কোভিড ১৯ ও আমাদের যাপিত জীবন…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লুতফুন নাহার লতা (অভিনয় শিল্পী, লেখক)

কালরাতে চাঁদ উঠেছিলো আকাশে। মধ্যরাতে বিছানায় এলিয়ে পড়তে পড়তে জানালার কাঁচের ভেতর দিয়ে চোখ চলে গেছে মধ্যরাতের আকাশে। উজ্জল প্রান্তর ভাসানো চাঁদের আলোয় ভেসে চলেছে চরাচর। সে আলোয় খুব স্পস্ট দেখতে পাচ্ছি সারা পৃথিবীতেই মৃতমানুষের মিছিল। আর এই মুহূর্তে আমাদের প্রতিবেশী বন্ধু দেশ ভারত, কিম্বা এইভাবে বলি, একসময় আমাদের পূর্বপুরুষের একত্রিত স্বদেশ ভারতবর্ষে কোভিড-১৯ এর তান্ডবে ভয়াবহ মৃত্যুর মিছিল। ভারত আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সাথী, মানবতার হাত বাড়িয়ে ১৯৭১ সালে অকৃত্রিম বন্ধুর মত এক কোটিরও বেশী শরনার্থীকে আশ্রয় দিয়ে, খাদ্য দিয়ে, চিকিৎসা দিয়ে সাহায্য করে বাঁচিয়ে রেখেছিলো আমাদের।১৯৭১ এ আমাদের জন্যে ভারতের জনগনের সহমর্মিতা ভুলে যাবার নয়। আজ সেই ভারতের অগনিত মানুষের এই ভয়াবহ মৃত্যু, অসহায় আর্তনাদ, স্বজনের আহাজারি আমাকে ভয় ভাবনা উৎকন্ঠা আর অশান্তিতে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। ২০২০ এর এপ্রিলে আমি যে দেশে এবং যে শহরে বাস করি, পৃথিবীর সেরা দেশ হয়েও আমেরিকাকে যেতে হয়েছিলো এরকম বিপর্যয়ের ভেতর দিয়ে, বিশেষ করে আমার শহর নিউইয়র্ককে।

ঠিক তেমনি আজ ভারতের বিভিন্ন শহরেও চলছে একই অবস্থা। অসুস্থ এবং কোভিডাক্রান্ত রোগীদের জন্যে পর্যাপ্ত অক্সিজেন নেই, অক্সিজেন সিলিন্ডার নেই, ভেন্টিলেটর নেই, পর্যাপ্ত সেনিটাইজার, মাস্ক নেই , টেস্ট করার ব্যবস্থা নেই, হাসপাতাল গুলো উপচে পড়ছে রোগীর ভিড়ে। হাসপাতালে বেডের অভাব পুরন করা এই মুহুর্তে সম্ভব হচ্ছে না। ডাক্তারেরা অসহায়।প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট, এপ্রিলের গরম সব মিলিয়ে ভারতের বিভিন্ন শহর হয়ে উঠেছে এক নরক। বিশেষ করে দিল্লী। চারিদিকে সাদা চাদরে মোড়ানো স্তূপীকৃত অগনিত মৃতের দেহাবশেষ। বুকের ভেতর হাহাকার করছে এক শূণ্য মাঠ। সেই মাঠে সম্ভবত ছয় ফুট দূরে দূরে চিতা জ্বলছে। আগুন জ্বলছে বুকের ভেতর আর মানুষ পোড়ার গন্ধ ভেসে আসছে ভারত থেকে পৃথিবীর এই দূর প্রান্তরে যেখানে স্বজনহারা আমার দিনরাত্রির গোপন অশ্রুবাস্প রচেছে এক আশ্চর্য মেঘদল।

বাংলাদেশেও আবার করোনার ২য় ঢেউ ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে মানুষের মূল্যবান জীবন। চোখের পলকে ঘটে যাচ্ছে দূর্ঘটনা। সম্প্রতি হারিয়েছি আমাদের প্রাণপ্রিয় রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ও বন্ধু মিতা হককে, ইন্দ্রমোহন রাজবংশী, শ্রদ্ধেয় নাট্যজন আলী জাকেরকে, প্রিয় অভিনেত্রী কবরীকে, জনাব শফিউজ্জামান লোদী, এস, এম মোহসীন, সঙ্গীত পরিচালক ফরিদ আহমেদ, নায়ক ওয়াসিমকে। করোনায় আক্রান্ত অগনিত আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব, অভিনেতা আবুল হায়াত, নাট্য পরিচালক আফসানা মিমি, চয়নিকা চৌধূরী ও আরো অনেকেই। মৃত্যু তো সেই ২০২০ এর মার্চ থেকে আমাদের পায়ে পায়ে জড়ানো। আর এও সত্যি, কোভিড-১৯ মৃত্যু খুব সহজ বিষয় নয়। ভয়াবহ শ্বাসকষ্ট, আর বাতাসে অক্সিজেনের বড় অভাব।

আমাদের পরিচিত পৃথিবী থেকে সেই শ্বাসরুদ্ধ মৃত্যু খুব, খুব আলাদা। আমার চারিদিকে অগনিত পরিবার ভেঙে চুরমার। অগনিত পরিবার স্বজন হারা। শিশুরা হারিয়েছে তাদের বাবাকে, কেউ বাবা এবং মা দু’জনকেই। স্ত্রী হারিয়েছেন স্বামী আবার কোথাও কোথাও স্বামী, স্ত্রী দুজনেই মৃত্যুর কোলে আশ্রয় নিয়েছেন। এ এক অকল্পনীয় অনিশ্চিত জীবনের পারাবার। বিগত এক বছরেও বেশি সময় ধরে আমরা কেউ কোথাও স্বাভাবিক জীবনে আর নেই। মানুষের এই পৃথিবী জড়িয়ে ছিলো মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা, মায়া, মমতায়, চুম্বনে, আলিঙ্গনে। একে অপরের সঙ্গে নদীর জলের মত লেপ্টালেপ্টি করে আমরা বেঁচে থাকি। মা, বাবা, ভাই-বোন, বাচ্চারা, আমাদের ‘পরম সন্তানেরা’ (গ্রান্ড চিল্ড্রেন) সবাই তো আমরা বেঁচে থাকি নিত্যদিনের ছোঁয়ায়, স্পর্শের চুম্বক শক্তিতে। ভালোবাসার এক জাদুকরী নিরাময়ে।

কোভিড-১৯ এসে আমাদের নিয়মতান্ত্রিক সেই জীবনকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। রুখে দিয়েছে আমাদের প্রাণের স্পন্দন। এই রোগ জ্বর , কাশি, ব্যথা, ভয়াবহ শ্বাসকষ্ট আর মাটিতে মিলিয়ে যাবার মত দূর্বলতা দিয়ে অগনিত মানুষকে পরাজিত করছে। আর কাউকে কাউকে রেখে যাচ্ছে নানারকম ভঙ্গুর স্বাস্থ্যে, যার গভীর তত্ব তালাশ আমরা এখনো জানিনা। বিজ্ঞানীরা বলছেন তারাও জানেন না এর আফটার ম্যাথ কি হতে পারে। যাদের লাঙস, কিডনি, উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট, ডায়াবেটিস, অ্যাজমা , ক্যান্সার, এবং অন্যান্য সমস্যা আছে তাদের আর রক্ষা থাকছে না। নানা রকম ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে নিদেনপক্ষে যাদের জীবন টুকু রেখে যাচ্ছে তাদের ভবিষ্যৎ আমরা কেউ জানিনা। এখন ঘরে ঘরে মানসিক রোগ দানা বাঁধছে। সবাই ঘরে, একসঙ্গে এত দীর্ঘ সময় তো আর থাকা হয়নি কারোই।

প্রথম প্রথম এই পাশাপাশি থাকতে পারাটা যুগলদের জন্যে কবি বুদ্ধদেব বসুর চিল্কায় সকালের মত আনন্দময় মনে হচ্ছিলো। সব দুর্দশার ভেতরে কিছুটা হলেও নির্ভরতা পাচ্ছিলো মানুষ। কিন্তু সবাই আমরা ধৈর্য্যের শেষ সীমানায় এসে গেছি। ছোটখাটো ব্যাপারেও তুমুল মেজাজ খারাপ হচ্ছে। একটি পরিবার যখন অনিশ্চিত মহামারী বুকে বয়ে আতংকিত থাকে অথবা মৃত্যুর ভেতর দিয়ে যায়, এর প্রতিটি সদস্য একটি ট্রমার ভেতরে থাকে। সেই ট্রমার প্রতিফলন এখন ঘরে ঘরে। কি করব তা জানিনা , কোথায় যাব তা জানিনা, কি হবে সামনে তাও জানিনা। যে ছেলেমেয়েরা এখন প্রেম করে ঘুরে বেড়াবে তারা গৃহবন্দী। যে মায়েরা এখন ছেলে মেয়ের বিয়ের বাজার করবে, কিম্বা স্বামীর সঙ্গে

হিমালয় দেখতে যাবে তারা গৃহবন্দী। যে সব যুগল এখন দেশ বিদেশ হানিমুন করে বেড়াবে তারা আটকে আছে। যে ছেলেমেয়ে স্কুলে , কলেজে, খেলাধুলায় গবেষনায় ব্যস্ত থাকবে তারা সব একটি অভিশপ্ত অনুজীবের কাছে বন্দী। কি হবে আমাদের আগামীর দিন গুলো! প্রিয় এক ছোটবোনের নর্থ কারোলাইনাতে তাদের বাড়িতে ক্রিসমাস উৎসবের পরে প্রায় ১০ /১২ জন কোভিডাক্রান্ত হয়েছিলো।

একমাস হাসপাতালে জীবন যুদ্ধ শেষে হেরে গেলেন ওদের বেশ ক’জন। আমার নিকট বন্ধুর মা কাল থেকে নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতালে আছেন অচেতন। প্রতিদিন টুপ টূপ করে ঝরে যাচ্ছে মানুষ, শ্বাস বন্ধ ঝরা পাতার মত। মৃত্যু যেনো একটি নিঃশব্দ শিশিরের ঝরে পড়া ছাড়া আর কিছুই না। এত সহজ হয়ে গেলো মানুষের মৃত্যু! তবু প্রার্থনা করি, পৃথিবী আবার সুন্দর হয়ে উঠুক। উঠুক সূর্য পূবের আকাশে। মানুষ সেরে উঠুক। মানুষ সুস্থতা ফিরে পাক। আবার নদীর পানি খল খল করে উঠুক। মানুষ মানুষ বলে মানুষের কাছে আসুক। মায়ের সন্তান মায়ের চুম্বনে বিজলির মত অনিন্দ্য সুন্দর হাসিতে ভরিয়ে দিক ভুবন। আমাদের মা বাবা, ভাইবোন, পূত্রকন্যার হাতে সোনার স্বপন থাকুক। আবার ফিরে আসুক সুদিন। আমি বুক বেঁধে এই দাঁড়িয়েছি দ্যাখো, বারে বারে হেলব না গো!

ছবি: গুগল

 

 


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box