ক্যান্সারের সঙ্গে বসবাস

রুখসানা আক্তার

(লণ্ডন থেকে): ক্যান্সার শব্দটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে মনে একটা ভীতি কাজ করে। কারণ এটা একটা মরণ ব্যাধি। কিন্তু এখন চিকিৎসা বিজ্ঞান অনেক এগিয়ে গিয়েছে ফলে কিছু কিছু ক্যানসার সঠিক সময়ে ধরা পড়লে উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে নির্মূল করা সম্ভব। আমি গত আগষ্ট থেকে ব্রেষ্ট ক্যান্সার এ আক্রান্ত। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়েছে এবং চিকিৎসা চলছে। আমি আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করছি কারণ আমার মনে হয়েছে যদি এ ব্যাপারে আমার চিকিৎসা ,অভিজ্ঞতা এবং প্রতিদিন মনোবল অটুট রেখে যে যুদ্ধটা আমি চালিয়ে যাচ্ছি তা শেয়ার করি। এতে হয়তো কিছুটা হলেও মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়বে। সাহস যোগাবে এবং এই রোগের ব্যাপারে যে ভীতি সেটা কিছুটা হলেও কাটবে। কারণ এর রোগের চিকিৎসায় পাশাপাশি প্রচন্ড মনোবল দরকার তা না হলে চিকিৎসা কাজ করবে না। পাশাপাশি আমি রোগাক্রান্ত হওয়ার পর কি কি ধরনের জটিলতা বিশেষ করে শারীরিক , মানসিক এবং সামাজিক ভাবে অতিক্রম করছি সে ব্যাপারে ও লিখছি। আমাদের আচার আচরণ একজন রোগীর সামনে কেমন হওয়া উচিত সে ব্যপারে আমার অভিজ্ঞতা লিখবো। আর এ সবই আমি মানুষের মধ্যে সচেতনতা জাগ্রত করার লক্ষেই করবো। শুধু একটা অনুরোধ কেউ আমাকে করুণা দেখতে আসবেন না প্লিজ। কারণ আমার মনের জোর অনেক এবং আমার পরিবার অনেক সাপোরটিভ।

অগাস্ট ৪ রাতে ঘুমাতে যাবার আগে হঠাৎ মনে হলো আরে অনেকদিন তো চেক করা হয়ে উঠেনি। তাইতো প্রায় নয় দশ মাস হয়ে যাবে। চেক করলাম। বুকের বাম পাশে হাতে কি যেন একটা শক্ত মত মনে হলো। একটা হিমশীতল ভয়ের স্রোত আমার ঘাড় থেকে শিরদাঁড়া বেয়ে নীচে নামছিলো। নিজেকে বললাম নাহ কাল সকালেই ডাক্তার ফোন দিয়ে এপইন্টমেন্ট নিতে হবে…

ইংল্যান্ডে জুলাই আগস্ট মিলে ছয় সপ্তাহের গ্রীষ্মকালীন স্কুল ছুটি। সকালে ঘুম থেকে উঠে ছেলেকে ডাকি । সে আজ বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে যাবে। ঘড়িতে সময় দেখি সাড়ে আটটা বাজে। আমার তো ডাক্তারে ফোন করে এপয়েন্টমেন্ট নেয়ার কথা।সঙ্গে সঙ্গেই রাতের ভয়ের সেই হিমস্রোত আবার শিরদাঁড়া বেয়ে যায় এবং এর ধাক্কায় আমার হার্টবিট ও খানিকটা দ্রুত হতে থাকে। কয়েক সেকেন্ড এর জন্য মনে হলো যাব না ডাক্তারের কাছে যদি খারাপ কিছু বলে এবং  মনে মনে নিজেকে নিজে একটা থাপ্পড় কষে বললাম যাবনা মানে ? যদি খারাপ কিছু হয়েই থাকে তাহলে সেটা তাড়াতাড়ি চেকআপ এ যাওয়া উচিত। দেরি হলে আরো খারাপের দিকে যেতে পারে।
আমার খুব ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর এমনটি হয়েছিল। ওর প্রথমে খুবই ছোট একটা মটর দানার চাইতে একটু বড় একটা লাম্প ছিল। ডাক্তার ওকে হসপিটালে পরীক্ষা করার জন্য তৎক্ষনাতই রেফার করে কিন্তু সে ভয়ে যায় নাই যদি ডাক্তার খারাপ কিছু বলে। পরে সে ব্যাপারটা ভুলে যায়। পরবর্তী সময়ে কয়েক মাস যাওয়ার পর সে প্রায়ই দুর্বল বোধ করতো। কয়েকদিন পর পরই হয় ইউরিন ইনফেকশন না হয় কিডনি সমস্যায় ভুগতো। যা-ই হোক আস্তে আস্তে তার বাম বগলের চামড়ার নীচে একটা লাম্প দেখা যায় এবং প্রায় বছরখানেক তখন । একদিন হঠাৎ দেখে তার বাম হাত নাড়া ছাড়া করতে পারে না এবং সঙ্গে সঙ্গে হসপিটালের ইমার্জেন্সিতে চলে যায় এবং সেখানে ই তার পরীক্ষা নিরীক্ষা চলে এবং ব্রেষ্ট ক্যানসার ধরা পড়ে। ওর ক্যানসার স্টেইজ থ্রী তে চলে গিয়েছিল। চিকিৎসার পর আজ এক বছর হলো তার শরীর থেকে ক্যানসার নির্মূল হয়ে গেছে। ওর মত ভাল মানুষ আমি কম দেখেছি। এত সহজ সরল ,মানবিক ভদ্র আর বিবেক বিবেচনা বোধ সম্পন্ন মানুষ খুব কম দেখা যায় আর তাই ওর কাজের জায়গায় , বন্ধু বান্ধব এবং পরিবার পরিজন ওকে খুব ভালবাসে এবং সম্মান করে। আমার খুব ভাল এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু সে। বলা যায় আমার একটা ছোট বোনের মত।(চলবে)

ছবি: গুগল ও লেখকের ফেইসবুক থেকে