কেন ব্যারিষ্টার মঈনুলরা বীরপুরুষ আর মাসুদা ভাট্টিরা চরিত্রহীন?

শারমিন শামস্

একাত্তর টিভির টকশোতে ব্যারিষ্টার মঈনুল হোসেনকে প্রশ্ন করেছিলেন সাংবাদিক লেখক মাসুদা ভাট্টি। প্রশ্নটি ছিল,  জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় মঈনুল হোসেন জামায়াতের প্রতিনিধিত্ব করছেন কি না?

প্রশ্ন শুনেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছেন মঈনুল সাহেব। এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি মুখ লাল করে যা বলেছেন, সেটি এরকম- আপনাকে আমি একজন চরিত্রহীন বলেই মনে করি। আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে চাচ্ছি না।

পরে মঈনুল সাহেব মাসুদা ভাট্টিকে একজন ‘শিক্ষিত ভদ্রমহিলা’ হিসেবে প্রশ্ন করার পরামর্শও দিয়েছেন।

নারী যত বড় ব্যাক্তিত্বই হয়ে উঠুন না কেন, পিতৃতন্ত্র তাকে সবার আগে ‘মহিলা’ হিসেবে চিহ্নিত করে। যদিও কোন নারী যদি সামান্য কেউও হন, কারো অধিকার নেই তার লিঙ্গ পরিচয়ের সূত্র ধরে হেনস্থা করার।  এ সমাজে সতী নারীর কদরের কাছে শিক্ষিত, গুনী নারীর মহিমা মূল্যহীন। আর কে ‘সতী’ কে ‘চরিত্রবান’ তা নির্নয় করে ওই পুরুষতন্ত্রই।

মাসুদা ভাট্টি একজন গুনী সাংবাদিক, লেখক, অ্যাকটিভিস্ট হিসেবে একাত্তর টিভিতে আলোচনার জন্য গেলেও ব্যারিষ্টার মঈনুলের কাছে তিনি একজন আস্ত মহিলা ছাড়া আর কিছুই নন। আর যেহেতু মাসুদা ভাট্টি একজন ‘মহিলা’ আর মহিলাদের জন্য সতীত্ব ও চরিত্র একটি জরুরি ক্রাইটেরিয়া, এবং সেই চরিত্র নির্ধারণের অধিকার এ সমাজ মঈনুলদের দিয়ে রেখেছে, তাই মাসুদা ভাট্টির প্রশ্নের উত্তরে মঈনুল সাহেব জামাতী কি না তার উত্তর- মাসুদা চরিত্রহীন! এটি হওয়াই স্বাভাবিক।

এ সমাজে মাসুদা ভাট্টিরা চরিত্রহীন, কারণ মঈনুল সাহেবরা বীরপুরুষ। পুরুষের জন্য বিশেষণ হিসেবে বীর বা কাপুরুষের তকমা থাকে। অপরপক্ষে নারীর জন্য থাকে চরিত্র খারাপ, অসতী, বেশ্যা, মাগী, খানকি ইত্যাদি। কারণ নারীর বিদ্যা বুদ্ধি প্রতিভা জ্ঞান গুন কোনটাই তার শরীর ও যৌনতার উপরে উঠতে পারে না। কারণ পিতৃতন্ত্র নারীর জন্য যৌনবস্তুর জায়গাটি নির্ধারণ করে দিয়েছে। এর বাইরে নারীর আর কোন কাজ থাকতে পারে বলে তারা মনে করে না। তাই একজন মাসুদা ভাট্টি যখন সাংবাদিক হিসেবে প্রশ্ন করেন, তার সেই প্রশ্নটি সাংবাদিকের প্রশ্ন নয়, হয়ে যায় চরিত্রহীনের করা প্রশ্ন।

ব্যারিষ্টার মঈনুল মাসুদা ভাট্টিকেই শুধু অপমানই করেননি, তিনি পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপর একটি মস্ত বড় আঙুল তুলেছেন। তিনি বলেছেন, সাংবাদিকরা সকলেই কোন না কোন দলের তল্পিবাহক। অথচ তিনি নিজেও কিছুদিন আগেই ইত্তেফাক নামের সবচেয়ে প্রাচীন পত্রিকাটির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন এবং এখন নিউ নেশনের প্রকাশক।  তার পিতা মানিক মিয়া এদেশে সাংবাদিকতার গুরুস্থানীয় একজন।  সেই হিসেবে সাংবাদিক সমাজের একজন তিনিও। এক্ষেত্রে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এত বড় একটি অভিযোগ তিনি কীভাবে আনলেন, এর ভিত্তি কী- সেটি মঈনুল সাহেবকে পরিস্কার করতে হবে। কোন ধরণের তথ্যপ্রমাণ ছাড়া তিনি ঢালাওভাবে পুরো সাংবাদিক সমাজকে কীভাবে কলঙ্কিত করেন, সেটি আমাদের জানার প্রয়োজন আছে। অবশ্য এর আগেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মঈনুল সাহেবের সাংবাদিকদের ওপর রাগ তেজ দেখার ‘সৌভাগ্য’ হয়েছিল!

মাসুদা ভাট্টি

একাত্তর টিভির টকশোতে মঈনুল হোসেনের চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্যের পরও মাসুদা ভাট্টিকে মাথা ঠান্ডা রাখতে দেখলাম। তিনিও তো পুরুষতন্ত্রের এই কদাকার রূপটি দেখেই অভ্যস্ত। তাই এরপরও মঈনুল হোসেনকে একের পর এক তেজী প্রশ্ন করে গেছেন মাসুদা ভাট্টি। কিন্তু কোন প্রশ্নেরই যথার্থ জবাব পাওয়া যায়নি।

যুগে যুগে মঈনুল হোসেনরা থাকবে। তারা মাসুদা ভাট্টিদের যোগ্যতাকে চরিত্রের দাড়িপাল্লায় ফেলবেন। কারণ মঈনুল হোসেনরা মনে করেন, চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুললেই নারী কেঁচোর মত কেচিয়ে গিয়ে গর্তে ঢুকে যাবেন। কারণ তিনি শিখে এবং জেনেই এসেছেন নারীকে শায়েস্তা করার সবচেয়ে বড় উপায় তার শরীর ও যৌনতাকে ইঙ্গিত করে মন্তব্য করা। কিন্তু তার একটা ছোট ভুল হয়েছে। অবশ্য তার যথেষ্ট বয়সও হয়েছে। এই বয়সে তিনি নিজেকে সবসময় আপডেটেড রাখতে পারবেন না, তাও ঠিক। আমি তাকে সাহায্য করতে চাই। তাকে জানিয়ে রাখতে চাই, চরিত্রহীনতা- এই হাস্যকর শব্দ দিয়ে নারীকে থামায়ে দেবার দিন আপাতত আর নাই। সেই দিন শেষ। মাসুদা ভাট্টিরা আর এই শব্দে কুপোকাৎ হন না। এই শব্দ তাদের পরাজিত করে না। এরকম হাস্যকর বান ছুঁড়ে মারার পরও মাসুদা ভাট্টি তাই একের পর এক দারুন সব প্রশ্ন পাল্টা ছুঁড়ে দিতে পারেন মঈনুল হোসেনদের দিকে। আর সেই পাল্টা যুৎসই প্রশ্নের জবাব বীরপুরুষ মঈনুলদের থলিতে থাকেনা।

পিতৃতন্ত্রের দুধভাত খাওয়া মঈনুলরা পাল্টাবেন না। তবে অবলা বাঙালি নারীরা একেকজন মাসুদা ভাট্টি হয়ে উঠবেন। সেই মাসুদাদের সশব্দ লাথির আঘাতে ভেঙ্গে পড়বে পিতৃতন্ত্রের দেয়াল। মঈনুলরা সেই দেয়ালের নিচে চিরতরে চাপা পড়বেন।