ত। কিন্তু এমন চিন চিন চিন কথার চটুল গান গাইতে একটু দ্বিধাই ছিলো। গানটি গাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বলা যায় হিট হয়ে গেলো,কারণ গানটি ঘনঘন রেডিওতে বাজছিলো এবং আশেপাশের শ্রোতারা আমাকে সেটা বলছিলেন । আমি এবং তাহের ভাই আর ছবির সংশ্লিষ্ট সবাই জানলো আমি এমন গানও গাইতে পারি।এটা আমার ও তাহের ভাইয়ের দুজনেরই মোটামুটি চ্যালেঞ্জ এর মতো ছিলো। এরপর আমি নিজেও যেমন নিজেকে চিনলাম অন্যরাও হয়তো চিনলো।

সত্যিকার অর্থে সেটা আমার জীবনে আমার গানের অচলায়তন অথবা সহজ ভাষায় একটা গিট্টু কেটে গেলো। এরপর আমি আবারও ছবির গানের জগতে ঢুকে গেলাম। এই গান দুটি আমাকে দোষারোপ করা ‘বেয়াদব’ শব্দটা উইথড্র করার জন্য যথেষ্ট ছিলো। ছবির জগতে আমি দ্বিতীয় বার প্রবেশ করলাম। শ্রদ্ধেয় সুরকার সঙ্গীত পরিচালক জনাব আবু তাহের ভাইয়ের কাছে এ ব্যাপারে আমার কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই।এরপর উনার অনেক গান আমি গেয়েছি। আমাকে উনি বারবার ডাকতে লাগলেন। তখনও কেউ কেউ অর্থাৎ ছবির প্রযোজক পরিচালক পরীক্ষা নিয়ে যেতে থাকলেন। একটা গান ছিলো ‘নাগো তুমি ছাড়া দিন কাটেনা’ গানটি যথাযথ গাইবার পরেও রেকর্ডিং স্টুডিওতেই পরিচালক প্রযোজক বলছিলেন হচ্ছে না হচ্ছে না।আমি ও তাহের ভাই কেউই বুঝছিলাম না আর কিভাবে কতভাবে গাইলে ঠিক আবেগ থ্রো হবে! মন খারাপ নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে লুকিয়ে তাহের ভাই বললেন গান ঠিকই হয়েছে কিন্তু নতুন বলে উনারা সহজে মানতে পারছেন না।

তুমি ঠিকই গেয়েছো,চিন্তার কোন কারণ নেই,আরও অনেক গান হবে। পরে শুনেছি গানটি আরেকজন সিনিয়র শিল্পী গেয়েছেন। তাহের ভাই এগুলো মাথায় নিতে না করে বললেন, সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি বলতে চাইছি কোন রকম ব্যাক্তিগত স্বার্থ ছাড়াই উনি আমাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নীরব যুদ্ধে নেমেছিলেন। আমি উনার কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ হয়ে গেলাম। উনি আমাকে ছোট হলেও স্পষ্ট একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিলেন। মাঝেমধ্যেই উনার কথা, উনার চেষ্টা, উনার স্নেহ আমার মনে পড়ে। মানুষটি আজ নেই কিন্তু রয়ে গেছে তার কর্ম। আল্লাহ তাহের ভাইকে বেহেশত নসীব করুন।


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box