কেউ কি বাঁচতে পারছেন…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সালাহ্ উদ্দিন শৈবাল

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

আমি তখন ইঞ্জিনিয়ারিং সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি। খুলনায়। ১৯৯২-৩ সাল হবে। সালটা মনে রাখবেন। পরে দরকার হবে।

খাই-দাই—ক্লাসে যাই। আড্ডা দেই। এরশাদ বিদায় হয়েছে। দেশে বড় কোন সমস্যা নাই। থাকলেও ফেইসবুক নাই বলে আওলা হাউ-কাউও নাই। আমরা ভালোই ছিলাম।

একদিন প্রফেসর এম নুরুল ইসলাম স্যার আসলেন বুয়েট থেকে। আমি কখনো তার নাম শুনি নাই। সেই প্রথম শুনলাম। বুয়েটের Chemical Engineering Department এর প্রফেসর ছিলেন। পরে বুয়েটেরই Institute of Appropriate Technology এর রিসার্চ প্রফেসর হয়েছিলেন। তিনি নাকি কি একটা রিসার্চ করেছেন তা আমাদের সংগে শেয়ার করবেন। ২য় বর্ষ মেকানিক্যাল আর ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং সকল ছাত্রদের দুপুরের ভাত ঘুম বাদ দিয়ে গ্যালারী হলে থাকতে বলা হয়েছে। কিছুটা বিরক্তি আর কৌতুহল নিয়ে গেলাম। স্যার দুই ঘন্টা লেকচার দিলেন। তার রিসার্চের নাম Status Report on Energy Sector। এই রিসার্চ তিনি করেছেন ১৯৯০-৯১ সালে।

ফলাফল এক কথায় ভয়াবহ!

তিনি বুঝতে পেরেছেন এই ভাবে চললে ২০০৫ সাল নাগাদ দেশ বিরাট বিপদে পড়বে। বিদ্যুৎ অবস্থা ভয়াবহ হবে। দেশ অন্ধকার হয়ে যাবে। তিনি এই রিপোর্ট সেই সময়ের সরকারকে দেখিয়েছেন। দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। কেউ পাত্তা দেয় নি। তাই তিনি নিজে প্রযুত্তি বোঝে এমন সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঘুরে ঘুরে ছাত্রদের আশু বিপদের কথা বোঝাতে চেষ্টা করছেন। আশা করছেন যুব শক্তি কিছু করবে। আমি তার দায়িত্ববোধ দেখে মুগ্ধ হলাম। সৌম্য চেহারার এই মানুষটির মুখ আমার মনে গেঁথে রইলো। ওই পর্যন্তই। আমরা তার লেকচার শেষে আর দশটা ক্লাসের মতো হাই তুলতে তুলতে যে যার ঘরে ফিরে গেলাম। কারন স্যারের কথা ঠিক আমাদেরও বিশ্বাস হলো না। কারণ সেই ১৯৯২-৯৩ সালে দেশের মানুষ লোড সেডিং যা অল্প-স্বল্প পায় তা দেখে আতংকিত হওয়ার কিছুই ছিলো না।

তারপর অনেকগুলো বছর চলে গেল। ১৯৯৬ সালে সরকার চেঞ্জ হলো। ২০০১ সালে আরেকবার চেঞ্জ হলো। আমরা পাশ-টাশ করে বিয়ে-সাদী করে জাঁকিয়ে বসলাম। নুরুল স্যার, তার রিপোর্ট আর অনেক আগের এক দুপুরের ২ ঘন্টার ঘুম মিস করার কষ্টও ততদিনে ভুলে গেছি।

কিন্তু বিপদ আমাদের ভুলে যায় নি।

স্যারের বেঁধে দেওয়া ২০০৫ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় নি। আপনাদের অনুরোধ করবো ২০০২-৩ সাল থেকে টানা চলা সেই ভযাবহ বিদ্যুৎ বির্পযয়ের কথা স্মরণ করতে। ঢাকা শহরে ১ ঘন্টা বিদ্যুৎ…এক ঘন্টা অন্ধকার! এই ভাবে সারাদিন। ঢাকার বাইরের অবস্থা আরো ভয়াবহ। ঘন্টার পর ঘন্টা বিদ্যুৎ নাই। সন্ধ্যার পরে অফিস থেকে ফিরে আমি গরম আর মশায় বেআব্রু হয়ে বসে থাকি আর নুরুল স্যারের কথা স্মরণ করি। ১০ বছর আগে তিনি বলেছিলেন। আমরা কেউ শুনি নাই।

চার্জার ফ্যান কেনা হলো। আইপিএস লাগানো হলো। একটা ছোটখাটো জেনারেটরও কেনা হলো।

একদিন রাতে সব ফেইল করলো। সারাদিন বিদ্যুৎ ছিলো না। জুলাইয়ের গরম। চার্জার ফ্যান আর আইপিএস চার্জ হবে কিভাবে? জেনারেটরের তেল শেষ। রাত দুইটা। তেল কেনার উপায় নাই। আমার তিন বছরের ছোট বাচ্চা। টপ ফ্লোরে থাকি। হাতে একটা পেপার নিয়ে তাকে বাতাস দিতে বসলাম। সেই বাতাসও আগুনের মতো গরম।

মনে হলো এই দেশে কোন সরকার নাই!

২০১৯ সাল। সারাদেশে ডেঙ্গু মহামারী আকার ধারন করেছে। আমার হাতে ২০০৬ সালের একটা রিপোর্ট। তৈরি করেছিলেন আইসিডিডিআরবি’র রিসার্চার শাকিল মাহমুদ। শিরোনাম “Dengue: An Epidemic Is Largely a Failure in Public Health Administration! The Role of Dhaka City Corporation, DCC of Bangladesh”.

তার সেই ২০০৬ সালের রিপোর্ট পরিষ্কার বলেছে বাংলাদেশ কি ভয়াবহ ডেঙ্গু মহামারীর দিকে এগিয়ে চলেছে। ২০০০ সালেই ৫,৫৫১ জন এই রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং ৯৩ জন মারাও গিয়েছিলেন! ২০০১ সালে ১৪৩০ জন আক্রান্ত হন আর ৪৪ জন মৃত্যুবরণ করেন।

তিনি তার রিপোর্টে পরিষ্কার বলেছেন কারা দায়ী। অন্য সব দেশ এই বিপদ কিভাবে মোকাবেলা করেছে। এখন আমাদের কি কি করা উচিৎ।

আমি নিশ্চিত খুঁজলে এই রকম আরো অনেক রিপোর্টই পাওয়া যাবে। শুধু পাওয়া যাবে না..কি কি কাজ করা হয়েছে তার খতিয়ান।

২০০৬ সাল থেকে ২০১৯!!! তের বছর! এখন আর ‘চৌদ্দ দিন লাগবে মশার ঔষধ আনতে’ এই গল্প শুনিয়ে কি লাভ বলেন?

একা বিদেশে পড়ে আছি। ভাই-বোন…আত্মীয়-স্বজন..বন্ধু..তাদের সন্তান….ফোন করে আস্তে জিজ্ঞেস করি, ‘কেমন আছো?’। উত্তর না দেয়া পর্যন্ত দম বন্ধ করে থাকি। ভয় হয়। পত্রিকার কোন খবর পড়তে ইচ্ছে করে না।

আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া করি…এইতো সেপ্টেম্বর সামনে। সিজন শেষ হয়ে যাবে আশা করি। এক বছরের জন্য মুক্তি। তারপর আবার জুলাই…আগষ্ট ২০২০….২১…২২…। তারপর হয়তো কিছু হবে…।

আমি মাঝে মাঝে ভাবি….আমরা এতোটা আত্ম-বিধ্বংসী হলাম কি করে? কেউ কি বাঁচতে পারছেন? যিনি প্রতিদিন গড়ে ১০ লক্ষ টাকা করে ঘুষ নিতেন? যার বাসা থেকে ৮০ লক্ষ টাকা জব্দ হলো? যাদের দায়িত্ব ছিলো এই রিপোর্টগুলো পড়া…বিশ্লেষন করা….সেই মতে কাজ করা?

কেউ কি বাঁচতে পারছেন?

ছবি: লেখকের ফেইসবুক ও গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]