ক্যানারি আইল্যান্ড ভ্রমণ

বৈতরণী হক

ছোট বড় কয়েকটি দ্বীপ নিয়ে গড়ে উঠেছে ক্যানারি আইল্যান্ড। স্পেনের শাসনাধীন এই দ্বীপসমূহের মধ্যে সবথেকে বড় দ্বীপটি হলো টেনেরিফ। গত ডিসেম্বরে ঘুরে আসলাম সেই টেনেরিফে। লন্ডন গেটওয়িক এয়ারপোর্ট থেকে থমাস কুকের প্লেনে করে সাড়ে চার ঘন্টার পথ পাড়ি দিয়ে আমরা পৌঁছলাম সেখানে। তখন বড়দিন আর নতুন বছরের ছুটি চলছিলো, তাই অনেক মানুষ অবকাশ যাপন করতে ছুটছিল পর্যটন খ্যাত দ্বীপ টেনেরিফে। তবে আমাদের ফ্লাইটে সর্বকনিষ্ঠ পর্যটক ছিলো আমার দশ মাসের মেয়ে, তাই সবার একটু আলাদা ভালোবাসা কাজ করছিলো এই ক্ষুদে পর্যটকের জন্য। থমাস কুকের মাধ্যমে আমরা আমাদের ভ্রমণের সব ঠিক করেছিলাম। টেনেরিফ এয়ারপোর্টে পৌঁছতে হয়ে গেলো সন্ধ্যা। লাগেজ পেতে আরো সময় লাগলো। ছোট এই দ্বীপে ইউরোপের বিভিন্ন জায়গা থেকে পর্যটকরা বেশি আসে কারণ সারা বছর ব্যাপী এখানকার তাপমাত্রা থাকে ২২ থেকে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে।  এই সময়ে ইউরোপে খুব শীত নামার কারণে ভীড় জমায় ভ্রমণ পিপাসুরা টেনেরিফে। প্রতি বছর প্রায় এক কোটি মানুষ আসে এখানে বেড়াতে। যা বলছিলাম বেশ দেরি করে লাগেজ পাওয়ার পর এয়ারপোর্টের গেটেই পেয়ে গেলাম থমাস কুকের গাইডদের। তারা আমাদের বাসে নিয়ে গেলো। অবশেষে প্রায় ৪৫ মিনিট জার্নি করে পৌঁছলাম রিসোর্ট লস গিগান্টিসে।

পর্যটক বান্ধব দ্বীপ টেনেরিফের প্রধান ব্যবসা পর্যটন। সারা দ্বীপ জুড়ে হোটেল, রিসোর্ট, নিজেদের মত করে থাকার জন্য অ্যাপার্টমেন্টে ভরা। পর্যটকদের বিনোদন দেয়ার জন্য হোটেল আর রিসোর্ট গুলো রাখে অনেক ব্যবস্হা।  ছুটির মৌসুমে বেশির ভাগ মানুষ তাদের বাচ্চাদের আনন্দকে প্রাধান্য দিতেই যায় সেখানে। বাচ্চাদের জন্য খেলাধুলার সুব্যবস্হা থেকে শুরু করে ম্যাজিক শো, গান, নাচ, সার্কাস, অপেরা সব কিছু দিয়ে পারিবারিক ভাবে বিনোদনের আয়োজন থাকে। এমনটা দেখা যায় বিলাসবহুল ক্রুজ শিপগুলোতেও। পার্থক্য হলো এসব চলছে মহাসাগরের ধার ঘেষে আর ক্রুজ শিপে একই আয়োজন  থাকে সমুদ্রের মাঝে জাহাজের ভিতরে।

টেনেরিফের লস গিগান্টিসে আমাদের রুমের বারান্দা থেকে আটলান্টিক দেখা যাচ্ছে

 প্রথমদিন অনেক রাত হয়ে যাওয়াতে আমরা খাওয়া-দাওয়া সেরে ঘুমিয়ে পড়লাম। অসম্ভব ক্লান্ত ছিলাম আমরা। পরেরদিন সকালে বুঝলাম কত সুন্দর টেনেরিফ দ্বীপটি। ছিমছাম দ্বীপ, দেখে মনে হয় কোথাও কোন খুঁত নেই। আটলান্টিক মহাসাগরের গর্জন মনের মধ্যে এক অন্যরকম দোলা দিচ্ছিল। সে অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা আসলেই আমার জন্য দুরূহ। সকালে নাস্তা করে আমরা তিনজন বের হয়ে গেলাম আমাদের রিসোর্ট আর তার চারপাশ ঘুরতে। আমার মেয়েটা একটু বড় হলে কত যে আনন্দ পেতো কারণ বাচ্চাদের খেলার অনেক ব্যবস্হা আছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের আনন্দ দেখতেও ভালো লাগে। বিশাল এলাকা জুড়ে গড়ে উঠেছে রিসোর্টটি। একবার ঘুরে দেখে বেশ ক্লান্ত হয়ে গেলাম। তার আশেপাশে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট দোকান। বেশিরভাগ বিক্রি হয় সেখানে সমুদ্রস্নানের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী। আমরা টুকটাক কিছু শপিং করলাম তারপর ফিরে আসলাম সেদিনকার মত রিসোর্টে।

তৃতীয় দিনে সকাল সকাল আমরা ম্যাপ নিয়ে বের হয়ে গেলাম টেনেরিফ শহরটা ঘুরে দেখতে। হোটেল রিসেপশন থেকে কোথায় কিভাবে যেতে হবে আমরা জেনে নিলাম। বাসে চড়ে বসলাম। যেদিকে তাকাই সেদিকেই কলার গাছ। এখানকার প্রধান ফসল কলা। বানিজ্যকভাবে কলা চাষ করা হয়। টেনেরিফের একটা জমজমাট জায়গার নাম লস ক্রিস্টিয়ানোস। বিশাল জায়গা জুড়ে এই বিচ। হাজার হাজার মানুষের সমাগম। পুরো একদিন লেগে যাবে হেটে দেখতে লস ক্রিস্টিয়ানোস। সমুদ্রতটে অজস্র মানুষ বেড়াতে আসছে। পর্যটকদের জন্য গড়ে উঠেছে খাবারের দোকান, শপিং সেন্টার, ছোট ছোট রকমারি জিনিসের দোকান। হকারদের ও অভাব নাই। আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে মরক্কো, সেনেগাল, মৌরিতানিয়া থেকে অনেকেই এসেছে ভাগ্য অন্বেষণের জন্য টেনেরিফে। সানগ্লাস, স্কার্ফ, স্যান্ডেল, মাথার টুপি, বাচ্চাদের খেলনা কত কি বিক্রি করে তারা ঠিক যেন বাংলাদেশের হকারদের মতো। অনেকে আবার একটু ভিন্ন ভাবে অর্থ আয় করে যেমন শারীরিক কসরত দেখায় বা আগুন নিয়ে কসরত দেখায়। একটা কথা বলা ভালো ভীড় খুব বেশি বলে এই লস ক্রিস্টিয়ানোসে নিজের প্রয়োজনীয় আর মূল্যবান জিনিস যত্ন করে না রাখলে খুব বিপদ হতে পারে। একবার হারালে তা পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নাই বলা চলে। যেহেতু আমাদের সমুদ্রস্নানের কোন ইচ্ছা ছিলোনা আমরা ঘুরে ঘুরে দেখলাম জায়গাটি। আসলে এমন সব সুন্দর জায়গা ঘুরে দেখতেও বেশ লাগে। হোটেলে ফিরার আগে আমরা টিকিট করে আসলাম ইন্টার আইল্যন্ড ফেরি সার্ভিসের যার গন্তব্য ছিলো লা গোমেরা (গুমেরা)। লা গোমেরা হলো ক্যানারি আইল্যান্ডের আরেকটি দ্বীপ।

বানিজ্যিক ভাবে টেনেরিফ জুড়ে এভাবেই কলার চাষ করা হয়

পরদিন ভোর সাড়ে ছয়টার মধ্যে আমরা হোটেল থেকে বের হয়েই দেখি বাস দাঁড়িয়ে আছে। আমরা উঠে পড়লাম বাসে। বাস আমাদের নিয়ে যাত্রা শুরু করলো। দেখি অনেকে আামাদের মত  লা গোমেরা যাচ্ছে সারা দিনের জন্য। বাসে পরিচিত হলাম ষাটোর্ধ এক আইরিশ মহিলার সঙ্গে। ভদ্রমহিলা একাই এসেছেন টেনেরিফে আর উনি প্রতিবছর অন্তত একবার হলেও টেনেরিফে আসেন। সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে বাস সব যাত্রী নিয়ে হাজির হলো সেই লস ক্রিস্টিয়ানোসে। আরমোস নামক এক কোম্পানির জাহাজের টিকিট কাটা ছিলো। আমরা সবাই ট্যুর গাইডের কথা মত সেই জাহাজে উঠে বসলাম। প্রায় সোয়া এক ঘন্টা আমরা আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে পৌঁছলাম লা গোমেরা।

ইন্টার আইল্যান্ড ফেরি সার্ভিস থেকে দেখা যাচ্ছে লা গোমেরা দ্বীপটি

লা গোমেরা অনেক ছোট একটি দ্বীপ, জনসংখ্যা মাত্র ২৩০০০। এখানকার সবকিছু বলতে গেলে টেনেরিফের উপর নির্ভরশীল। দেখলাম ফেরি বা ছোট ছোট জাহাজে করে মালামাল আসছে টেনেরিফ থেকে লা গোমেরাতে। টেনেরিফের মতো লা গোমেরাতেও বানিজ্যিক ভাবে কলা চাষ করা হয়। লা গোমেরাতে এসে দেখলাম বাস এসেছে আমাদের সারাদিনের জন্য দ্বীপ ঘোরাবে বলে। বাসে চড়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য দেখতে দেখতে আমরা গেলাম একটা ফ্যাক্টরিতে যেখানে কলা বাজারজাতকরণের জন্য প্রসেসিং আর প্যাকেজিং করা হয়। আরো কিছু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যমন্ডিত জায়গা ঘুরে গেলাম নির্ধারিত রেস্টুরেন্টে। দুপুরের খাবার সেরে আমরা দেখতে গেলাম লা গোমেরার জাতীয় উদ্যান  যা ইউনেস্কো প্রাকৃতিক হেরিটেইজ বলে স্বীকৃত। হঠাৎ বৃষ্টি নেমে যাওয়ায় সেই উদ্যানে আমরা বেশিক্ষণ থাকতে পারলাম না।  গাইডের কাছে জানতে পারলাম এই বনের ডিজিটাল ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছে বিশ্ববিখ্যাত সিনেমা আভাতারে (Avatar)।

লা গোমেরা জাতীয় উদ্যানের প্রধান পথ

এমন করে ঘুরতে ঘুরতে বিকাল হয়ে গেলো। জাতীয় উদ্যান থেকে ফিরতি পথে আমরা দেখতে গেলাম একটি সুপ্ত আগ্নেয়গিরি যার নাম গাইড বলেছিলো তবে আমি মনে করতে পারছিনা এখন। এমন অনেক সুপ্ত আগ্নেয়গিরির সন্ধান মিলে এই দ্বীপে। অল্প কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে কয়েকটি ছবি তুলে উঠে পড়লাম বাসে।

সেই সুপ্ত আগ্নেয়গিরির ছবি

তারপর আমরা গেলাম আমাদের এই ভ্রমণের সবথেকে আকর্ষণীয় জায়গায়। কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করতে যাওয়ার আগে শেষবারের মত লা গোমেরাতেই কিছুদিন বিশ্রাম নিয়েছিল। যে বাড়িতে কলম্বাস থেকেছিলো সেই বাড়িটি পর্যটকদের জন্য সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। দুইতলা ছোট একটি বাসা। পাশেই আছে একটি গির্জা। গাইডের কাছে শুনলাম যে কয়েকদি কলম্বাস এই দ্বীপে ছিলেন রোজ আসতেন এই গির্জাতে প্রার্থনা করতে। ছোট এই গির্জাটিও সুন্দর করে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। কলম্বাস নেই তবে তার স্মৃতি বিজড়িত বাড়ি আর গির্জা নিয়ে আগ্রহের শেষ নেই পর্যটকদের। সবাই দেখছে, ছবি তুলছে। আমরাও কিছু ছবি তুললাম।

এই সেই গির্জা যেখানে কলম্বাস রোজ আসতো যখন সে লা গোমেরাতে কিছুদিন অবস্থান করেছিলো

সন্ধ্যা নামার আগেই আমরা আবার বাসে চড়ে আসলাম ফেরি ঘাটে। আমরা সেই ইন্টার আইল্যান্ড ফেরি সার্ভিসে করে সোয়া এক ঘন্টা জার্নি করে ফিরে আসলাম লস ক্রিস্টিয়ানোসে। আবার সেই বাস জার্নি তারপর আমাদের রিসোর্টে আসলাম। খুব ক্লান্ত থাকায় আর সঙ্গে ছোট বাচ্চা থাকায় চতুর্থ দিন আমরা বের হলাম না  বাইরে। আর তার পরেরদিন ফিরে আসলাম  ইংল্যান্ডে।

রিসোর্ট লস গিগান্টিসে আমাদের দ্বিতীয় দিনের ছবি

ইচ্ছা ছিলো আরো অনেক জায়গা ঘুরে দেখার। সময় স্বল্পতা আর মেয়েটার ধকলের কথা ভেবে তেমন ঘুরতে পারিনি আমরা। অদূর ভবিষ্যতে টেনেরিফে আবার বেড়াতে গেলে সেসব জায়গা ঘুরে আসবো। আর হ্যা আপনারা কখনো টেনেরিফে গেলে সিয়াম ওয়াটার পার্কে যেতে ভুলবেন না। ইউরোপের অন্যতম বড় আর নান্দনিক অ্যামিউসমেন্ট পার্ক। আমার মেয়ে আরেকটু বড় হলে আর বুঝতে শিখলে মিস হতো না আমাদের সিয়াম পার্কে যাওয়াটা। টেনেরিফ আসলেই খুব সুন্দর আর পর্যটক বান্ধব দ্বীপ. চোখে না দেখলে বোঝা যায়না। আমার ভ্রমণকাহিনীতে আমি যেমন লিখলাম তার থেকে অনেক সুন্দর এই দ্বীপটি। সময় আর সুযোগ পেলে ঘুরে আসতে পারেন প্রাকৃতিক সৌন্দয্যমন্ডিত আর ঐতিহাসিক তাত্পর্যপূর্ণ দ্বীপ টেনেরিফ আর লা গোমেরাতে।

ছবি: লেখক