কে যেন ডেকেছে আমায়…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কে যেন কাউকে ডাকে, কখনো বাইরে থেকে, কখনো বুকের ভেতরে বসে অবিরাম ডাকতে থাকে।কে ডাকে কাকে? সে ডাকের অনুবাদ করা যায় সব সময়? বোঝা যায় সব ডাকের অর্থ! রবীন্দ্রনাথের ডাকঘর নাটকের অমল দইওয়ালার ডাক শুনে তার সঙ্গে চলে যেতে চেয়েছিলো। বলেছিলো, ‘ আমি যদি পারতুম তোমার সঙ্গে চলে যেতুম’।এইসব ডাক মানুষকে কোথায় যেন নিয়ে যায়! ‘দই-দই, ভালো দই’ এই ডাকটাই অমলের মনকে ঘর থেকে বাইরে নিয়ে গিয়েছিলো। মানুষকে কখনো নদী ডাকে, পাহাড় ডাকে, মাথার উপার স্কাইলিটে আছড়ে পড়ে পাখির ডাক জীবনানন্দের কবিতায়। মানুষকেও মানুষ ডাকে, ডাকতে থাকে। সেই ডাকের ধ্বনি কখনো এসে পৌঁছায় আবার কখনো পৌঁছায় না। এক আশ্চর্য সংকেত এই ডাক। হরবোলা ডেকে ওঠে পশু-পাখির স্বর নকল করে, ফেরিওয়ালার ডাকে গোটা শৈশব এসে দাঁড়ায় মনের বারান্দায়। টেলিফোনে কারো কন্ঠস্বর বুকের ভেতরে তৈরি করে একলা ডাকঘর, যেখানে দিনের পর দিন পড়ে আছে একটাই চিঠি। নিরন্তর এই ডেকে যাওয়া, ডাকতে থাকাকে অনুভূতি ছাড়া আর কোনোকিছু দিয়েই বোঝা যায় না।
ঘনিষ্ট, নির্জন আর স্মৃতি জাগানিয়া ডাক নিয়েই এবারের প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো ‘কে যেন ডেকেছে আমায়’।

শৈশবে বই পড়েছিলাম ‘নিশির ডাক’। নামটা পড়েই জানতে ইচ্ছে করেছিলো নিশির ডাক কেমন? রাত্রি কাউকে ডাকে? সে আবার কেমন ডাক! কেউ কেউ বলেন, রাত্রি নাকি মানুষের আত্মাকে কখনো অধিকার করে নেয়। তখন সেই রাতে পাওয়া মানুষ ঘর ছড়ে বের হয়ে পড়ে অজানার উদ্দেশ্যে। অদ্ভুত তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আজও গ্রামে এরকম গল্প শোনা যায়। নিশির ডাকে ঘর ছাড়া মানুষের গল্প। শুধুই কি রাত্রি ডাকে? রোদের উত্তাপে পুড়তে থাকা দুপুর ডাকে না? গলির মোড়ে যখন টুং টুং ঘন্টা বাজিয়ে আইসক্রিমের গাড়ি এসে দাঁড়াতো তখন সেই ভর দুপুরের ডাক এসে পৌঁছাতো বন্ধ দরজার ওপাশে। ডেকে যেত কটকটিওয়ালা, চিনির তৈরি হরিণ আর গ্লাসওয়ালা। সকালবেলা ডেকে যেত পুরনো খবরের কাগজওয়ালা। তারা নির্দিষ্ট কাউকে ডাকতো না। কিন্তু সেই ডাক ছড়িয়ে পড়তো সবার কানে। মনে হতো কতদিনের স্বজন ডেকে যাচ্ছে। তাদের প্রত্যেকের ডাকের আলাদা আলাদা সুর ছিলো। সেই ডাকের সুর অগ্রাহ্য করতো দুপুরের রোদ, ঘড়ির কাটার শাসন আর কারো রক্তচক্ষু। সেই ডাক ঘরকে করতো পর আর বাহিরকে আপন।
স্কুলে নাম ডাকার খাতা। সে-ও তো এ ধরণের ডাক। ডেকে ডেকে দেখা নেয়া সবাই হাজির কি না। তখনও কোনো একটি নাম বুকের ভেতরে কাঁপন ধরিয়ে দিতো, ঢেউ উঠতো। ভীরু দৃষ্টি এক পলকে দেখে নিতো ক্লাসঘরের কোনো একটি নিদিষ্ট বেঞ্চিতে বসা কাউকে। ডায়াল ঘোরানো টেলিফোনের যুগে ডাক আসতো মিষ্টি রিনরিনে মিষ্টি সুরে। প্রথমে একটা রিং তারপর কেটে দিয়ে আবার দুটো…বুঝবে আমি ফোন করছি। এমন ডাকের মাঝেও এক সমুদ্র চাওয়া পাওয়ার গল্প ছিলো। কথার পাখিরা উড়তে উড়তে পৌঁছে যেত ঠিক সেই নির্দিষ্ট ঠিকানায়। সেই ডাকের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতো অপেক্ষাও। ডাকের অপেক্ষা। কখন ফোন বাজবে। কখনো বাজতো না সেই টেলিফোন। অপেক্ষা মরে যেতো, সময় ফুরিয়ে যেতো। পূর্ণেন্দু পত্রীর কবিতার সেই বিখ্যাত চরণ,
‘যে টেলিফোন আসার কথা সে টেলিফোন আসেনি।
প্রতীক্ষাতে প্রতীক্ষাতে সূর্য ডোবে রক্তপাতে
সব নিভিয়ে একলা আকাশ নিজের শূন্য বিছানাতে্।
একান্তে যার হাসির কথা হাসেনি।
যে টেলিফোন আসার কথা
সে টেলিফোন আসেনি’।
এমনি করে কত ডাক ফিরেও যায়। নির্দিষ্ট চিঠি ডাকঘরে পৌঁছায় না।ফোনের ডাকের অপেক্ষায় থেকে হয়তো রাত ফুরিয়ে যায়।
সবাইকে আবার নাম ধরেও ডাকা যায় না। পাড়ার গলি অথবা খেলার মাঠ যখন ডাকে তখন বন্ধুদের বাড়ি থেকে বের করতে চাইলে তো নাম ধরে ডাকা যায় না।তখন সংকেত পাঠাতে হয়। একেক বন্ধুর জন্য একেক ধরণের সংকেত। কখনো কেউ দুহাত মুখের কাছে জড়ো করে হুবহু কোকিলের ডাক ডেকে উঠলে জানতে হয় দেয়াল ঘড়ির কাচের ডায়াল খুলে কাটা্ এগিয়ে দিয়ে এখন ঘরছাড়া হতে হবে। কখনো বন্ধুকে ডাকার ছলে অন্য এক বাড়ির সামনে গিয়ে নিজের নাম ধরেও ডাকতে হয় যাতে কেউ বারান্দায় ছুটে আসে। সে ডাকের কোনো উত্তর পাওয়া যায় না। উত্তর থাকে না কিন্তু চোখে অপেক্ষার ছায়া থাকে, সাড়াও।
চব্বিশ অথবা পঁচিশ বছর বয়সের কয়েক তরুণ কোনো এক বৃষ্টির দিনে হোস্টেলে তাস খেলার আয়োজনে বসে দেখে এক পার্টনার উধাও। তাহলে খেলা হবে কীভাবে? কোথায় গেলো নিয়মিত সেই পার্টনার? খোঁজো তাকে। জানা গেলো, সকালে হোস্টেল থেকে বের হয়ে সে গেছে এক এলাকায় আত্মীয়র বাড়ি। সেই দঙ্গল তখনই ছুটলো। কিন্তু বাড়ি না-চিনলে এত বড় এলাকায় কাউকে খুঁজে বের করা তো খড়ের গাঁদায় সুঁইয়ের খোঁজ। কিন্তু একজনের মাথায় অদ্ভুত এক বুদ্ধি এলো। রাস্তা ধরে যেতে যেতে তার নাম ধরে ডাকতে ডাকতে যাওয়া যেতে পারে। সাড়া পাওয়া যাবেই। যে কথা সেই কাজ। আশ্চর্য, এক ঘন্টা এ রাস্তা সে রাস্তায় নাম ধরে ডাকাডাকি করতে করতে পুরো এলাকার মানুষকে বৃষ্টির সকালে বিরক্ত করে সত্যিই পাওয়া গেলো তাস খেলার সেই পার্টনারকে। এক দোতলা বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে তার তখন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। এভাবেও ডাকা যায়। ডাকতে জানলে হয়তো সাড়াও মেলে।
মিসড কলের যুগ এখন। আগেই জানিয়ে দেয়া আছে, ডাকলেই পাওয়া যাবে না। ডাক শুনতে না-চাওয়ার জন্য কত আয়োজন করতে হয় এখন। মোবাইল ফোন সুইচড অফ করো, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ডি-অ্যাক্টিভ। সব দরজা, জানালা বন্ধ। সাড়া না-দেয়ার এত আয়োজন। বিচ্ছিন্নতার পূর্তি উৎসব। কিন্তু এখনো স্মৃতির ভেতরে ডাকের রেশ থেকে যায়। কে যেন আজও ডাকতে ডাকতে চলে যাচ্ছে সামনের গলি দিয়ে। অমলের সেই দইওয়ালা, যে ঘরের মনকে বাইরে নিয়ে যায়? সেই কয়েনবক্স ফোনে দুটো বাঘমার্কা সিকি ঢুকিয়ে কবি ত্রিদিব দস্তিদার লেখেন, ‘‘ তোমাকে ডাকতে হলে ব্যাঘ্র পাঠাতে হয়’’। মুখে দুই হাত জোড়া করে কেউ ডেকে ওঠে হুবহু কোকিলের গলায়? আইসক্রিমের গাড়ির টুং টাং ঘন্টা টেনে নিয়ে যায় আজও? টেলিফোনে সংকেতময় ধ্বনি ওঠে? কেউ কেউ আজও হয়তো শুনতে পায় সেই ডাক। বিকেলবেলা ছাদের সিঁড়িতে কেউ গেয়ে ওঠে-কে যেন গো ডেকেছে আমায়…

ইরাজ আহমেদ
ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box