ক্রসরিভার

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নুসরাত নাহিদ

ওবুদু ক্যাটেল র‍্যাঞ্চে যাবার পাহাড়ি পথটা বেশ সর্পিল আর খাঁড়া। বাঁকগুলিও হঠাৎই সামনে এসে পড়ে। খুব চৌকস ড্রাইভিং দক্ষতাসম্পন্ন মানুষ ছাড়া এই পথে সহজে কেউ আসতে চায় না। শুভমিতা অফিসের কাজে ওবানলিকু লোকাল গভর্নমেন্ট এরিয়াতে যাচ্ছে আজ। ওর স্টেট ম্যানেজার আর বাকি টিমের ইচ্ছে কাজ সেরে ওখানকার মাউণ্টেইন রিজর্টে দু’দিন থেকে যাবার।

নাইজেরিয়ার একেবারে দক্ষিণের এই স্টেটগুলিতে ইনফর্মাল ট্যাক্সেশনের প্রবণতা অনেক বেশি। স্টেট গভর্ণমেন্টের বেঁধে দেওয়া ট্যাক্স, লোকাল গভর্ণমেন্টের ট্যাক্স আর পাড়ার দাদাদের আরও এক দফা ট্যাক্স! এর মধ্যে দাদাদের ট্যাক্সগুলি অভিনব। কেউ বাজার করে ফিরছে, তাকে ফেরার পথে থামানো হবে, বাজারের ব্যাগ খুলে জানতে চাওয়া হবে কী কী বাজার করা হয়েছে। মাছ যদি পাঁচটা কেনা হয়, একটা নামিয়ে নেবে তৎক্ষণাৎ। ওইটাই ট্যাক্স! শুভমিতাদের কাজ এই অনিয়মগুলি প্রতিহত করার মত কিছু ইনোভেটিভ সল্যুশন বের করা।

ঢাকা থেকে ল্যাগোস হয়ে আবুজায় ছিলো কিছুদিন শুভমিতা। ওরিয়েন্টেশন আর অন-বোর্ডিংটা ওখানেই হয়েছে। ল্যাগোসে এয়ারপোর্টে নেমেই এক ঝলকে বুঝে গেছে নরকের অনুভূতি কতখানি তীব্র হতে পারে। গরমে ঘেমে নাকাল হওয়া যাত্রীদের সুদীর্ঘ সারিতে দাঁড় করিয়ে রেখে মাত্র দুটো কাউন্টারে ইমিগ্রেশন অফিসার সার্ভিস দিতে থাকেন। লাগেজ ক্যারুজেলের অবস্থা যাচ্ছেতাই। ভেঙে বেরিয়ে থাকা ধাতব কোণায় খোঁচা খেয়ে কত কত স্যুটকেইস যে প্রথম যাত্রায় বিকল হয়ে যায়! তা-ও যদি ঘণ্টাদুয়েক আগে স্যুটকেইসের দেখা মেলে!

ল্যাগোসে নেমেই নিজের দেশের যাবতীয় অনিয়ম উপেক্ষা করে দেশপ্রেমটা আবারো ঝালিয়ে নেয় শুভমিতা। এয়ারপোর্ট থেকে বেরুবার পথে ট্র‍্যাফিক পুলিশের উৎকোচ খাবার পন্থা দেখে মায়াই হয় তার। দশ নাইরা (বাংলা পাঁচ টাকা) পেলেও তারা খুশি। ডমেস্টিক এয়ারপোর্টে ল্যাগোস থেকে আবুজা যাবার সময় আরেক দফা হয়রানি। স্ক্যানার না থাকায় প্রত্যেকটা লাগেজ খুলে চেকিং। আর চেকিং এর যন্ত্রণা এড়াতে ১০০-১৫০ নাইরা। নিয়মে বাঁধা হয়ই অনিয়মের খাত তৈরির জন্যে!

আবুজায় নেমে অফিস থেকে ধরিয়ে দেওয়া সতর্কবাণী পড়ে মনটা ডুবে যায় শুভমিতার। এতো এতো বিধিনিষেধ! অপরিচিত কারো সঙ্গে কথা বলা যাবেনা, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করা যাবেনা, শপিং মলে যাওয়া যাবেনা, টাকা হাতে ধরে সাথেই আবার হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হবে। ফেইসবুকিংটা বেশ বেড়ে যায় শুভমিতার। দেশের মানুষ দেখে প্রাণ আর চোখ দু‘টোই জুড়িয়ে নেবার এইটাই একমাত্র জানালা।

আবুজা থেকে ক্রস রিভার স্টেটে গিয়ে বেশ স্বাধীনতা অনুভব করে শুভমিতা। ক্রিশ্চিয়ান অধ্যুষিত এই প্রাক্তন ব্রিটিশ কলোনী সারাবছরই কম বেশি বৃষ্টিস্নাত। কৃষ্ণচূড়া আগুনে লালে ভরে রাখে পথ আর আকাশের সীমানা। পাশেই ক্যামেরুন আর আটলান্টিক। মাছের প্রাচুর্য আর মেঘের আনাগোনা বাংলাদেশকে মনে করিয়ে দেয় ক্ষণে ক্ষণেই। স্টেট হাউজিং সোস্যাইটির পাঁচ কামরার বিশাল এক ইউনিটের বাড়িতে মশার মত উড়ে উড়ে বেড়ানো, খুব করে দেশী রান্না আর B4U তে লেটেস্ট টপচার্ট শুনতে শুনতে কাজের ফাঁকের অবসর কেটে যায় শুভমিতার।

এখানে কিচেন মার্কেটের গ্লোরিয়াকে পেয়েছে ও। একটি লেবানিজ রেস্তোরাঁর কয়েকজন বন্ধুর মাধ্যমে। রেস্তোরাঁর সব সাপ্লাই গ্লোরিয়াই দেয়। ওর নানী আর মায়ের শুরু করা কাঁচাবাজারের সব্জির ছোট্ট একটা ব্যবসাকে গ্লোরিয়া বেশ বাড়িয়েছে, এখন ফ্রোজেন আইটেম, প্রভিশন্স, কন্ডিমেন্টস সবই পাওয়া যায় ওর কাছে। ফোন করে ক্ষুদে বার্তা দিয়ে দিলেই সব কিছু নিয়ে এই কঠোর পরিশ্রমী মেয়েটা বাসায় হাজির হয়ে যায়। শুভমিতা ওর জন্যে বাসার পেছনের এক চিলতে কিচেন গার্ডেনে কাঁচামরিচ আর ধনেপাতা লাগিয়েছে। ওর সাপ্লাইয়ের তালিকা আরও সমৃদ্ধ করতে।

সবই চলে নিয়মমাফিক। শুধু উরাধুরা নেটওয়ার্ক জ্যামের খপ্পরে পড়ে অনুপমের সঙ্গে  কথা বলতেই যা একটু কষ্ট হয়। ব্ল্যাকবেরী মেসেঞ্জারে পিংটাই এখন ভরসা। যখন তখন প্রেমটা উস্কে দিতে এর জুড়ি মেলা ভার। শুভমিতা একটু গুছিয়ে উঠলেই অনুপম আসবে, ঘুরতে। এই ক্রসরিভারের পুরোটা ঘুরে কেপটাউনে যাবার প্ল্যান আছে ওদের। শুভমিতার তা-ই একটুও ইচ্ছে করছে না ওবুদু তে থেকে যেতে। সারাক্ষণ অনুপমের চেহারাটাই মনে পড়ছে ওর। চোখ স্যাঁতসেঁতে হয়ে যাচ্ছে একটু পর পর। খুব সাবধানী মেয়ের মত টিস্যুর কোণা দিয়ে আস্তে চেপে মুছে ফেলছে চোখের জল।

পাহাড়ের গায়ে গায়ে আনারসের বাগান। বাগানের ফাঁকে ফাঁকে সমান্তরাল ঘাসের গালিচায় নগ্ন পায়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে ওরা। ঘন নীলে সাদা পল্কা ডটের শার্টে শুভমিতা আর ধবধবে সাদা পোলো শার্টে অনুপম। সব সময়ের মত হাতে হাত রাখা। ঈষাণ কোণ থেকে একগুচ্ছ পেঁজা মেঘ উড়ে এসে ঘিরে ধরে পুরোটা পাহাড়। হঠাৎ করেই পাহাড়ের এই অংশটায় তাপমাত্রা কমে যায়। শুভমিতা বরাবরই শীতকাতুরে। পশমিনাটাও ফেলে এসেছে গাড়িতে।

হিমে তিরতির করে কাঁপতে থাকে ওর ঠোঁট। অনুপম আয়েশ করে ওকে দেখে, চোখে সেই দৃষ্টি যা যে কেউকে গলিয়ে দিতে পারে মোমের মতো। অনুপম কি বোঝে কত কত কৈলাশের বরফ-অভিমান মূহুর্তেই বাষ্প হয়ে যায় ওই চোখ দুটো যখন একদৃষ্টে তাকায়? আর মাঝ প্রশান্তেও কেমন ঝড় উঠে যায় যখন চোখদুটি ভরে যায় দুষ্টুমিতে? থাকুক কিছু কথা, না-বলাই।

হঠাৎই ঝাঁকুনি দিয়ে গাড়িটা থেমে যায়। কয়েক মিলিসেকেণ্ড লাগে শুভমিতার বুঝতে যে ওর সঙ্গে অনুপম নেই। অস্ফুটে ওর নাম নিয়ে ওকে ডাকে কয়েকবার। ওদিকে হাজার হাজার ক্রোশ দূরে এক অফিসের নিজস্ব কামরায় কাজে আকণ্ঠ ডুবে থাকা অনুপম চমকে তাকায় কেউ ওর নাম ধরে ডাকছে শুনে!

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]