ক্যানভাসে ঝরে পড়া অসুখ

মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর ছিলো তীব্র হাতের যন্ত্রণা, লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ছিলো ট্রাবিজাম নামে চোখের রোগ আর পল গ্যঁগা’র মৃত্যু রহস্যময় রোগে আর ক্লদ মনে তো চোখে ছানি পড়ার সেময়েই এঁকেছিলেন তাঁর সবচাইতে বিমূর্ত ছবিগুলো। এই মহান চিত্রকরদের অসুখ নিয়ে এত বছর পর গবেষণা শুরু করেছেন চিকিৎসাবিজ্ঞান। আর এই রোগ নির্ণয়ে তাদের একমাত্র পর্যবেক্ষণ মাধ্যম হলো শিল্পীদের আঁকা আত্নপ্রতিকৃতি।

চিত্রকরের ক্যানভাসে রঙে, রেখায় ফুটে ওঠে আশ্চর্য সুন্দর। ভাস্কর্য শিল্পীর ভাবনার উতল হাওয়া মানুষকে রঙের সরণী ধরে উড়িয়ে নিয়ে যায় চেতনার নতুন স্তরে। একজন চিত্রশিল্পী আঁকেন, আঁকতে আঁকতে রঙের স্তর ভেদ করে আরো গভীরে গিয়ে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলেন নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গী।  সে দৃষ্টিভঙ্গী শিল্পীর একান্ত দেখার আলোয় উজ্জ্বল।

বিজ্ঞান বিশেষ করে চিকিৎসাবিজ্ঞানেও এই দৃষ্টিভঙ্গী অথবা পর্যবেক্ষণের আলাদা জগত আছে। চিকিৎসকের সতর্ক চোখও দেখে নেয় রোগীর সমস্ত লক্ষণ। তাদের এই অনুসন্ধানী দৃষ্টি এবার বড় বড় চিত্রকরদের ছবিতেও ফেলেছে অনুসন্ধানের জাল। আর তাতে উঠে এসেছে নানা তথ্য সেইসব অমর চিত্রকরদের অসুখ নিয়ে। শিল্পীর তুলিতে ক্যানভাসে ঝরে পড়েছে অসুখ। আর সে অসুখ নির্ণয় করেছে চিকিৎসাবিজ্ঞান।

মাইকেল অ্যাঞ্জেলো

প্রাণের বাংলার এই সংখ্যায় প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো, ‘ক্যানভাসে ঝরে পড়া অসুখ’।

   সম্প্রতি আমেরিকার কয়েকটি মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ক্লাসের লেখাপড়ায় অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছে চিত্রশিল্প দেখার বিষয়টা। গবেষকরা মনে করছেন এ ধরণের চিত্রশিল্প গভীর মনযোগে দেখে প্রয়াত শিল্পীদের স্বাস্থ্যের সাতকাহন খুঁজে বের করার চেষ্টা ভবিষ্যত চিকিৎসকদের দক্ষতা বাড়াবে। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে তাদের এই অনুসন্ধান ইতিমধ্যেই আড়াল খুঁড়ে তুলে এনেছে অমর শিল্পীদের অসুখের অজানা অধ্যায়।

মাইকেল অ্যঞ্জেলো’র বয়স তখন সত্তরের বেশি। তাঁর লেখা পুরনো চিঠি ঘেঁটে পাওয়া গেছে তিনি এক ভাইয়ের ছেলেকে লিখেছিলেন, ভাস্কর্য সৃষ্টির জন্য তার প্রধান মাধ্যম হাতের ব্যথার কথা। শিল্পী লিখছেন, ‘‘হাতের ব্যথা আমাকে ভীষণ যন্ত্রণা দিচ্ছে’’। চিঠির সূত্র ধরে শুরু হলো গবেষণা। কিন্তু তাতে বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়ালো ফ্লোরেন্সের সান্তা ক্রোসি চার্চের কর্তারা। তারা কিছুতেই কবর খুঁড়ে শিল্পীর দেহাবশেষ তুলে চালাতে দেবেন না প্যাথোলজিক্যাল পরীক্ষা। কিন্তু গবেষকদের তো আর আটকে রাখা যায় না। তারা মাইকেল অ্যাঞ্জেলো’র দুটি আত্নপ্রতিকৃতির সাহায্য নিলেন। পাঁচজন চিকিৎসাবিজ্ঞানী সেই চিত্রকর্মের ভেতরেই খুঁজে শুরু করলেন শিল্পীর অসুস্থতার ইঙ্গিত। আঁকা ছবিতে অ্যাঞ্জেলোর ফুলে ওঠা হাত আর বাঁকা আঙুল গবেষকদের মাথায় ঢুকিয়ে দিলো চিন্তার সূত্র। মাইকেল অ্যাঞ্জেলো ভুগছিলেন ‘অস্টিওআর্থাইটিস’ নামে হাড়ের রোগে। দীর্ঘ সময় ধরে হাতুড়ি-বাটাল নিয়ে কাজ করাতেই তাঁর হাতের হাড় আক্রান্ত হয়েছিলো এই রোগে। নড়বড়ে হয়ে যাওয়া হাতের হাড়ের ব্যথার কথাই তিনি উল্লেখ করেছেন চিঠিতে। আঙুল আর হাতের ফুলে ওঠা আড়ষ্ট গড়ন দেখে চিকিৎসবিজ্ঞানীরা জেনে ফেললেন শিল্পীর অসুখের কথা।

লিওনার্দো দা ভিঞ্চি

আমেরিকার মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের ২০১৮ সালে প্রকাশিত জার্নালের নিবন্ধ বলছে, প্রখ্যাত শিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চি চোখের ‘স্ট্র্যামবিজামস’ রোগে ভুগতেন। তারা শিল্পীর আঁকা বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘সালভাটর মুন্দি’ গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করে এই রোগটা আবিষ্কার করেছেন।

পল গগ্যাঁ

কেমন করে বোঝা গেলো ইতালীর নবজাগরণের সময়কার এই অসামান্য চিত্রকরের চোখের রোগের কথা। বিজ্ঞানীরা বলছে, পথটা খুব সহজ ছিলো না।ছবিটা খুব গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে হঠাৎ তারা লক্ষ্য করেন ফ্রেমেবন্দী শিল্পীর আঁকা যিশুর চোখজোড়া।আর সেই চোখ দেখতে গিয়েই চোখের চিকিৎসকরা ধরে ফেলেন ভিঞ্চির চোখের রোগের বিষয়টা। তারা দেখেন, ভিঞ্চি’র আঁকা যিশুর চোখের মাপে তারতম্য আছে। সঙ্গে সঙ্গে কাজ করতে শুরু করে দেয় চিকিৎসকদের চিন্তা। মানুষের বেলায় এ ধরণের কাণ্ড সাধারণত ঘটে দুই চোখে যদি দৃষ্টি সমান না হয়। এটা একটা অসুখ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এর নাম ‘স্ট্র্যমবিজামস’। দু’চোখে সমান না-দেখলে মানুষের আঁকায় এমন গোলমাল হতে পারে। ভিঞ্চিরও হয়েছিলো।

তবে গিবেষকরা বলছেন, ভিঞ্চির এক চোখে দেখার ব্যাপারটা তাঁর জন্য ইতিবাচকই হয়েছিলো। কারণ শিল্পীরা সাধারণত বাইরের জগতকে যেভাবে দেখতে চান একচোখে অনেক সেরকমই দেখেন। সেই এক চোখের দৃষ্টি তাদের মনের বাইরের জগতকে নিজের চেতনার মতোন করেই ভেতরে প্রক্ষেপ করে।আর তাআঁকা ছবিটাও হয়ে ওঠে অসাধারণ কিছু।

ভিনসেন্ট ভ্যান গখের বন্ধু পল গগ্যাঁ। ইমপ্রেসনিস্ট যুগ পরবর্তী সময়ের এই শিল্পীর আঁকা ছবি আজো পৃথিবীর শিল্পের ভুবনকে আলোড়িত করে রেখেছে। গগ্যাঁ মৃত্যুবরণ করেন ১৯০৩ সালে।ফ্রান্সকে পেছনে ফেলে প্রায় নির্বাসনে চলে গিয়েছিলেন মারকুইস নামে দ্বীপে। সেখানেই জীবনের শেষদৃশ্য পর্যন্ত।গগ্যাঁ মারা যাবার পর উদ্ধার হয় তার চারটি দাঁত। একটি কাচের পাত্রে নিজের দাঁতগুলো অজ্ঞাত কারণে তিনি রেখে গিয়েছিলেন। কিন্তু এই দাঁত পরে গবেষকদের গবেষণার কাজে লেগেছে শিল্পীর বংশগতি খুঁজে বের করতে।

ক্লদ মনে

অনেকে বলেন গগ্যাঁ মারা গিয়েছিলেন তখনকার দিনে দূরারোগ্য সিফিলিস রোগে। খুব অদ্ভুত ভাবে গগ্যাঁর দাঁতগুলো একদল নৃ-বিজ্ঞানী ২০০০ সালে উদ্ধার করেন সেই দ্বীপে গগ্যাঁর ভাঙ্গা কুটিরের পাশে একটা কুয়ার অতল থেকে। একটা শক্ত লোহার কৌটায় কাচের পাত্রে দাঁতগুলো রক্ষিত ছিলো। শিল্পীর দাঁত হাতে পেয়ে আমেরিকার ‘ডেন্টাল অ্যানথ্রোপলজিক্যাল সোসাইটি’-এর দুজন দাঁতের ডাক্তার শুরু করেন গবেষণা। মুখের পেছন ভাগের শক্ত চারটি দাঁত তারা প্রথমেই পরীক্ষা করেন এগুলো আদ্যে গগ্যাঁর দাঁত কিনা দেখতে। পরে গগ্যাঁর আজো জীবিত এক নাতির ডিএনএ পরীক্ষা করে তারা মিলিয়ে দেখেন সেই চারটি দাঁতের ডিএনএ পরীক্ষার ফলের সঙ্গে। এতে তারা নিশ্চিত হন এগুলো গগ্যাঁর-ই দাঁত।

এরপর শুরু হয় শিল্পীর অসুখ নিয়ে পরীক্ষা। তারা দাঁতে ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক এবং মার্কারীর পরিমাণ পরীক্ষা করে দেখেন। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে শরীরে এ ধরণের খনিজ উপদানের বাড়তি পরিমাণের উপস্থিতি ইঙ্গিত করে সিফিলিস রোগের দিকেই। কিন্তু মজা হচ্ছে গগ্যাঁর দাঁতে তারা এই উপাদানগুলো অতিরিক্ত পরিমাণে খুঁজে পাননি। তবে তাতেও গবেষকরা এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি যে গগ্যাঁ সিফিলিস রোগে আক্রান্ত ছিলেন না।

আরেক অসাধারণ চিত্রকর ক্লদ মনে।ইম্প্রেশনিস্ট যুগের এই শিল্পী জন্মেছিলেন ফ্রান্সে। ২০১৫ সালে বৃটেনের চিকিৎসাবিজ্ঞান সংক্রান্ত একটি জার্নাল জানাচ্ছে, মনে নিজের জীবনের প্রায় শেষদিকেই সবচাইতে বিমূর্ত ছবিগুলো এঁকেছিলেন। কিন্তু মজার তথ্য হচ্ছে তখনই এই শিল্পী চোখের অসুখে ভুগছিলেন।অসুখটার নাম চেখের ছানি বা ক্যাটারেক্ট। তাঁর দৃষ্টিশক্তি এতটাই ক্ষীণ হয়ে আসছিলো তখন যে রঙের টিউবে তাকে নাম লিখে লেবেল লাগাতে হতো।

এসব তথ্যের জন্য অবশ্য মনের ছবি নিয়ে খুব বেশি গবেষণা করতে হয়নি। তাঁর আঁকা আধো ছায়া আধো বিমূর্ততায় পরিপূর্ণ ছবিগুলোতে ব্যবহুত রঙ-ই গবেষকদের জানিয়ে দিয়েছে শিল্পীর চোখের অবস্থার কথা।

১৯১৩ সালে চোখের ডাক্তার মনে’র চোখে অস্ত্রোপচারের কথা বলেছিলেন। কিন্তু তিনি ভয় পেয়ে রাজি হননি। শেষে দশ বছর পর শিল্পী দৃষ্টির অন্ধত্ব সহ্য করতে না-পেরে শুয়ে পড়েছিলেন চিকিৎসকের ছুরির তলায়। সুস্থ হয়ে গিয়েছিলো তাঁর চোখ। আবার তিনি রঙ বুঝতে পারছিলেন। কিন্তু গবেষণা বলছে, সেই সময়ে ছবি রঙ লাগানোই বলে দিচ্ছে তখন ভালো করে দেখতে পাচ্ছিলেন না ক্লদ মনে।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

তথ্যসূত্রঃ সিএনএন

ছবিঃ গুগল