কেমন আমাদের শিক্ষা…

লুৎফর হাসান

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

আগের দিনে বাচ্চাকে স্কুলে দিয়ে এসে নিশ্চিন্তে থাকতেন বাবা মা। ভাবতেন, বাড়ির চেয়ে নিরাপদে আছে। এখন বাচ্চা স্কুল থেকে না ফেরা পর্যন্ত মাথাব্যথা কমে না আমাদের। মনে হয়, দ্রুত ছুটি হোক।
ভিকারুননিসা স্কুলের মেয়েটা আত্মহত্যা করেছে। অনেক বাচ্চা আত্মহত্যার সাহস পায় না। ভেতরে ভেতরে মরে যায়। আস্তে আস্তে কেমন নিজের কাছেই অচেনা হয়ে ওঠে। চুতিয়া শিক্ষকদের পাশাপাশি দেশে কিছু হারামি বাবা মাও আছে, যারা মনে করে বাচ্চাকে মারধর করলে, চাপে রাখলে, বাচ্চারা খুব ভালো মানুষ হবে। ভুল। পুরোটাই ভুল।তাহলে কয়েকটা ঘটনা বলি অল্প কথায়।

আমাদের সবার পরিচিত একজন মানুষ আছেন। খুব কাছ থেকে আমি তার সঙ্গে মিশেছি। দেখেছি সে সব সময় তার বাবাকে গালিগালাজ করে। অথচ খুব মিশুক ও সবার সঙ্গে স্বাভাবিক। একদিন আমি জিজ্ঞেস করলাম ‘ভাই কী সমস্যা?’ তিনি জানালেন এভাবে – ‘শালায় লোকজনের সামনে আমারে মারতো, খুব মারতো’। নিজের বাবাকে নিয়ে কথাগুলো বলার সময় ফোঁসফোঁস করতো।

১৯৮৫/৮৬ সালের দিকে যারা ঘাটাইলের পাকুটিয়া প্রাইমারি স্কুলে পড়তেন, তাদের মনে থাকার কথা। আমাদের এক স্যার ছিলেন। সবাই পাগলা স্যার নামে চিনতো। সেই পাগলা স্যারের কখনো মাথা গরম হলেই ক্লাস থ্রি/ফোর এর বাচ্চাদের লাইন ধরে দাঁড় করাতেন। তারপর যতক্ষণ ক্লান্ত না হতেন, মারতেই থাকতেন। বিশ্বাস করুন, শিক্ষক ও বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মানের প্রতি প্রচণ্ড সচেতন থাকা মানুষ হয়েও আমি বড় হবার পর অনেকদিন সেই পাগলা স্যারকে মনে মনে খুঁজেছি। অকারণে ৮৬ সালের একদিন আমাদের ২২ জন ছাত্রকে ২২ টি করে বেত মেরেছিলেন সেই স্যার। বাড়ি ফেরার পর আম্মার সে কী কান্না। সেই স্যারকে সামনে পেলে মারবো বলে ঘুরতাম। স্যার বেঁচে নেই। কিন্তু কী সব বাজে চিন্তা হতো স্যারকে নিয়ে।

আজকাল বাচ্চাদেরকে অনেক বাবা মা অথবা শিক্ষকদের অনেকেই এমনভাবে ভয় পাইয়ে দেন, শাসনের চিহ্ন চোখে ধরা পড়ার পর যদি জিজ্ঞেস করা হয় ’কে মেরেছে এভাবে?’ বাচ্চারা তখন ভয়ে আরও জড়সড় হয়। বাচ্চাটাকে তার পছন্দের কিছু কিনতে নিয়ে গিয়ে সেই হাসিখুশির সময় যদি জিজ্ঞেস করা হয়, তখনও সে এভাবে উত্তর দেয় ‘আরে আমার ভালোর জন্য মেরেছে তো’। অবস্থা কোনদিকে কেমন, বুঝুন।

অনেক বাবা মা এরকম লোভী আছেন, যারা ধর্মীয় জায়গা থেকে নিজের সন্তানের ভবিষ্যত গলা টিপে হত্যা করেন। ছোট বাচ্চাটা আরব দেশের ভাষা বুঝুক আর না বুঝুক, নিজেরা জান্নাতে গিয়ে হুর পরী গেলমানের সঙ্গে অনন্ত জীবন কাটাবার লোভে নিজের অবুঝ বাচ্চাকে ভর্তি করিয়ে দেয় মাদ্রাসায়। সেইসব মাদ্রাসার হোস্টেলে বাচ্চাটা কিভাবে বেড়ে ওঠে, হুর পরী গেলমানের লোভে লোভী বাবা মা সেসবের কথা মাথায়ই তোলেন না।

অনেক বাবা আছেন, ছেলেমেয়েরা সাইন্স বোঝে না। জোর করে সাইন্সে দিয়ে দেবেন। ছেলেমেয়েরা পরীক্ষায় খারাপ করতেই থাকবে। খারাপ করার কারণে মারধর চলবে। একদিন জানা যাবে ছেলেমেয়েরা দরজা বন্ধ করে ইয়াবায় ডুবেছে অথবা রাস্তায় অন্যকে অসম্মান করছে।

পৃথিবীর সবগুলো সভ্য দেশে বাচ্চাদেরকে কী আদর করে মানুষ করা হয়, সেটা ঘর হোক আর স্কুল হোক। আর আমাদের? ওদের যে বয়স, কিছুটা দুরন্তপনা, কিছুটা ফাঁকিবাজি তো থাকবেই। তাই বলে তার মন মেজাজ নিয়ন্ত্রণের বাইরে নেবার কিছু নাই। আজকের শিশু আগামির ভবিষ্যত – এটা জানার পরেও ওদেরকে বিরক্ত করবেন না।

ছবি: গুগল