কেমন ছিলো প্লেগের সময়ে মানুষের জীবনযাপন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আসুখের অগুনতি দানব জেগে উঠেছে পৃথিবীজুড়ে। তাদের গ্রাস থেকে মনে হয় মুক্তি নেই কোথাও। আমেরিকা, ইতালী, ইরান হয়ে আমাদের স্বদেশ-কোথায় নেই মৃত্যুর ছায়া, কোথায় নেই ভয়। করোনাভাইরাসে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটেছে ইতিমধ্যে। মৃত্যুর আশংকায় ক্ষণ গুনছে বহু মানুষ। মৃত্যুভয় আর শংকা পাল্টে দিয়েছে মানুষের সমাজ জীবন। পাল্টে দিয়েছে অভ্যাস, সংস্কৃতি। গৃহবন্দী হয়ে দিন কাটছে মানুষের। আমাদের চিরচেনা এই শহর ঢাকাও পাল্টে গেছে। উধাও যানবাহনের অবিশ্রান্ত চলাচল, অদৃশ্য মানুষের ক্লান্তিহীন ভিড়, দোকানপাট নিভু নিভু সন্ধ্যার পর, পথঘাট জনহীন, যেন ভৌতিক এক শহর। মৃত্যুর আশংকা-ই যেন এই শহরের শাসক। ইতিহাসের বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টাতে গিয়ে দেখা গেলো ১৩৪৭ থেকে ১৩৫০ সালের মধ্যে ইউরোপের সমাজ এবং মানুষের জীবন এভাবেই বদলে গিয়েছিলো প্লেগ রোগের ভয়াবহ আক্রমণের সময়ে। ইতিহাসে সেই ‘ব্ল্যাক ডেথ’ ইউরোপে জীবনের কন্ঠরোধ করে ফেলেছিলো। ছড়িয়ে পড়েছিলো এশিয়ায়, মধ্যপ্রাচ্যেও। সেই ভয়াবহ অসুখ বিদায় নেয়ার পর প্রায় ১০০ বছর সময় লেগেছিলো মানুষের আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে।

কেমন ছিলো প্লেগের সময়ে ইউরোপের সমাজের অবস্থা? কেমন করে মানুষ বেঁচেছিলো সেই ভয়াবহ মৃত্যুর তাণ্ডবের ভেতর দিয়ে? এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো ‘কেমন ছিলো প্লেগের সময়ে মানুষের জীবনযাপন’।   

প্লেগ তখন পাল্টে দিয়েছিলো মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবন।বদলে গিয়েছিলো শহর ও গ্রামের জীবনের মাঝে সকল ব্যবধান। প্রতিদিন ভয়ংকর মৃত্যুর কবল থেকে বাঁচতে মানুষ ক্রমাগত পাল্টে নিচ্ছিলো তাদের পরিচিত জীবনকে। ইতালীর সিসিলি‘র মেসিনা বন্দরে প্লেগ প্রথম ছড়িয়ে পড়ে ১৩৪৭ সালে। সেটা ছিলো অক্টোবর মাস। জাহাজে চড়ে প্লেগ এলো। বয়ে নিয়ে এলো মাছি, ইঁদুর আর জাহাজের নাবিকরা।সেই শহরের মানুষ বিষয়টা টের পেয়ে জাহাজগুলোকে তাড়িয়ে দিলো তাদের বন্দর থেকে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। প্লেগের ভয়ানক আক্রমণের তিন শতাব্দী পরে সেই সময়ের রক্তহিম করা সে সব গল্প মানুষের জন্য লিখেছিলেন ইতালীর প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ লুডোভিচিও অ্যান্টনিও মুরাতরি। তিনি বইতে লিখেছেন, ‘একজন অচেনা ব্যক্তি ইতালীর পদুয়া শহরে এই প্লেগ বহন করে এনেছিলো। তারপর ওই শহরটির এক তৃতীয়াংশ মানুষের মৃত্যু ঘটেছিলো।’ ষোড়শ শতাব্দীর এই ইতিহাসবিদের লেখা থেকেই জানা যায়, তখন ইতালীর যে কোনো শহরে প্লেগ ছড়িয়ে পড়ার গুজব রটলেই বন্ধ করে দেয়া হতো শহরের সমস্ত দরজা। কিন্তু এই দরজা-জানালা বন্ধ করে বসে থাকাও তখন শহরের জনসংখ্যার জন্য বয়ে নিয়ে আসতো অন্য বিপদ। বাণিজ্য, খাবার সরবরাহ সবকিছু হুট করে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শহরগুলোতে দেখা দিতো অভাব। কিন্তু প্রাণের বাঁচার জন্য শহরের মানুষ দরজায় তালা লাগিয়েই রাখতো। কিন্তু তাকে কি সেই অসহায় মানুষদের জীবন রক্ষা পেতো?ইতিহাস বলে, তারা এতে নতুন করে বিপদে পড়তো। অসুখের বদলে অভাবের দিনরাত্রি বদলে দিতো তাদের জীবনধারাকে।

সেই সময়ে ইংল্যান্ডের গ্লুসেসস্টার শহরটি ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য ছিলো বিখ্যাত। সেখানকার মানুষজন ছিলো সুখী। কিন্তু ১৩৪৮ সালের গ্রীষ্মকালে তাদের কাছে খবর এসে পৌঁছালো নিকটবর্তী ব্রিস্টল বন্দর এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে প্লেগ। ওই শহরের প্রশাসকরা বসে সিদ্ধান্ত নিলো তারা শহর অবরুদ্ধ করে দেবে। বিশেষ করে ব্রিস্টল বন্দর থেকে আসা মানুষদের জন্য তো বটেই। কিন্তু এতে করেও বিপদ এড়াতে পারেনি তারা। অসুখ ছড়িয়ে পড়া বন্দর থেকে মানুষজন বেঁচে থাকার আশায় গোপনে ঢুকে পড়তে শুরু করে গ্লুসেসস্টারে। আর তাতেই সেখানকার মানুষজন আক্রান্ত হয় প্লেগ রোগে।

তখন কোনো শহরে প্লেগ ছড়িয়ে পড়লেই মানুষ দলে দলে শহর ত্যাগ করতো। কোনো বাড়িতে প্লেগ আক্রান্ত মানুষ থাকলে বাড়ি সিলগালা লাগিয়ে বন্ধ করে দেয়া হতো। কারো সেখানে প্রবেশের অনুমতি থাকতো না। আক্রান্ত মানুষজনও বাড়ি থেকে বের হতে পারতো না। বাড়ির সুস্থ অথবা অসুস্থ সকল বাসিন্দাকেই জীবন্ত আটকে ফেলা হতো দরজায় দেয়াল তুলে দিয়ে।রঙ দিয়ে সেই বাড়ির দরজায় ক্রস চিহ্ন টেনে দেয়া হতো। সুস্থ মানুষদের জানিয়ে দেয়া হতো, এই বাড়িতে প্লেগের রোগী আছে। ওই এলাকার প্রতিবেশীরাও তখন বন্দী মানুষদের জন্য কোনো খাবার নিয়ে যেতো না। বরং এলাকার মানুষ অসুখের ভয়ে সেখান থেকে অন্য জায়গায় পালিয়ে যেতো। অসুখের সেই ভয়াল দিনগুলোতে শুধু প্রতিবেশীরাই নয় ভাই ভাইকে পরিত্যাগ করতো, সন্তানরা ত্যাগ করতো বাবা-মা-কেও। স্বজনরা ছেড়ে দিতো স্বজনদের হাত। তখন এমন ঘটনাও ঘটেছে, একটি বাড়িতে কেউ প্লেগে আক্রান্ত হলে অন্যরা ডাক্তার ডাকার মিথ্যা কথা বলে পালিয়ে যেতো বাড়ি থেকে। যাবার সময় তালা লাগিয়ে দিতো দরজায় যাতে সেই মানুষটি আর বের হতে না পারে। প্লেগ সেই সময়ে সমাজ ও পরিবারের গঠন ভেঙে দিয়েছিলো। যেমন ভেঙে দিয়েছিলো মানুষের মানবিকতা আর ভালোবাসার মানসিক গঠনকে। স্বজনরাই অসুস্থদের ফেলে পালিয়ে যেতো। মানুষে মানুষে ছড়িয়ে পড়েছিলো অবিশ্বাস আর নির্মমতা।

বহু মানুষ তখন মনে করতো সমাজ পাপে ছেয়ে গেছে তাই ঈশ্বরের শাস্তি হিসেবে পৃথিবীতে নেমে এসেছে প্লেগ। তখনকার বিভিন্ন ধর্মগোষ্ঠী অসুখটিকে ঈহুদীদের চক্রান্ত হিসেবেও চিহ্নিত করার চেষ্টা করে। তারা প্রচার করে, ঈহুদীরা খাবারে বিষ মিশিয়ে দিচ্ছে খৃষ্টানদের হত্যা করার জন্য। ধর্মগোষ্ঠীর মানুষরা বিশেষ করে পুরহিতরা তখন ঝাঁপিয়ে পড়ে ঈহুদী সম্প্রদায়ের ওপর। বহু জায়গায় মিথ্যা প্রচার করে ঈহুদীদের জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যাও করা হয়।

প্লেগের সময় ইউরোপের সমাজে অপরাধপ্রবণতা ছড়িয়ে পড়ে। বেড়ে যায় সম্পত্তি দখল, খুন আর ধর্ষণের ঘটনা।অসুখে বিপর্যস্ত মানুষ অনৈতিক জীবন যাপন করতে শুরু করে। যে বাড়িগুলোতে শুধু অসহায় আক্রান্ত মানুষ  থাকতো সেখানে ঢুকে পড়তো দখলদাররা। সেই অসুস্থদের খুন করে তারা দখল নিতো বাড়িটার। এই অপরাধীরা অনেক সময় দলবেঁধে বিভিন্ন জায়গায় তখন বাড়ি আর সম্পত্তি দখল করতো, লুট করতো অর্থ।

প্লেগের কালে বদলে যায় মানুষের যৌন সম্পর্কের সংজ্ঞাও। প্লেগে আক্রান্ত ধনাঢ্য এবং পরিত্যক্ত রমণীরা তখন তাদের শরীরের মোহ ছড়িয়ে বাঁধতে চাইতো গৃহপরিচারকদের। সেই সময়ে ইউরোপের কবরখানাগুলো হয়ে উঠেছিলো পতিতাদের মধুকুঞ্জ। মদ এবং শরীরের কেনাবেচা দেদার চলতো সেখানে। জুয়ার আড্ডাও বসতো কবরখানায়। কিছু মানুষ মৃত্যুর ঝুঁকি উপেক্ষা করে তখন উপভোগের জীবনকে বেছে নিতো মৃতদের রাজ্যে। তখন ইতালীর প্রখ্যাত লেখক ও কবি জিওভান্নি বোকাচ্চিও’র লেখায় এমন সমাজচিত্র পাওয়া যায়। প্লেগ ৫ বছর ধরে তাণ্ডব চালিয়ে বিদায় নেয়ার পরেও ইউরোপের মানুষদের মধ্যে এই অভ্যাসটি বাসা বেঁধেছিলো।

ইউরোপে প্লেগ পাল্টে দিয়েছিলো কৃষি নির্ভর জীবনকেও। প্রচুর মানুষের মৃত্যুতে সেখানে মাঠে কাজ করার জন্য কোনো লোক পাওয়া যেতো না। মাঠের ফসল নষ্ট হতো মাঠেই। জার্মানী ও স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশগুলো তখন মাংস রপ্তানীর দিকে ঝুঁকে পড়ে। পর্তুগালের মানুষ মনযোগী হয়ে ওঠে মাছ ধরার পেশায়। এই দেশগুলোতে শুরু হয় গবাদী পশু পালনের কাজ। বহু দেশে ভেড়ার লোম থেকে উল তৈরি করে রপ্তানীই হয়ে ওঠে নতুন আয়ের পথ।

প্যারিসে ১৩৪৮ সালে চিকিৎসকরা প্লেগের গতিপ্রকৃতি বোঝার জন্য গবেষণা শুরু করে। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে তারা এই রোগের কোনো কারণ খুঁজে না পেয়ে শেষে বলে আধা ঐশ্বরিক আধা বায়ুদূষণের কারণেই এই অদ্ভুত অসুখের বিস্তার ঘটছে। শেষে ইউরোপের মানুষ সামাজিক ভাবে প্লেগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে আবার প্লেগ দেখা দিলে মানুষ আক্রান্তদের শহরের বাইরে নিয়ে একটি আলাদা জায়গায় রাখার ব্যবস্থা করে। সেখানে এদেরকে ৩০ দিনের জন্য আলাদা করে রাখা হতো।খুব কাছের মানুষরা ছাড়া সেখানে কারো প্রবেশের অনুমতি ছিলো না। সম্ভবত এখনকার কোয়ারেন্টাইন করার ধারণাটি এসেছে সেই সময়ের মানুষদের কাছ থেকেই।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ হিস্ট্রি চ্যানেল
ছবিঃ গুগল    

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]