‘ক্যাসাব্লাঙ্কাঃ ভালোবাসার ৭৯

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কোনো কোনো সিনেমার আবেদন ফুরিয়ে যায় না। পর্দার চরিত্রদের হাহাকার, কান্না, তাদের অসমাপ্ত ভালোবাসার গল্প কখনো দর্শকের পাশের আসনে এক জীবন বসে থাকে চিরসঙ্গী হয়ে। পর্দায় আছড়ে পড়া আবেগের ঢেউ বহু বছর চুম্বকের মতো গভীর মমতায় আঁকড়ে ধরে বাঁচে কয়েক প্রজন্মের দর্শক। সগৌরবে ৭৯ বছরে পা রেখে ‘ক্যাসাব্লাঙ্কা’ আজও সবুজ এক স্মৃতি হয়ে থেকে গেলো তার দর্শকদের হৃদয়ে।

এ বছরের আর ছয় মাস অতিক্রান্ত হলে ক্যাসাব্লাঙ্কা ছবিটা ৮০-এর ঘর স্পর্শ করবে। হামফ্রে বোগার্ট আর ইনগ্রিড বার্গম্যান রিক আর এলসা চরিত্রে স্থির দাঁড়িয়ে রইলেন। ঘড়ির কাটা অতিক্রম করলো কত যুদ্ধ, কত উত্থান-পতন, লেখা হলো কবিতা, গল্প, পাল্টে গেলো পৃথিবীর প্রেমের সংজ্ঞাও হয়তো। কিন্তু ক্যাসাব্লাঙ্কা আজও ৭৯ বছরে এসেও যেন ফিরে তাকানোর গল্প, অসমাপ্ত ভালোবাসার ডানা ঝাপটানোর শব্দ।

পৃথিবীর সিনেমার ইতিহাসে অনন্য ক্যাসাব্লাঙ্কাকে নিয়ে এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো ‘ক্যাসাব্লাঙ্কাঃ ভালোবাসার ৭৯’

১৯৪২ সালের নভেম্বর মাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তাণ্ডব চলছে পৃথিবী জুড়ে। হিটলার তার দানবীয় শক্তি নিয়ে পৃথিবীর মঞ্চে অবতীর্ণ সব ধ্বংস করতে। তখন আমেরিকায় ওয়ার্নার ব্রাদার্স স্টুডিওতে শুরু হয় ক্যাসাব্লাঙ্কা ছবির শুটিং। মাইকেল কার্টজের পরিচালনায় ১৯৪২-এর মে মাসে ছবির কাজ শুরু হয়ে প্যাকআপ হয় ওই বছরের আগস্ট মাসে। যুদ্ধের ধাক্কায় ছিটকে পড়া এক যুগলের আবার আচমকা দেখা হয়ে যাওয়ার গল্প ক্যাসাব্লাঙ্কা। তখন গোটা পৃথিবীর মানুষই যেন উদ্বাস্তু, পালাচ্ছে সবাই মৃত্যুর হাতছানি এড়িয়ে। অসমাপ্ত ভালোবাসার গল্পের আরও গভীর বিচ্ছেদের পরিণতির সঙ্গে এই ছবিতে হাত ধরে আছে গভীর যুদ্ধবিরোধী বার্তা। তাই ১৯৪২ সালের ২৬ নভেম্বর নিউ ইয়র্ক শহরের সিনেমা ঘরে মুক্তি পেলো ক্যাসাব্লাঙ্কা। পরের বছরের জানুয়ারীতে গোটা আমেরিকায়। মুক্তির পরেই অভূতপূর্ব সাফল্য। জুটলো তিন তিনটি অ্যাকাডেমী এওয়ার্ড। সেরা ছবি, সেরা পরিচালক এবং সেরা চিত্রনাট্য। যুদ্ধের ডামাডোলের মাঝেই আলোচনার ঢেউ উঠলো ক্যাসাব্লাঙ্কা নিয়ে।

এই ছবির শুটিং হয় ওয়ার্নার ব্রাদার্সের ৭ নম্বর স্টেজে। এই জায়গাটার সত্যিই যেন ছিলো কপাল গুন। এর আগে ক্যাসাব্লাঙ্কার আগে ‘দ্য লাইফ অফ এমিল জোলা’ আর ‘মাই ফেয়ার লেডী’ ছবি দুটি সেরা হিসেবে অ্যাকাডেমী অ্যাওয়ার্ড লাভ করে।

ওয়ার্নার ব্রাদার্সের সেই স্টুডিও বাইরে থেকে দেখতে ছিলো অনেকটা বিশাল কারখানা বাড়ির মতো। প্রায় একটি ফুটবল স্টেডিয়ামের আয়তনের সেই স্টুডিওর ভেতরে পুরো ছবির সেট তৈরি করতে ব্যয় হয়েছিলো তখনকার সময়ে ৭৬ হাজার মার্কিন ডলার।শুটিং শেষ না-হওয়া পর্যন্ত এই সেট কখনোই ভাঙা হয়নি। পুরো ছবির শুটিং স্টৃডিওর ভেতরে করার আরেকটি কারণ ছিলো তখন ক্যালিফর্নিয়ার উপকূলে জাপানী সাবমেরিনের উপস্থিতি। তখন আশংকা করা হচ্ছিলো জাপান আক্রমণ করে বসতে পারে আমেরিকা।যুদ্ধের কারণে অভিনেত্রা অভিনেত্রীদের পোশাকে নানা ধরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়। সেই সময়ে নাইলন কাপড়ের অভাব থাকায় ইনগ্রিড বার্গম্যানকে সুতীর পোশাক পরতে হয়।এই ছবির বিভিন্ন সাধারণ চরিত্রে তখন অভিনয় করেছিলেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে পালিয়ে আমেরিকায় চলে আসা মানুষ।

এই ছবির মূখ্য দুই চরিত্রে অভিনয় করার আগে ইনগ্রিড বার্গম্যান অথবা হামফ্রে বোগার্ট ব্যাপাক ভাবে তারকা খ্যাতি লাভ করেননি। ক্যাসাব্লাঙ্কা তাদের দু’জনকেই পৌঁছে দিয়েছিলো ভিন্ন উচ্চতায়। বোগার্ট তখন হলিউডে’র বেশ কয়েকটি খুন-জখম মার্কা ছবিতে অভিনয় করে মোটামুটি নাম করেছেন। এই ছবিতে বার্গম্যানের প্রেমিকের চরিত্রে তার অসাধারণ অভিনয় চমকে দিয়েছিলো সিনেমা-দর্শকদের। নিঃসঙ্গ, বেপরোয়া  এক চরিত্রে অভিনয় করেন বোগার্ট। মজার ব্যাপার হচ্ছে তাকে ছবিতে কাস্ট করার পর আবিষ্কৃত হয় উচ্চতায় তিনি ইনগ্রিড বার্গম্যানের চাইতে ছোট। তখন পরিচালক বার্গম্যানের সঙ্গে সেই বিখ্যাত দৃশ্যগুলোতে বোগার্টকে কাঠের প্যাকিং বাক্সের উপর দাঁড় করিয়ে অভিনয় করান।

শুটিংয়ের সময় এই ছবির শেষ দৃশ্য নিয়ে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা ছিলো। কী ঘটতে যাচ্ছে শেষে? রিককে চিরবিদায় জানিয়ে চলে যাবে এলসা ছবিতে তার স্বামীর হাত ধরে! অভিনেতা-অভিনেত্রীরাও জানতেন না পিরিণতি বিষয়ে। হামফ্রে বোগার্ট এ বিষয়ে পরিচালকের কাছে প্রশ্ন করেও কিছু জানতে পারেননি।

এই ছবির শেষ দৃশ্যে আছে চমক।একটি বিমান বন্দরে শেষ হয়ে যাওয়া হারিয়ে আবার ফিরে পাওয়া দু’টি মানুষের ভালোবাসা। সেখানে প্রয়োজন ছিলো একটি প্লেনের। কোনো বিমান বন্দরে গিয়ে শুটিং করা তখন অসম্ভব হওয়ায় সেটেই তৈরি করে নেয়া হয় কাঠের উড়োজাহাজ। এই উড়োজাহাজকে টেনে নাড়ানোর জন্য ভাড়া করে করে আনা হয় এক বামন মেকানিককে। মানুষটি আকৃতিকে ক্ষুদ্র হওয়ায় পর্দায় তাকে দেখা যায়নি। তাকে ঢেকে ফেলার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিলো গাঢ় ধোঁয়া।

অনেক অনেক বছর অতিক্রম করলো এই সিনেমাটি। হলিউডে নির্মিত প্রেমের ছবির তালিকায় আজও ক্যাসাব্লাঙ্কা তালিকার এক নম্বরে দাঁড়িয়ে আছে। ক্যাসাব্লাঙ্কা দাঁড়িয়ে আছে ভালোবাসার ভেলায়, দর্শকের হৃদয়ে।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট, এনপিআর
ছবিঃ গুগল  


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box